ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজে ঘটতে পারে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২০ বুধবার, ০৫:০০ পিএম
‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সভ্য সমাজে ঘটতে পারে না’

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষিতে মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেছেন যে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোন সভ্য সমাজে ঘটতে পারে না। বাংলা ইনসাইডার এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।

প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে এবং যতদিন আমি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলাম আমরা সকল সময়ে যেকোন ধরণের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের নীতিগত অবস্থান ছিল এবং আমার সেই ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে কিন্তু আমি এখনো বিচ্যুত হইনি। আমি মনে করি বিচারবহির্ভূত কোন হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়া উচিত নয়। যদি কোন দেশ মনে করে যে, নূন্যতম সেখানে কোন আইনের শাসন রয়েছে এবং তাঁরা প্রশাসনের ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্র যা কিনা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত, সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা না হওয়া মানুষের মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনরকম স্থান থাকতে পারে না।

বর্তমানে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনাকে নিয়ে আমি বলবো যে, আমাদের এখানে যেহেতু আইনের শাসন বড্ড দূর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সংস্থাকে আমরা যেন জবাবদিহিতার উর্ধ্বে রেখেছি এবং কখনোই তাঁদের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করিনাই। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যখনই এমন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে, তাঁদেরকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বা কালোবাজারি- কোন একটা নাম দিয়ে একটা গৎবাঁধা একটা গল্প সাজিয়ে সেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছি। যেটা কখনোই একটা সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে উচিত হয়নি।

আমরা জানি যে, আমাদের সরকার, আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুবই জনদরদী একজন মানুষ, তিনি খুব আবেগী একজন মানুষ। মানুষের দুঃখ-কষ্টটা তিনি একেবারে নিজের অন্তরে গ্রহণ করেন। অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার মাকেও ফোন করে তিনি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। আমি যদি শেখ হাসিনাকে না দেখে আমি যদি শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী পদটাকে দেখি এবং যদি প্রশ্ন করি যে, মনে করুন গতমাসে জুলাইয়ে ৩১ দিনে ৩৬টি বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তাহলেই এই ৩৬ টির ক্ষেত্রে কি হয়েছে? সেখানে কি রাষ্ট্রের কেউ নিহতের পিতা-মাতাকে ফোন করে বলেছেন যে, আমরা এটার বিচারের ব্যবস্থা করবোই, যেমন করেই হোক, ন্যায়বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে? আমি যে কথাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম, কখনোই বিচার বহির্ভূত কোন কিছুকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। সেখানে কোন রকম স্বীকৃতি একটা সভ্য সমাজে থাকা উচিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘২০১১ সালে যখন লিমনের ঘটনাটি ঘটেছিল, সেখান থেকেও কিন্তু রাষ্ট্র শিক্ষা নিতে পারতো। কিন্তু লিমন ছিল দরিদ্র একজন দিনমজুরের ছেলে, তাই তাঁর একটি পা হারানোর ঘটনাটি রাষ্ট্রের কাছে অতটা গুরুত্ব পায়নি। এখন যেহেতু সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর নিহত হয়েছেন, তিনি যেহেতু ভিক্টিম, তাই এখন এটা আরো গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে এবং চিন্তা করার সুযোগ এসেছে যে, এরকম চলতে থাকলে এরকম আরো ঘটনা যে ঘটবে না এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। এই ঘটনাটি আমাদের জন্যে বিশাল সুযোগের সৃষ্টি করেছে এবং এই সুযোগটিকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে যে, আমি আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবো, অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবো নাকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে এবং তাৎক্ষণিক বিচারব্যবস্থা যেটা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো করে, সেই বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব থাকবে। এখানে আপনাকে যেকোন একটাকে বেছে নিতে হবে। এখানে দুটো নৌকায় পা রাখার কোন সুযোগ নেই।’