ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৪ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তালেবান শাসনে ফুলে উঠছে আফগানিস্তানের আফিম অর্থনীতি!

লুৎফর রহমান
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ শনিবার, ০৮:০২ পিএম
তালেবান শাসনে ফুলে উঠছে আফগানিস্তানের আফিম অর্থনীতি!

কাবুলিওয়ালার দেশ আফগানিস্তান এক রহস্য ঘেরা দুরূহ প্রাচীর। এখানকার মানুষ কখনই বাহিরের কারো কথা শোনার জন্য প্রস্তুত নয়। তালেবানের আবারো নতুন করে ক্ষমতার শিখরে চলে আসা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আর এই তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসার পর যে জিনিসটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা বিষয় তা হল আফগান অর্থনীতি। ২০ বছর ধরে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি তার সামনের দিনগুলো কীভাবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে সেই প্রশ্ন এখন সবার মাঝে। অতীত ইতিহাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আফগান অর্থনীতির প্রসঙ্গ সামনে এলে যে জিনিসটি সবার মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠে তা হল আফিম বাণিজ্য।

ইসলামে আফিম বা যে কোনও ধরনের মাদক সেবন ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ। সেখানে পরিসংখ্যান বলছে মুসলিম শাসিত আফগানিস্তান হচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশ। জাতিসংঘের এক হিসাব মতে আফিম চাষের থেকে প্রতিবছর ১২০ কোটি ডলার থেকে ২১০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করে আফগানিস্তান। যা সে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬-১১ শতাংশ।

আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে আফিমের অবদান সংখ্যার হিসেবে দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এর প্রভাব এইটাই বেশি যে কট্টরপন্থী ইসলামী শাসক দল তালেবানও আফিম চাষে কোন বাঁধা দেয় না। এর পেছনে আরো বড় কারণ হল তালেবানের আয়ের সব থেকে বড় অংশটিও আসে এই আফিম থেকেই। দুই দশক আগে তালেবান শাসন আমলে হু করে বেড়েছে আফিমের ব্যবসা। গত বিশ বছর ধরে মার্কিন প্রশাসনের ব্যাপক প্রচার ও অভিযানেও যা এক বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন হয় নি বরং তা আরো বেড়েছে কয়েক গুণ।

মার্কিন বাহিনী গত বিশ বছরে আফিম চাষে উৎসাহ হ্রাসে দেশটির আফিম চাষিদের মাঝে কোটি কোটি ডলারের প্রণোদনা প্রদান করেছে। তাদেরকে গম উৎপাদনে উৎসাহিত করে গেছে প্রতিমুহূর্তে। আফিম কালোবাজারিদের উপর আকাশ পথে হামলাও পরিচালনা করে গেছে অনেক। এর পরেও দেশটিতে আফিম চাষে কোন পরিবর্তন হয় নি। আমেরিকার আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ ইনস্পেক্টর জেনারেলের ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটিতে আফিম চাষ বন্ধ করার জন্য ৮৬০ কোটি ডলার খরচ করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থ দিন শেষে শুধু অশ্বডিম্বই উপহার দিয়েছে। আফগানিস্তান এখন সারা বিশ্বের মোট আফিমের ৮০ শতাংশ একাই উৎপাদন করে।

আমেরিকার এই সকল প্রচেষ্টা কতটা করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে তা একটি পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠে। আফগানিস্তানে ২০০১ সালে যেখানে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আফিম চাষ হত সেখানে ২০২০ সালে এসে সে জমির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর। 

জাতিসংঘ বলছে আফগানিস্তানের যে এলাকাগুলোতে আফিম চাষ হয় তার বেশিরভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিলো তালেবান গোষ্ঠীর কাছে। যার ফলে চাঁদাবাজির মাধ্যমে এ থেকে এক বিশাল অংকের মুনাফা অর্জন করতো তালেবান। আফগানিস্তানের কৃষক এবং সাধারণ জনগণ আফিমের উপর এত বেশি পরিমাণ নির্ভরশীল যে গত ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশটিতে আফিমের চাষ বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। এছাড়া দেশটির পাহাড়ি অঞ্চলে এখন আফেড্রা নামক এক গুল্মজাতীয় গাছের চাষ হচ্ছে যেখান থেকে ক্রিস্টাল মেথ নামে এক ধরনের মাদক তৈরি হচ্ছে। আর এর পুরোটাই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তালেবানের পক্ষে আফিম চাষ বন্ধ করতে তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি কোনদিন। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে আফগানিস্তানের অর্থনীতি আফিমের উপর কতটা নির্ভরশীল। আর বিশেষ করে তালেবানরা যখন মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, তখন তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থের মূল যোগান আসতো এই আফিম থেকেই। তালেবানের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাদক ব্যবসা থেকেই। বিবিসির এক রিপোর্ট বলছে, ২০১১ সালে আফিম চাষ থেকে বছরে ৪০ কোটি ডলার মুনাফা কামাত তালিবান। আর ২০১৮ সালের শেষে সেই মুনাফার ঝুলি বড় হতে হতে পৌঁছেছে ১৫০ কোটি ডলারে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, যেসব এলাকা তালিবানের দখলে ছিল, সেই সব এলাকায় আফিম চাষিদের থেকে ১০ শতাংশ করও কাটা হত।

