ঢাকা, রোববার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চীনের উইঘুরদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:০৪ এএম
চীনের উইঘুরদের সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

চীনের সংখ্যালঘু একটি সম্প্রদায় উইঘুর।এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকাংশই মুসলিম। উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে সম্প্রতি চীনা সরকারের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। চীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা বিপুল সংখ্যক উইঘুর মুসলিমকে কতগুলো বন্দী শিবিরের ভেতরে আটকে রেখেছে।

জাতিসংঘের একটি কমিটি জানতে পেরেছে, ১০ লাখের মতো উইঘুর মুসলিমকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে কয়েকটি শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ক্যাম্পে তাদেরকে `নতুন করে শিক্ষা` দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেইজিং সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তবে শিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী লোকজনের ওপর চীন সরকারের নিপীড়নমূলক নজরদারির তথ্যপ্রমাণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কারা এই উইঘুর

উইঘুরদের বেশিরভাগই মুসলিম। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে এদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি দশ লাখ। আত্মপরিচয়ের বেলায় তারা নিজেদেরকে সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয়র লোকজনের কাছাকাছি বলে মনে করেন। তাদের ভাষা অনেকটা তুর্কী ভাষার মতো।

তবে গত কয়েক দশকে সংখ্যাগুরু চীনা হান জাতির বহু মানুষ শিনজিয়াং অঞ্চলে গেছেন সেখানে বসবাস করতে। উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকজন মনে করছেন এর ফলে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাপন হুমকির মুখে পড়েছে।

চীনের শিনজিয়াং প্রদেশ

এটা চীনের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে। এবং একই সাথে এই অঞ্চল চীনের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এর সীমান্তের ওপাশে আছে আরও কয়েকটি দেশ- ভারত, আফগানিস্তান এবং মঙ্গোলিয়া। তিব্বতের মতো শিনজিয়াংও স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। তার অর্থ হচ্ছে, কাগজে কলমে হলেও, বেইজিং-এর বাইরেও তারা নিজেদের মতো করে অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই দুটো এলাকাই চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিনজিয়াং এর অর্থনীতি কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। কারণ এই অঞ্চলের শহরগুলোর ভেতর দিয়েই গেছে সিল্ক রোড। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উইঘুররা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু এই অঞ্চলটিকে ১৯৪৯ সালে চীনের নতুন কমিউনিস্ট সরকারের পুরো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়।

চীনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক একটি কমিটি ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে জানতে পারে যে চীন সরকার উইঘুরদের স্বায়ত্তশাসিত এলাকাকে মূলত একটি বন্দী শিবিরে পরিণত করেছে। সেখানে ১০ লাখের মতো মানুষকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগের মিল পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব লোকজনের ২৬টি তথাকথিত `স্পর্শকাতর দেশের` আত্মীয় স্বজন আছেন তাদেরকে এসব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে।এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান এবং তুরস্কসহ আরো কিছু দেশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এছাড়াও যারা মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিদেশের কারো সাথে যোগাযোগ করেছে তাদেরকে টার্গেট করেছে কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও বলছে, এসব ক্যাম্পে যাদেরকে রাখা হয়েছে তাদেরকে চীনা মান্দারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর অনুগত থাকতে। আরও বলা হচ্ছে, তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা সেই ধর্ম পরিত্যাগ করতে। উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। তাদের বাড়িঘরের দরজায় লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ কোড, বসানো হয়েছে মুখ দেখে সনাক্ত করা যায় এরকম ক্যামেরা।

ফলে কোন বাড়িতে কারা যাচ্ছেন, থাকছেন বা বের হচ্ছেন তার উপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নজর রাখতে পারছে। তাদেরকে নানা ধরনের বায়োমেট্রিক পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে।

বিবিসির অনুসন্ধানে শিনজিয়াংয়ে বেশ কিছু ক্যাম্প এবং প্রত্যেকটি স্তরে পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তারা লোকজনের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে দেখছেন।ক্যাম্প থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এরকম কয়েকজনের সাথেও কথা বলতে পেরেছে বিবিসি।

ওমির নামে তাদের একজন বিবিসিকে বলেন, ‘তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেওয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতো সেটাও আমি শুনতে পেতাম।’

চীন সরকারের দাবি, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি ইসলামপন্থী গ্রুপের সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবেলা করছে। বেইজিং বলছে, উইঘুর মুসলিমদের কেউ কেউ জঙ্গি গ্রুপ ইসলামিক স্টেটে যোগ দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সেখানকার লোকজনের ওপর চীনের দমন-পীড়নের কারণেই সেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

বিবিসি জানয়, জিনজিয়াংয়ের আঞ্চলিক রাজধানী উরুমকিতে ২০০৯ সালের দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ২০০ জন। তাদের বেশিরভাগই চীনা হান জাতিগোষ্ঠির। তারপর থেকে সেখানে আরও কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা হয়েছে পুলিশ স্টেশন এবং সরকারি ভবনেও। ২০১৪ সালে এরকম কিছু হামলায় নিহত হয়েছে ৯৬ জন।

সরকারের পক্ষ থেকে এসব হামলার জন্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করা হয়েছে। বেইজিং বলছে, শিনজিয়াং-এর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের অন্যত্রও হামলা চালিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে তারা তিয়েনানমেন স্কয়ারে গাড়ি দিয়েও হামলা করেছিল।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিনজিয়াং-এ ছুরি দিয়ে চালানো হামলায় পাঁচজন নিহত হওয়ার পর সরকার সেখানে নতুন করে অভিযান চালাতে শুরু করে। এসময় সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাও `সন্ত্রাসীদের` বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

সূত্র: বিবিসি

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ

বিষয়: উইঘুর , চীন