ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এবার সুশীল সমাজের হয়ে ব্যাট করতে হবে ইমরানকে

আহমেদ রশীদ
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০২:৩১ পিএম
এবার সুশীল সমাজের হয়ে ব্যাট করতে হবে ইমরানকে

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দায়িত্বগ্রহণের পরই একটি উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন ও সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি অভিজাত শ্রেণীর দুর্নীতি দমন করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারী কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছেন।

ইমরানের ঘোষিত সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তাঁকে অবশ্যই পাকিস্তানের কোণঠাসা সুশীল সমাজের সমর্থন আদায় করতে হবে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলো সেখানকার সুশীল নাগরিকদের ওপর যে দমন-পীড়ন এবং নানা বিধি নিষেধ আরোপ করেছিল, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে তারা যেন নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারে সেজন্য সহায়তাও করতে হবে ইমরানকে।  

রাজনীতিতে প্রবেশের পর বিভিন্ন ইস্যুতে সুস্পষ্টভাবেই ইমরানের অবস্থান ছিল সুশীল সমাজের বিপক্ষে। বৈষম্যমূলক ব্লাসফেমি আইন সমর্থন করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁকে উদারপন্থীদের প্রতি আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। অতীতে সংবাদ মাধ্যমেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন ইমরান। অন্যদিকে আফগানিস্তানে জঙ্গি সগঠন তালেনবানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে দখলদারদের বিরুদ্ধে বৈধ জিহাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। তবে বর্তমানে ইমরানের সামনে অতীত অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। একটি নতুন এবং ঐক্যবদ্ধ দেশ ও জাতির জন্য তিনি এই সুযোগটি গ্রহণ করতেই পারেন।

আন্তর্জাতিক মানব উন্নয়ন সূচকের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের অবস্থান একেবারেই নীচের দিকে। দেশটিতে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, আইসল্যান্ডে প্রতি এক হাজার জনে মাত্র একটি শিশুর মৃত্যু হয়। সেখানে পাকিস্তানে এ সংখ্যা ২২ জনে একজন। দেশটির ২৩ মিলিয়ন শিশুই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না।

পাকিস্তান যেসব সহায়তা পেতে পারে তার সবই গ্রহণ করা দরকার দেশটির। পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইমরানের অর্থ ও দক্ষতা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। চলতি বছর দেশটিতে বড় কয়েকটি আন্তর্জাতিক ঋণ ও আর্থিক সহায়তা বাতিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে ট্যাক্স ও রপ্তানি থেকে রাজস্ব আয়ও হ্রাস পাচ্ছে।

অ্যাকশন এইড, এশিয়া ফাউন্ডেশন, মার্সি কর্পস ও ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের মতো বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা বহু বছর ধরেই পাকিস্তানে কাজ করছে। সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোও বন্যাসহ বিভিন্ন সংকটকালীন সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারেও ভূমিকা রেখেছে তারা। এছাড়া হিন্দু ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করেছে সুশীল সমাজ, রাষ্ট্র যাদের উপেক্ষা করে আসছিল।

কিন্তু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এসব এনজিওগুলোকে সহায়তার পরিবর্তে দেশটির সরকার সবসময়ই তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে এসেছে। পূর্ববর্তী সরকার ও সামরিক বাহিনী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিতকরণ এমনকি কয়েকটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকার এবং ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো সবসময়ই আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার খবর প্রচার করে এসেছে।

গত বছর পাক সরকার ২১ টি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাকে পুনঃনিবন্ধনের আদেশ দেয়। কিন্তু ডিসেম্বরে পুনঃনিবন্ধনের আবেদন করার পর সরকার তা বাতিল করে। এই সিদ্ধান্তের কোন আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সংস্থাগুলো এখনও তাদের একটি আপিলের রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। চলমান অনিশ্চয়তার কারনে এই সংস্থাগুলো পরিচালিত বিভিন্ন প্রোগ্রাম এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে কয়েক হাজার পাকিস্তানি বেকার হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো দাতাগোষ্ঠীরাও দেশটিতে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছে।

এটা খুবই দুঃখজনক যে, পাকিস্তান জঙ্গীগোষ্ঠী দমনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন যারা উন্নত পাকিস্তানের জন্য কাজ করছে তাদের ওপর চলমান দমন-পীড়নের প্রতিকার করতে ব্যর্থ হলে ইমরানের সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি কোনভাবেই সম্ভব নয়। একারনে দেশের উন্নয়নের জন্যই ইমরানের পূর্বের অবস্থান পরিবর্তন করে সুশীল সমাজকে নিয়ে কাজ উচিৎ। 

লেখক: পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে সম্প্রতি ‘পাকিস্তান অন ব্রিংক: দ্য ফিউচার অব আফগানিস্তান, পাকিস্তান অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট’ নামে বই লিখেছেন। 

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