আফিম চাষের সঙ্গে তালেবানের যোগের কথা কোনওদিনই প্রকাশ্যে স্বীকার করে না তালেবান নেতারা। বরং বারবার আফগানিস্তানকে আফিম মুক্ত করার কথাই বলে এসেছে তারা। আর কথায় কথায় ২০০০ সালে আফিম নিষিদ্ধ করার আইনের প্রসঙ্গ টেনে আনে। প্রথম পর্বের তালেবান রাজ শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগে ২০০০ সালে আফিম চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

মোল্লা ওমরের আমলে আফিম চাষ নিষিদ্ধ করতে কড়া আইন আনা হয়েছিল। এই আইনের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো আন্তর্জাতিক চাপ। তালেবানের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা আফিম চাষ বন্ধ করে দিবে এবং যারা পরবর্তীতে আফিম চাষ করবে তাদের বিরুদ্ধে শরিয়া মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আদতে যা ছিলো মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া। তালেবান শাসনের সূচনা লগ্নে যেখানে আফিমের উৎপাদন ছিলো ২ হাজার ২৫০ টন সেখানে তা ১৯৯৯ সালে এসে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৮০ টনে। এ থেকেই বোঝা যায় আসলে তালেবান কতটা সরল ছিলো তাদের কথার উপর। যদিও ২০০০ সালে তারা নতুন করে আইন প্রণয়ন করে যা আরো কঠোর ছিল। তবে বেশিরভাগ কূটনৈতিকদের বিশ্বাস ছিলো তারা এই আইন প্রণয়ন করেছিলো আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায় করার জন্য।

তবে একটি বড় অংশের মতে, সেই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে আফিমের দাম কমতে শুরু করেছিল। আর তালেবানের মুনাফাও কমে যাচ্ছিল। সেই দাম বাড়াতেই আফিম চাষের উপর কিছুটা লাগাম টানতে চেয়েছিল তালেবান। আফিম মজুত করার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং তারপর চাষের পরিমাণ কমিয়ে নেওয়া — এই দুইয়ের উপর ভর করেই আবার আফিমের দাম বাড়াতে চেয়েছিল মোল্লা ওমরের সরকার।

তালেবানের ডেরা কান্দাহার প্রদেশ আফগানিস্তানের আফিম চাষের সবথেকে বড় কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটি। সংবাদসংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কান্দাহারে বছর পঁয়ত্রিশের এক আফিম চাষি মহম্মদ নাদিরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল মার্কিন প্রশাসন গম চাষের জন্য অনুদান দিলেও কেন তাঁরা আফিম চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। জবাবে ওই চাষি জানান, গম বা অন্যান্য ফসল চাষ করে তেমন লাভ হয় না। আফিমের চাষ থেকে তার আয় হবে ৩ হাজার ডলার। অথচ ওই জমিতেই গম চাষ করা হলে, আয় খুব বেশি হলে ১ হাজার ডলার। তবে এই আফিম চাষের টাকা তিনি একা ভোগ করতে পারবেন না। তালেবান ও চোরাচালানকারীদের ভাগ দিতে হবে।

দুই দশক পর ফের একবার আফগানিস্তানের তখতে তালেবান। তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সাংবাদিক বৈঠক করে দায়িছেন, নতুন সরকার আফিম চাষ শূন্য করে দেবে। আফিম চাষ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলতেই বিশ্ব বাজারে তড়তড়িয়ে বেড়েছে আফিমের দাম। সূত্রের খবর, তালিব সরকার আসার পর থেকে বিশ্ব বাজারে আফিমের কেজি প্রতি দর ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ২০০ ডলার পার করে গিয়েছে। আর এই অতিরিক্ত মুনাফা তালিবানের হাতে যে যাচ্ছে না, তা হলফ করে বলা যায় না।