ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

৭০ বছরেও কেন ব্যর্থ পাকিস্তান?

অর্চি হক
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ১০:৪৩ এএম
৭০ বছরেও কেন ব্যর্থ পাকিস্তান?

একটি দেশ স্বাধীনতা পেলেই কি স্বাধীন হতে পারে? স্বাধীনতার সাত দশক পর পাকিস্তানের কোনো বোধ বুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক এমন প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কারণ আজ স্বাধীনতার ৭৪ তম বার্ষিকীতেও বিশ্বে ব্যর্থতম রাষ্ট্রের তকমা লাগানো পাকিস্তানের গায়ে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর সাত দশক পেরিয়ে গেছে। অথচ এখনো অস্তিত্বের সংকটে পাকিস্তান। বর্তমানে বিশ্বে ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রতীক এই দেশ। কেউ কেউ আবার একে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের আখ্যাও দিয়ে থাকেন। কিন্তু কেন তাদের এ অবস্থা? স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও কেন উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই পাকিস্তানের?

পাকিস্তানের মাত্র একদিন পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন হয় ভারত, অথচ ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক পরাশক্তি। তার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশের তালিকায় পাকিস্তানকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। প্রতিবেশী দুটো দেশের কেন এমন উল্টো চিত্র? 

বিশ্লেষকরা বলেন, এর কারণ স্বাধীন হওয়ার পরে ভারত খুব দ্রুত গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করে। পাকিস্তান সে পথ নেয়নি। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫২ সালেই সাধারণ নির্বাচনে যায় ভারত। নতুন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু পাকিস্তান স্বাধীনতার ২৩ বছর পর ১৯৭০ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের মুখ দেখে। দীর্ঘ দিন গণতন্ত্রের পথে না হাঁটায় স্বাধীনতার পর প্রায় দু’দশক ধরে পাকিস্তানে রাষ্ট্রক্ষমতার হাতবদল হয়েছে কোনও নির্দিষ্ট নীতি না মেনে। রাষ্ট্রচালনায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অযথা দেরি হওয়ায় সেনাবাহিনী শাসন ক্ষমতায় নাক গলানোর সুযোগ পেয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা বলেন, পাকিস্তানের ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, এটা কোনো আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। যেকোন দেশ, প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিরও সাফল্য পেতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটি হলো নীতি বা আদর্শ। এই বিষয়টিই নেই পাকিস্তানে।

জাতিগত দমন-পীড়নও পাকিস্তানের ব্যর্থতার বড় কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটির শাসকগণ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ করতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান একের পর এক ব্যর্থতার রেকর্ড গড়ে চলেছে।

পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এখনও বিভিন্নভাবে বৈষম্যমূলক আচরণের স্বীকার হচ্ছে। দেশটির নারীরাও প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে। আর নারী জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে কোন দেশই সফল হতে পারেনি।

সামরিক শাসন পাকিস্তানের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই সেনাবাহিনী দেশটিতে নেতৃত্বে ছিল। বলা হয়ে থাকে, দেশটির কোন সরকারই সেনাবাহিনীর ইচ্ছা ছাড়া ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তাছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকারই তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেনি পাকিস্তানে। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন কারণে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের আরেকটি বড় সমস্যা হলো জঙ্গিবাদ। দেশটির সেনাবাহিনীই জঙ্গিদের লালন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বের সভ্য দেশগুলো যখন নিজেদের ভূখণ্ড জঙ্গিমুক্ত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, পাকিস্তান সেখানে জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শীর্ষ জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকেও পাওয়া গিয়েছিল দেশটির আবোটাবাদ এলাকায়। যার পাশেই ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘাঁটি।

ইসলামের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের অভ্যুদয় ঘটলেও এর বিভিন্ন কর্মকান্ডই ইসলাম পরিপন্থী। তাছাড়া এটা গণতান্ত্রিক নাকি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যখন যিনি ক্ষমতায় আসেন, তিনিই তার খেয়াল খুশিমতো পাকিস্তান পরিচালনা করেন। নওয়াজ শরীফ ও তার দল যখন শাসন ক্ষমতায় ছিল তারা তাদের মতো দেশ চালিয়েছে। আবার দুর্নীতিবাজ বলে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ভুট্টো পরিবার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন একভাবে পাকিস্তান চলেছে। সাবেক ক্রিকেটার ও পাকিস্তান তেহরিক এ ইনসাফের প্রধান ইমরান খান আবার অন্যভাবে দেশ চালাচ্ছেন। তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২ বছর পেরিয়ে গেল। অনেক আশা জাগিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু এখনও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার স্কোর শূন্যই বলা চলে। শোনা যায় সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা বর্গা দেওয়ার মুচলেকা দিয়েই ইমরান ক্ষমতায় এসেছিলেন। সেই সেনা বাহিনীর সঙ্গেও এখন তার বিরোধের গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান নিজেদের ব্যর্থতার বোঝা ভারি করে আবারও উল্টো পথে হাঁটে কিনা সেটাও এক বড় প্রশ্ন।