ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কুখ্যাত বিকাশ দুবে এনকাউন্টার; যে আটটি প্রশ্ন উঠছে

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২০ শুক্রবার, ০৬:২৯ পিএম
কুখ্যাত বিকাশ দুবে এনকাউন্টার; যে আটটি প্রশ্ন উঠছে

ক্ষোভের ছবিটা এক সপ্তাহেই বদলে গিয়েছে বাঁধভাঙা আনন্দে। গত ৩ জুলাই গুলির লড়াইয়ে আট পুলিশকর্মীর মৃত্যুর পরে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় অসন্তোষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। এমনকি, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেও খোলাখুলি ভারতের উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। শুক্রবার পুলিশি এনকাউন্টারে বিকাশ দুবের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পরে তাঁরা যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কানপুরের রাস্তায় জড়ো হয়ে পুলিশের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছেন সাধারণ মানুষও।  বিকাশের মতো নৃশংস গ্যাংস্টারের এমন চটজলদি ‘কঠোরতম সাজা’য় আমজনতার একাংশের এমন উচ্ছ্বাস অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সঙ্গেই গোটা ঘটনাপর্বে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের ‘ভূমিকা’ নিয়ে উঠে আসছে কিছু ‘বেসুরো’ (এবং সঙ্গত) প্রশ্ন।

যে কোনও ‘এনকাউন্টারে’র মতোই এ ক্ষেত্রেও আত্মরক্ষার তত্ত্ব দিয়েছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। তাদের দাবি, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে সড়কপথে বিকাশকে কানপুরে আনা হচ্ছিল এসটিএফ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে। পুলিশি কনভয়ে ছিল মোট তিনটি গাড়ি। কানপুরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার আগে ভউতী এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে বিকাশদের গাড়ির চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। গাড়ি উল্টে গেলে বিকাশ এক পুলিশকর্মীর পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। বাধা দেওয়া হলে সে গুলি চালায়। সে সময় পুলিশকর্মীদের পাল্টা গুলিতে সে মারা পড়ে।

অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার তথা বিএসএফের প্রাক্তন এডিজি এন সি আস্থানা এদিন দুর্ঘটনা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর টুইট, ‘‘গল্পটা বেশ ভয়ানক। গাড়িটা তো দেখছি সুবিধামতো জায়গাতেই শোয়ানো আছে। চারটি দরজাই বন্ধ। রাস্তার হাল দেখুন। এতো মোলায়েম ভাবে গাড়ি উল্টে যাওয়ার কোনও কারণই নেই। আর চারিদিকে ফাঁকা মাঠ। বোকাসোকা কোনও মোটা লোকও এমন ক্ষেত্রে ছুটে পালানোর ঝুঁকি নেবে না।’’ শুধু ভারী চেহারা নয়, ৫২ বছরের বিকাশের পায়ের জখমও ছুটে পালানোর পথে অন্তরায় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে ইতিমধ্যেই।

রাস্তার ধারে ‘মোলায়েম ভাবে’ উল্টে যাওয়া ওই সাদা গাড়িটির একটি মাত্র জানলার কাচ ভেঙেছে। বৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন অনেকেই। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনও ‘রোড ব্লকার’ও নজরে আসেনি। ফলে চালকের ‘আচমকা নিয়ন্ত্রণ হারানোর তত্ত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আস্থানার প্রশ্ন, বিকাশের যদি পালানোরই মতলব থাকবে, তবে কেন সে মধ্যপ্রদেশে গিয়ে মন্দিরে পুজো দিয়ে আত্মসমর্পণ করল।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, গাড়ি উল্টে চার পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন। কিন্তু বিকাশ কী ভাবে অক্ষত অবস্থায় গাড়ি থেকে বেরোল এবং কনভয়ের অন্য গাড়ির পুলিশকর্মীদের নাগাল এড়িয়ে খোলা মাঠের মধ্যে কাঁচা রাস্তা দিয়ে প্রায় ২০০ মিটার ছুটে পালাল, তা নিয়েও ‘রহস্য’ তৈরি হয়েছে। ঘটনাচক্রে, এদিনই সোশ্যাল মিডিয়ায় মধ্যপ্রদেশের এক পুলিশ অফিসারের ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। বৃহস্পতিবার তোলা ভিডিয়োতে ওই অফিসারকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আশা করব বিকাশ শেষ পর্যন্ত কানপুর পৌঁছবে না।’’ 

