ঢাকা, রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব বহু পুরনো 

রিয়া
প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মঙ্গলবার, ১০:৫৯ এএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব বহু পুরনো 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক শেষ হয় ১৯৮০ সালে। এরপর ২০১৮ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খোমেইনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ নিষিদ্ধ করেন। দেশ দুটির দ্বন্দ্বে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যে।  

ইরানের খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, পারমাণবিক শক্তিমত্তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, এসব ইস্যুতে দেশ দুটির মধ্যে প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা দ্বন্দ্ব বিশ্বব্যাপী আলোচনা ও ভাবনার উদ্রেক ঘটায় সব সময়। 

বিংশ শতকের শুরুর দিকে ইরানের তেল খনিগুলো অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানি নামে একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। ১৯২৫ সালে ব্রিটিশদের সহায়তায় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রেজা শাহ পাহলভি ইরানের বাদশাহ হিসেবে ক্ষমতা নেন। এরপর ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক চেহারা রুপ পায় ইরান। ইরানের প্রধানমন্ত্রী হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, তিনিই তেলক্ষেত্র জাতীয়করণের ঘোষণা দেন।

১৯৫৩ সালের ঘটনা। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এবং সিআইএ’র সহায়তায় সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে পাহলভি আবারও ইরানের বাদশাহ হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫৭ সালে ইরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হয়। সেসময় তেহরানে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৬৪ সালে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে দেশ থেকে বের করে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানো হয়। 

১৯৬৭-৬৮ সালে ইরান পারমাণবিক গবেষণায় প্রচুর অগ্রগতি লাভ করে। ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ৫ মেগাওয়াটের রিসার্চ রিঅ্যাক্টর সরবরাহ করে। এর জ্বালানির হিসেবে দেওয়া হয় ৫ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম যার ৯৩ শতাংশ পরিশোধিত ছিলো। এরপর, ইরান পারমাণবিক শক্তির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ (এনপিটি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লব  ঘটে১৯৭৯ সালে। শাহ আমলের দুঃশাসন ও দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার ইরানিকে হত্যা করে শাহের সৈন্যরা। খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে রেজা শাহ পাহলভির পতন ঘটে। প্রায় ১৪ বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে বিপ্লবের নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খোমেনির দেশে ফেরা।

১৯৭৯ সালে রেজা শাহ ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। অত্যাচারী শাহকে পৃষ্ঠপোষকতা করার প্রতিবাদে ও তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে বিপ্লব সফল হওয়ার দুই সপ্তাহ পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা প্রবেশ করে। এক পর্যায়ে ৫২ জনকে জিম্মি করে বিক্ষোভকারীরা। ৪৪৪ দিন পর সেই জিম্মি সংকটের অবসান হয়। সেসময় ইরানের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৮০-৮৮ সালে সংঘটিত হয় ইরাক-ইরান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় ইরানের বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করতে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইরাক। সীমান্ত বিরোধসহ ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়াদের মদত দেওয়ার অভিযোগে ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরাকি বাহিনী অবৈধভাবে ইরানকে আক্রমণ করে। সেসময় ইরাকি বিমানবাহিনী ইরানের ১০টি বিমানঘাঁটির উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে লিপ্ত হয় ইরাক ও ইরান। ৮ বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইরাক ও ইরানের ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়, আহত হয় প্রায় ১৫ লাখ। 

১৯৮৬ ঘটে কন্ট্রা কেলেঙ্কারির ঘটনা। ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ইরানের কাছে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করে এবং তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিকারাগুয়ার তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকার উৎখাতের জন্য কন্ট্রা বিদ্রোহীদের কাছে পাচার করে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান ও বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা এ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে ইরান উপকূলের সমুদ্রসীমায় ঢুকে ‘ভিনসেন্স’ নামের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বিমানটির ২৯৮ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।

