ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তালেবানের পক্ষে পুরো ক্ষমতা করায়ত্ত্ব করা সম্ভব?

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২১ রবিবার, ১০:৪৭ এএম
তালেবানের পক্ষে পুরো ক্ষমতা করায়ত্ত্ব করা সম্ভব?

আফগানিস্তান এমন একটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দেশ, যা নিয়ে আসলে বিশ্লেষণ করা চাট্টিখানি কথা নয়। এখানে আন্তধর্মীয় নানা গোষ্ঠী রয়েছে, এবং এদের মধ্যে মতাদর্শগত নানা পার্থক্য ও বিরোধ স্পষ্ট।

আফগানিস্তানের প্রধান শহর হলো কাবুল, হেরাত, জালালাবাদ, মাজার-ই-শরিফ, কান্দাহার ও কুন্দুজ। আফগানিস্তানের জাতিগত গোষ্ঠীগুলো হলো পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, আইমাক, তুর্কমেন, বালুচ, পাশাই, নুরস্তিনি, গুজ্জর, আরব, ব্রাহুই, কিজিলবাশ, পামিরি, কিরগিজ, সাদাত প্রভৃতি। এর মধ্যে পশতুন মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ। বেশির ভাগ তালেবান হয় আফগান এবং পাকিস্তানের পশতুন অথবা বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভাড়াটে সৈন্য।

সত্যি কথা বলতে গেলে, তালেবান কোনো ধর্মীয় মন্ত্রে দীক্ষিত হয়নি, কিংবা জাতীয়তাবাদীর অদম্য নেশাও তাদের পেয়ে বসেনি। এদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত বেতনে কাজ করে এবং মাদক সেবন করে। তাদের ব্যয়ের প্রধান উৎসগুলো হলো তাদের দখল করা অঞ্চলে উৎপাদিত পপি, আফিম ও অন্যান্য ড্রাগ বিক্রি করে আয়, যা তাদের নিয়ন্ত্রিত।

আমেরিকানরা এসব অঞ্চল পপি ও আফিমের পরিবর্তে বিকল্প ফসলের জন্য কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। তবে অঞ্চলগুলোর মানুষের নোংরা মানসিকতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের নেতাদের অনেক সন্তানের সঙ্গে অনেক স্ত্রী রয়েছেন এবং তাঁরা তাঁদের পরিবার ও বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও সংকটে রয়েছেন। তাঁদের বাচ্চারাও বর্তমানে স্কুলে পড়াশোনা করছে এবং মুঠোফোন, টেলিভিশন ও আধুনিক পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে সাধারণ জীবন যাপন করছে।

তালেবানদের বেশির ভাগই পশতুন, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের। তাজিক, হাজারা বা উজবেক জনবহুল অঞ্চল তালেবানদের অধিকার নেই এবং তারা যদি কাউকে খুঁজে পায়, তবে সাধারণ জনগণ তাদের হত্যা করবে। তালেবানরাও তাদের সঙ্গে একই কাজ করে। অন্যদিকে পশতুন পরোক্ষভাবে তালেবানদের সমর্থন করে। এটি মারাত্মক বিদ্বেষের এক রাজনীতি।

ধারণা করা হচ্ছে, তালেবান আফগানিস্তানের কোনো বড় শহর, এমনকি কাবুল, হেরাত, জালালাবাদ, মাজার-ই-শরিফ, কান্দাহার এবং কুন্দুজও দখল করতে সক্ষম হবে না। তালেবানরা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধেও অনেক ক্লান্ত। তারাও শিগগিরই ফলাফল পেতে চায়। অন্যথায় যদি খুব শিগগির কিছু না ঘটে, তবে তাদের অনেকেই যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে চলে যাবে। তারা সবাই জানে যে তারা ইরান ও পাকিস্তান বাদে এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন পাবে না।

বর্তমানে আফগানিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার এবং তাদের রয়েছে পর্যাপ্তসংখ্যক আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদসহ বিমানবাহিনী। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের স্পেশাল অপারেশন ফোর্স। আমেরিকানরা অত্যাধুনিক রসদ, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছে। তালেবান সেনার সংখ্যা নিয়ে প্রচুর বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকের মতে, এই সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার হতে পারে। একটি বিশেষ শহর দখল করতে এসব বাহিনীকে এক করা তাদের জন্য কঠিন হবে। এটি একটি সত্য যে আমেরিকানরা আফগানিস্তান ছাড়ার পরও তারা তালেবানকে যুদ্ধের মাধ্যমে পুরো দেশ দখল করতে দেবে না।

এটা হতে পারে ৬০/৪০-এর মতো ক্ষমতার ভাগাভাগি, যেখানে বর্তমান সরকারের ৬০ শতাংশ এবং তালেবানদের ৪০ শতাংশ থাকবে। ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে কিছু মন্ত্রণালয়, প্রাদেশিক গভর্নরের পদ এবং কিছু সংস্থার পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে আফগানিস্তানে তালেবানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া, রাশিয়ানদের জন্য তাজিকিস্তান, চীনের জন্য উইঘুর, ভারতের পক্ষে কাশ্মীর এবং অন্য অনেক দেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা তালেবানদের পক্ষে সম্ভব হবে না এ কারণে যে আফগানিস্তান পুরোপুরি পশ্চিমা অর্থের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সমস্ত উন্নয়ন সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে তহবিল বন্ধ করে দেবে।

প্রচারযন্ত্র ব্যবহারে আফগান সরকার অত্যন্ত দুর্বল। তবে তালেবান একেবারে বিপরীত। যেখানে তালেবানরা শূন্য থেকে ১০০ দেখায়, সেখানে সরকার প্রায় নীরব। তালেবানদের সঙ্গে তাদের লড়াইয়ের ফলাফল প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে আসছে না। জনগণের জন্য তারা যে যথাসম্ভব সবকিছুই করছে, সেটা সরকারকে জানাতে হবে। সেনাবাহিনীর প্রধান প্রধান যানবাহন এবং কাফেলা আজকাল আর কাবুলে চলাচল করছে না। ফলে সাধারণ জনগণ বুঝতে পারছে না, যেকোনো আক্রমণ সম্পর্কে সরকার সজাগ রয়েছে। কৌশলগত সম্পদের ১০ শতাংশ সংস্থানও যে তালেবানদের হাতে নেই এবং সরকারের কাছে যে সমস্ত আধুনিক অস্ত্র, সরঞ্জাম এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী রয়েছে, সেটা তারা জনগণকে বোঝাতে পারছে না। তবে সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এখনো সব দল একসঙ্গে বসে সম্মিলিত হওয়ার বিষয়ে একমত হলে আফগানিস্তানের আশার আলো রয়েছে।