ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৫ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সাদ্দাম হোসেন: সমৃদ্ধি ও ধ্বংসের নায়ক

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রবিবার, ০২:৩০ পিএম
সাদ্দাম হোসেন: সমৃদ্ধি ও ধ্বংসের নায়ক

সাহিত্যানুরাগী হিসেবে সুনাম ছিল তাঁর। বেশ কিছু উপন্যাস আর কবিতাও লিখেছিলেন তিনি। তবে সব কিছু ছাপিয়ে যে পরিচয়টি বড় হয়ে উঠেছিল তা হলো, উদ্ভট ও নিষ্ঠুর এক স্বৈরশাসক। যিনি নিজ দেশেই রাসায়নিক গ্যাস ও বোমা বর্ষণ করে নির্দ্বিধায় লাখো সাধারণ মানুষ হত্যা করেছিলেন। বলা হচ্ছে, সাদ্দাম হোসেনের কথা। ইরাকের সমৃদ্ধির নায়ক বলা হয় তাঁকে, একই সঙ্গে ধ্বংসেরও।

নিজের ছেলেদের প্রতি অস্বাভাবিক স্নেহশীল ছিলেন সাদ্দাম হোসেন। ছোট ছেলে উদয় হোসেন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে গুলিবর্ষণ করেছিলেন। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছিল। এই অপরাধের জন্য সাদ্দাম তাঁর পুত্রকে হাস্যকর এক শাস্তি দিয়েছিলেন। উদয়ের রোলস রয়েস, ফেরারিসহ দামি কয়েকটি গাড়ি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই ইরাকের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন সাদ্দাম হোসেন। পুরো নাম ছিলো সাদ্দাম হোসেন আব্দুল মজিদ আল তিকরিতি। তাঁর শাসনামলে দেশটি অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটে। তাঁর এক বড় সংস্কার ছিলো ইরাকের তেল সম্পদের জাতীয়করণ। যার ফলে দেশটির বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়েছিল এবং ব্যাপক সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছিল।

দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সাদ্দাম বিরোধীদের ওপরও দমন পীড়ন শুরু করেন। ক্ষমতাগ্রহণের পরপরই তিনি নতুন একটি বাহিনী গঠন করেছিলেন। এর কাজ ছিলো সরকারের জন্য হুমকিস্বরুপ বিভিন্ন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ও বাহিনীকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। তাঁর নির্দেশেই ১৯৭৪ সালে দেশটির দাওয়া পার্টির নেতাদের হত্যা করা হয়। এরপর ’৮০ সালে হাজার খানেক কুর্দি হত্যা এবং ’৮৮ তে রাসায়নিক হামলা চালিয়ে আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ হত্যা করেন তিনি। ১৯৯০ সালে এই স্বৈরশাসকের নির্দেশে একটি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। যার ফলে ‘মার্শ আরব’ নামক আদিবাসীগোষ্ঠীর বসতভিটা পানির নিচে তলিয়ে যায়।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সাদ্দামের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। প্রায় নয় বছর দীর্ঘস্থায়ী এ যুদ্ধে ইরাকের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে সাদ্দামের উচ্চাভিলাষ ও আগ্রাসী মনোভাবকেই দায়ী করা হয়। বলা হয়ে থাকে, তাঁর স্বপ্ন ছিল পারস্য উপসাগরের ওপর নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৯০ সালে কুয়েতে হামলা চালায় ইরাকি বাহিনী। মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে দেশটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় তারা। সাদ্দাম দাবি করে বসেন, ঐতিহাসিকভাবেই এটি ইরাকের অংশ ছিল। কিন্তু ’৯১ এ মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের কাছে হার মেনে যুদ্ধ-বিরতিতে সম্মত হন তিনি।

ইরান এবং কুয়েত দু’টি দেশের ওপরেই অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না। সীমান্ত বিরোধ, ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়া জঙ্গিদের মদদ দেওয়া ও ইরাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজের হত্যাচেষ্টাসহ আরও কিছু অবান্তর অভিযোগ দেখিয়ে দেশ দু’টিতে আক্রমণ চালিয়েছিলেন তিনি। ঠিক একইভাবে ইরাক আক্রমণের সময়ও  তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সাদ্দাম প্রশাসনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের মিথ্যা অভিযোগ তুলেছিলেন। 

২০০৩ সালের ২০ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে আগ্রাসন শুরু হলে আত্মগোপনে চলে যান লৌহমানব খ্যাত সাদ্দাম। সেপ্টেম্বরে জন্মস্থান তিকরিতের একটি খামারবাড়ি সংলগ্ন ভূগর্ভস্থ গর্ত থেকে তাকে আটক করা হয়। 

বলা হয়ে থাকে, নিরাপত্তার জন্য সাদ্দাম তাঁর মতো চেহারার বেশ কয়েকজনকে তৈরি করেছিলেন। মার্কিন বাহিনী তাঁকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছিল। এই বিশেষজ্ঞের প্রথম কাজ ছিল আটক ব্যক্তিই প্রকৃত সাদ্দাম কি না তা নিশ্চিত করা। জন নিক্সন নামের ওই বিশেষজ্ঞ ১৯৯৮ সালে সিআইএতে যোগদানের পর থেকেই সাদ্দামকে নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর নিক্সন জানিয়েছিলেন, আমার দেখা মানুষদের মধ্যে সাদ্দামই সবচেয়ে সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তি। তাঁকে করা প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করতেন।

বন্দী অবস্থায় জীবনের শেষ সময়ে সাদ্দাম মার্কিন গায়িকা মেরি জে ব্লাইজার গান শুনতেন নিয়মিত। নিজের এক্সারসাইজ বাইকে চড়তেও পছন্দ করতেন তিনি। মার্কিন রক্ষীরা জানান, জীবনের শেষ দিনগুলোতে সাদ্দাম তাঁদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। তাঁর ব্যবহার দেখে বোঝাই যেত না যে সাদ্দাম হোসেন কোনো এক সময়ে একজন নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন।

কিউবান `কোহিবা` সিগার খাওয়ার খুব নেশা ছিল সাদ্দামের। বন্দি অবস্থায়ও তিনি ওই নেশা ছাড়তে পারেননি। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ভেজা ওয়াইপে জড়িয়ে একটা বাক্সে সেগুলো রাখতেন তিনি। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাকে সিগার খাওয়া শিখিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন সাদ্দাম।

বার্ডেনওয়ার্পার নামের একজন রক্ষী জানান, সাদ্দাম হোসেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আশা করতেন যে তাঁর ফাঁসি হবে না। নতুন করে কোনো নারীর সঙ্গে প্রেম করার ইচ্ছা পোষণ করতেন সাদ্দাম। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আবারও বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল তাঁর।

বন্দিশালাতেও নাস্তার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে স্বভাব ছিল সাদ্দামের। ডিমের অমলেট টুকরো হয়ে গেলে, সেটা আর খেতেন না তিনি।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ঈদের দিনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় সাদ্দামের। কিন্তু ইরাকের বহু মানুষ এখনো বিশ্বাস করে এই লৌহমানব এখনো বেঁচে আছেন। তাদের দাবি, সাদ্দাম মারা যায়নি। যাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে সে সাদ্দামের মতো দেখতে অন্য কেউ।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