ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

জাতিসংঘ কি স্রেফ বুলিসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে?

আহনাফ তাহমিদ
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ মঙ্গলবার, ০৩:০০ পিএম
জাতিসংঘ কি স্রেফ বুলিসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে?

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মহৎ।  আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা সংরক্ষণ এবং এতদুদ্দেশ্যে শান্তিভঙ্গের হুমকি নিবারণ ও দুরীকরণের জন্য, এবং আক্রমণ অথবা অন্যান্য শান্তিভঙ্গকর কার্যকলাপ দমনের জন্য কার্যকর যৌথ কর্মপন্থা গ্রহণ, এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক বিরোধ বা আইনের নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আন্তর্জাতিক বিরোধ বা শান্তিভঙ্গের আশঙ্কাপূর্ণ পরিস্থিতির নিষ্পত্তি বা সমাধান; বিভিন্ন জাতির মধ্যে সমঅধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতির ভিত্তিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রসার এবং বিশ্বশান্তি দৃঢ় করার জন্য অন্যান্য উপযুক্ত কর্মপন্থা গ্রহণ; অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা মানবিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিকাশ সাধন এবং মানবিক অধিকার ও জাতিগোষ্ঠি, স্ত্রী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মৌল অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উৎসাহ দান।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? যে চিন্তাধারা নিয়ে জাতিসংঘ তার যাত্রা শুরু করেছিল, সে যাত্রা কি এখনও অব্যাহত আছে? বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যকার বিবদমান যে পরিস্থিতি, সেগুলো কি তারা একটু হলেও স্তিমিত করতে পেরেছে? জাতিসংঘের “আশঙ্কা প্রকাশ” করা ছাড়া তো আমরা কার্যকর আর তেমন কোনো কার্যাবলি দেখতে পাচ্ছি না। বরং বিভিন্ন মোড়লের দোর্দন্ড প্রতাপের ফলে জাতিসংঘ যেন তার মূল সুরটিই আজ হারিয়ে ফেলেছে। 

জাতিসংঘের পাঁচটি বড় বড় ব্যর্থতার কথা যদি আমরা বলতে চাই, তাহলে প্রথমেই বলতে হবে রুয়াণ্ডাতে হুতু এবং তুতসিদের মধ্যকার বিরাজমান সমস্যার কথা। ১৯৯৪ সালের এই গণহত্যায় ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় ৮ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যরা তখন সেখানেই অবস্থান করছিল কিন্তু তাদেরকে কোনো কাজ করতে দেয়া হয়নি। তুতসিদের যখন কচুকাটা করা হচ্ছিল, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যরা স্রেফ কাঠপুতুলের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। 

২০০৩ সালে সুদানে এসে দেখা যায় মিলিটারি শাসকরা জাঞ্জাবিদদের দারফুরে অবস্থানকারী সংখ্যালঘুদের নির্বিচারে হত্যা করার নির্দেশ দিচ্ছে। প্রায় তিন বছর পর দেশটিতে শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্যদের প্রেরণ করা হয়েছিল। ততদিনে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ খুন হয়েছে। 

এছাড়াও খেমার গণহত্যার কথাও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। পল পটের শাসনের অধীনে প্রায় ২০ লক্ষেরও অধিক কম্বোডিয়ানকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ৮ হাজারেরও বেশি বসনিয়ান নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় বসনিয়ান-সার্বিয়ান ফোর্সের অধীনে। প্রায় ৭০০ ডাচ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্রেফ কীর্তি দেখেছে। তারা কোনো ভূমিকাই পালন করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। 

এছাড়া ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘ কার্যকর কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারছে না। বিভিন্ন দেশগুলো তাদের ইস্যুগুলো নিয়ে ময়দানে এর-ওর পায়ে বল ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘের নীরব দর্শক হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো কিছু করার নেই। 

মিয়ানমার সঙ্কটে সামরিক জান্তা যখন রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করে মিয়ানমার থেকে তাড়িয়ে দেয়, তখনও জাতিসংঘ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের অধিবেশনে বারবার এই দাবি উত্থাপিত করেছে যে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের পক্ষে এত মানুষের চাপ বহন করা সম্ভব নয়। বিশ্বের অপরাপর ধনী দেশগুলোও যেন সামনে এগিয়ে আসে। জাতিসংঘ এখানেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি চাপ প্রয়োগ করায় কিংবা মীমাংসা করায়। মিয়ানমার জান্তা সরকারকে টলানোর জন্য কিংবা রোহিঙ্গাদের নিজদেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য জাতিসংঘ কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। 

গত ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছে তালেবানরা। সেখান থেকে মার্কিন এবং ন্যাটো সৈন্যরা সরে যাবার পর থেকেই তারা নতুন করে শুরু করেছে অনাচার। নারীরা অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে এলে তাদের ওপর করছে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং সংবাদকর্মীদের ওপর করছে অবর্ণনীয় নির্যাতন। এছাড়াও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের ওপর তারা আনছে নানা ধরণের নিয়মকানুন। মোট কথায়, মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোনো কাজ বাদ রাখতে তারা কসুর করেননি। এখানেও মানবাধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের কোনো ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। 

মোট কথায়, জাতিসংঘ স্রেফ একটি কথাসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে বিবদমান যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো সমাধানে জাতিসংঘ যদি আরও ব্রতী না হয়, তাহলে সংস্থাটি পরিপূর্ণভাবে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।