উজ্জয়িনী থেকে পুলিশ কনভয়ের পিছু নিয়েছিল সাংবাদিকদের ওই দলটি। কিন্তু এদিন ভোর সাড়ে ৬টা নাগাদ কানপুর জেলার সীমানায় সাংবাদিকদের গাড়িগুলি আটকে দেয় উত্তরপ্রদেশ পুলিশের একটি দল। আর তার কয়েক কিলোমিটার দূরেই হয় বিকাশের এনকাউন্টার! বিকাশের দেহের তিনটি গুলির জখমও ‘সাজানো পুলিশি সংঘর্ষের তত্ত্ব’ সমর্থন করছে বলে এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই ধারণা। পুলিশ সূত্রের খবর, তিনটি গুলিই চালানো হয়েছে সামনে থেকে। যদিও এ ক্ষেত্রে কানপুর পুলিশের ব্যাখ্যা, বিকাশকে প্রথমে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে তা না মেনে পুলিশের দিকে গুলি চালায়। সে সময় পুলিশকর্মীরা পাল্টা গুলি চালালে সে গুরুতর জখম হয়। গুলির লড়াইয়ের কারণেই গুলি লেগেছে সামনে থেকে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন গুলির আওয়াজ শুনলেও গাড়ি দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মেলেনি একজনও।

শুধু আট পুলিশকর্মীকে খুন নয়, গত তিন দশক ধরে অন্তত ৬০টি অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্ত বিকাশ। এর মধ্যে থানায় ঢুকে প্রতিমন্ত্রী স্তরের রাজনৈতিক নেতাকে খুনের অভিযোগও রয়েছে। খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিকাশ হাইকোর্টের নির্দেশ জামিন পেয়েছিল। এমন এক অপরাধীকে আনার সময় কেন হাতকড়া পরানো হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ বলেন, ‘‘শুধু হাতকড়া নয়, পলাতক, ভয়ঙ্কর অপরাধী বা জঙ্গিদের গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনে পায়ে শিকলও পরানো হয়।

গতকাল রাতেই সুপ্রিম কোর্টে বিকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। তার গ্যাংয়ের পাঁচ সদস্যের সাম্প্রতিক পুলিশ এনকাউন্টারের ঘটনার সিবিআই তদন্তের আবেদনও করা হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। অভিযোগ, সেই আবেদনের শুনানির আগেই বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ‘দৃষ্টান্তমূলক শান্তি’র পথ বেছে নিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বল এদিন টুইট করেন, ‘‘বিকাশ দুবের পুলিশি এনকাউন্টারের সম্ভাবনা আঁচ করেছিলেন অনেকেই। স্বেচ্ছাচারিতা না কি, বিকাশের সঙ্গে কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের যোগাযোগের প্রমাণ লোপাটের ষড়যন্ত্র। উত্তরপ্রদেশে পুলিশ-অপরাধী যোগাযোগের তদন্তের জন্য কমিশন গড়া প্রয়োজন।’’ গত বছর তেলঙ্গানায় গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় চার অভিযুক্তের পুলিশি এনকাউন্টারের পরেও এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছিল। কিন্ত শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয় পুলিশের যুক্তি। বিকাশ নিকেশের ক্ষেত্রেও বিধি মেনে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন। এখন তার রিপোর্টের প্রতীক্ষা।

সূত্র: ভারতীয় মিডিয়া