১৯৯৭ সালে ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে কাশেম সোলাইমানি যুক্ত হন। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) কমান্ডার কাশেম সোলাইমানিকে ‘কুদস ফোর্স’র প্রধান বানানো হয়। এই ‘স্পেশাল অপারেশন ইউনিট’র মূল কাজ হচ্ছে ইরানের বাইরে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করা। সোলাইমানির নেতৃত্বে সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবানন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে কুদস ফোর্স। হামাস, ইসলামিক জিহাদসহ অসংখ্য গেরিলা দলকে বিভিন্ন সময় সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করে তারা। বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে সোলাইমানিকে জবাবদিহি করতে হয় শুধুমাত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছে।

২০০১ সালে নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের যুদ্ধে ইরান আমেরিকাকে সহযোগিতা করলেও রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লু বুশ ইরানকে ‘শয়তানের অক্ষশক্তি’ হিসেবে আখ্যা দেন।

২০০৩ সালের দিকে ইরানের পারমাণবিক হুমকির বিষয়টি নজরে আসে। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, ইরান ইউরেনিয়াম উৎপাদনের আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। যদিও ইরান জানায়, তারা ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করছে এবং নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে জ্বালানি উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। এরপর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তেহরানের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট পরীক্ষা করতে শুরু করলে ইরানের রাষ্ট্রপতি আহমেদিনেজাদ কট্টর অবস্থানে গিয়ে আরও জোরালো করে তুলেন দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। ফলে, ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইউরোপের নতুন করে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়।

২০১৩-১৫ সালে ঘটে পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষরের ঘটনা। মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত হাসান রুহানি ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করার পর ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করে পশ্চিমের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেন।

২০১৫ সালে ৬ বিশ্ব শক্তির সঙ্গে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের এ চুক্তি হয়। চুক্তির পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে ইরান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান সংবেদনশীল পরমাণু গবেষণা সীমিত করতে রাজি হয়। অপরদিকে, দেশটির বিরুদ্ধে আনা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে দেশ ছয়টি।

২০১৭ সালে ইরানসহ সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বাতিলের ঘোষণা দেয় তখনকার নতুন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ইরান আর ডলার ব্যবহার করবে না বলে ঘোষণা দেয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইরানের সঙ্গে বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তিতে শর্তের ঘাটতি রয়েছে বলে ঘোষণা দেন। ইরান এখনো মাত্রাতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে বলে অভিযোগ তুলে ২০১৮ সালের মে মাসে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরে আসেন। 

২০১৯ সালের এপ্রিলে ইরানের কুদস ফোর্সকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা দেয় আমেরিকা। জবাবে, ইরান অভিযোগ করে, আমেরিকা ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদ’ চালাচ্ছে।

২০১৯ সালের জুনের ঘটনা। পারস্য উপসাগরে তেলের ট্যাংকারে হামলা এবং আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত হলে এর দোষ পড়ে ইরানের ওপর। সেসময় ইরানের ওপর আরেক দফা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে আমেরিকা। ইরান নতুন করে পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে। সেসময় দেশটির শীর্ষ ব্যক্তিরা চুক্তির কিছু অংশ না মানার ঘোষণা দেয়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। ইরাক ও সিরিয়ায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সেই হামলায় ইরাকের কয়েকজন শীর্ষ শিয়া মিলিশিয়া কমান্ডার নিহত হন। এ ঘটনায়, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করে ইরান-সমর্থিত ইরাকিরা। সেখানে তারা বিক্ষোভ করে, দূতাবাস ভবনে ভাঙচুর চালায়।

২০২০ সালের জানুয়ারির ঘটনা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরাকে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। ইরান প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সেদিনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয় ইউক্রেনীয় উড়োজাহাজ। নিহত হয় ১৭৬ জন আরোহী। 

২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এরপর থেকেই আবারও উত্তেজনা শুরু হয় দেশ দুটির মধ্যে। পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এখনও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ দুটি। দেশ দুটির সম্পর্কের উপর বিশ্বের অনেক কিছুই নির্ভর করছে।