ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিঃসন্তান দম্পতির শেষ ভরসা এমআরটি; স্বীকৃতি কেন নয়?

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ০১:০২ পিএম
নিঃসন্তান দম্পতির শেষ ভরসা এমআরটি; স্বীকৃতি কেন নয়?

কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই জন্মেছিল এঞ্জেলা। কিন্তু পৃথিবীতে আসার কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। বিচলিত হয়ে পড়লেন ওর মা-বাবা। ছোট্ট এঞ্জেলাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। দীর্ঘ একমাস ইমার্জেন্সি রুমে চিকিৎসা নেওয়ার পর জানা গেল, সে বিরল ধরনের জিনগত অসুখে ভুগছে। যেটা তার মাইটোকন্ড্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পৃথিবীর প্রতি চার হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২০ হাজারে একজন। মানুষের শরীরের কোষের ব্যাটারি হিসেবে কাজ করে এই মাইটোকন্ড্রিয়া। এঞ্জেলার মা-বাবা আর চিকিৎসকদের অনেক চেষ্টার পরেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পৃথিবীতে আসার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বিদায় নেয় সে। ছোট্ট শিশুটির মৃত্যুটা মেনে নেওয়া ওর মা বাবার জন্য ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। কিন্তু বাস্তবকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা।

এঞ্জেলার মা বাবা আবারও সন্তান চাইছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকরা জানালেন, যে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজঅর্ডারে ভুগে এঞ্জেলার মৃত্যু হয়েছিল সেটা মূলত মায়ের কাছ থেকেই সে পেয়েছিল। এঞ্জেলার মায়ের আবারও সন্তান হলে তার পরিণতিও এঞ্জেলার মতোই হতে পারে। তাই তাদের নিজেদের জৈব শিশু আশা না করাই শ্রেয়। এঞ্জেলার মা ক্রিস্টিনাকে চিকিৎসকরা ডোনার খোঁজার পরামর্শ দিলেন, যার থেকে ডিম্বানু নেওয়া যাবে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মায়ের মতোই ক্রিস্টিনা কোনো ডোনারের থেকে নয় বরং নিজের সুস্থ স্বাভাবিক একটি সন্তান চাচ্ছিলেন। শুধু ক্রিস্টিনাই নন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে বহু দম্পতি এমন সমস্যার সম্মুখীন হন। চিকিৎসা বিজ্ঞান এর একটি সমাধানও আবিষ্কার করেছে। তা হলো, এমআরটি বা মাইটোকন্ড্রিয়াল রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি। বিশ্বের হাজার হাজার নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফোটাতে পারে এই পদ্ধতি। কিন্তু সমস্যাটা হলো, শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য ছাড়া বিশ্বের আর কোন দেশই এমআরটিকে বৈধতা দেয়নি। সারা বিশ্বেই এমআরটির ব্যাপক সমালোচনাও রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যে পদ্ধতিটি হাজার হাজার মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে, সেই এমআরটি নিয়ে কেন এতো সমালোচনা?

এমআরটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে জিনগত পরিবর্তন আনা হয়। কোন নারীর ডিম্বানুতে লক্ষ লক্ষ মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে। এমআরটির মাধ্যমে এই মাইটোকন্ড্রিয়াই পরিবর্তন করা হয়। যে পরিবর্তিত মাইটোকন্ড্রিয়ার কারণে সুস্থ সন্তান পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়, এই পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে ডিএনএ প্রতিস্থাপন করে সুস্থ সন্তান পাওয়া সম্ভব  হয়। বর্তমানে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (আইভিএফ) মাধ্যমে অনূর্বর ভ্রূণ থেকে সুস্থ সন্তান পাওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিস থাকে তাহলে আইভিএফ কোন উপকার করতে পারে না। তাই উক্ত পরিবর্তিত মাইটোকন্ড্রিয়ায় সুস্থ ও কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সু্স্থ সন্তান পাওয়া সম্ভব। এই থেরাপির মাধ্যমে ডিম্বানুর সক্ষমতা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।  যদি কোন দম্পতি মনে করেন তারা অ্যাথলেটিক ধাঁচের সন্তান নেবেন এমআরটির মাধ্যমে সেটা সম্ভব। পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্যের বাইরে সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের শিশু পাওয়া সম্ভব এই এমআরটির মাধ্যমে।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিসে আক্রান্ত মায়ের সন্তান লাভের একমাত্র পদ্ধতি হতে পারে এই এমআরটি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে অজানা এক কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এই পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র দেশ হিসেবে ২০১৫ সালে এমআরটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি এর বিপক্ষে থাকলেও এটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে এটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। কিন্তু কেন স্বীকৃতি দেওয়া হবে না মানবজাতিকে মাইটোকন্ড্রিয়াল মিউটেশনের মতো ভয়ঙ্কর একটি রোগ থেকে মুক্তি দিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তান পেতে সাহায্য করা যুগান্তকারী এই পদ্ধতিকে? এই প্রক্রিয়ায় কোনো শিশু জন্মানোর আগেই সে কেমন হবে সেটা ঠিক করে দেওয়া সম্ভব। এ কারণেই হয়তো অনেকে একে সৃষ্টিকর্তার ওপর খবরদারি বলে মনে করছেন!

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি