ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘বঙ্গমাতা কীভাবে টাকাটা দিয়েছিলেন, জেনেছিলাম বহু পরে…’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ০৪:৫৯ পিএম
‘বঙ্গমাতা কীভাবে টাকাটা দিয়েছিলেন, জেনেছিলাম বহু পরে…’

‘৩২ নম্বরের বাড়িটা যখন বানানো হচ্ছিল, তখন শেখ জামাল, শেখ কামাল একেবারেই ছোট। যতদূর মনে পড়ে নেত্রী তখন স্কুলের শেষের দিকে, নাইন টেনে হবে হয়তো। আমি প্রায়ই সেখানে যেতাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়, তখন আমি এক’ দু সপ্তাহ পরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল থেকে হেঁটে ৩২ নম্বরে যেতাম। গোপালগঞ্জের অনেক আত্মীয় অনাত্মীয় যাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না, তারা ৩২ নম্বরেই থাকতো। সেটা অনেকেই এখনও মনে রেখেছে। তবে কারও কারও মনে নাও থাকতে পারে। কারণ তারা এত বড় হয়েছেন যে, পেছনের ইতিহাস ভুলে গেছেন।’

কথাগুলো বলছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। সেই ষাটের দশকে কলেজ জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে যাওয়া আসা শুরু হয় তার। বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা দুজনকেই দেখেছেন খুব কাছ থেকে। এক কথায় বলতে গেলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের খুব কাছের লোক তিনি। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে বাংলা ইনসাইডারের মুখোমুখি হয়েছিলেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতাকে নিয়ে তার নানা স্মৃতির কথা। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে অপূরনীয় ক্ষতি সেটা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।  

বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে আলাপচারিতায় সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয় ১৯৬১ সালের দিকে। তখন আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি কেবল। তিনি তখন কিছু দিন জেলে থাকতেন, কিছুদিন বাইরে। তখন আমি মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, পায়ে ধরে সালাম করতাম। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। ঢাকা কলেজে আমি যখন আইএসসিতে ভর্তি হয়েছি, তখন থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হবো। বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেই তিনি লেখাপড়া কেমন চলছে জিজ্ঞেস করতেন। একদিন তাকে আমি বলে ফেলেছিলাম যে আমার ডাক্তার হওয়ার খুব সখ। এটা শুনে তিনি আমাকে বললেন, ‘ভালোভাবে লেখাপড়া করতে হবে, ডাক্তার হওয়া চাই’। এফআরসিএস করতে হবে, এ কথাটা প্রথমে বঙ্গবন্ধুই আমাকে বলেছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি সেটা করতে পেরেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে, আমি এফআরসিএস করে দেশে ফেরার আগেই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল।

স্মৃতিকাতর হয়ে বঙ্গমাতার বিষয়ে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিপদে আপদে যেকোনো সাহায্যের দরকারে তাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জনাব আবদুর রাজ্জাকের বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিলেন বঙ্গমাতা। একটা ঘটনার কথা বলি।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ের ঘটনা এটা। তখন আমরা এই মামলার বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করতে একটা লিফলেট ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। যতদূর মনে পড়ে, সিরাজুল আলম খান আমাকে লিফলেটের ড্রাফটটা তৈরি করে দিয়ে বলেছিলেন, এটাকে ছাপাতে হবে। তিনি এটাও বলেছিলেন যে, ‘টাকা পয়সা তো কোথাও পাচ্ছি না, ছাপাবো কী করে? দেখ বেগম মুজিবের কাছে গিয়ে কোনো টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করতে পারো কিনা’। আমি বঙ্গমাতার কাছে গেলাম। লিফলেটটা ছাপিয়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বোধহয় তখন ৬০ বা ৬১ টাকার মতো দরকার হতো। বঙ্গমাতা আমাকে ১১০ টাকা দিলেন। বহু দিন পরে আমি জানতে পেরেছিলাম বঙ্গমাতা নিজের গয়না বিক্রি করে টাকাটা দিয়েছিলেন। এটা শুনে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। এভাবে অসংখ্য মানুষকে টাকা দিয়েছেন বঙ্গমাতা। সে সময় যারা ছাত্রলীগ করতো বা আওয়ামী লীগ করতো তারা বঙ্গমাতাকে দেখেনি বা তার হাতে এক কাপ চা খায়নি, কিংবা তার সাহায্য সহযোগিতা পায়নি, এমনটা হতে পারে না। জাতির পিতার যোগ্য সঙ্গী ছিলেন বঙ্গমাতা। আমরা যতকিছুই বলি না কেন, যতভভাবেই বলি না কেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘জাতির পিতা’ হওয়ার পেছনে বঙ্গমাতার যে অবদান তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

জাতির পিতার বিদায়ের ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি সে প্রসঙ্গে ষাটের দশকের এই ছাত্রনেতা বলেন, দলমত নির্বিশেষে যাদের সামান্য জ্ঞান আছে, তারা প্রত্যেকে এটা বিশ্বাস করে যে, ১৯৭৫ এ ষড়যন্ত্রকারীরা যদি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করতে না পারতো, তাহলে বাংলাদেশ এখন আরও অন্তত ১০০ বছর এগুনো থাকতো। বাংলাদেশের সাথে এখন সাথে সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার নয়, বরং জাপান বা জার্মানির তুলনা হতো। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে মাত্র তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় থেকে জাতির পিতা প্রতিটা সেক্টরকে যেভাবে সাজিয়েছিলেন এমন নজির সারা বিশ্বে আর পাওয়া যাবে না। পুরো দেশটাই ছিল ধ্বংসস্তূপ, সেই সঙ্গে প্রতিটা পদে পদে ছিল বিপদের গন্ধ। বিষয়টা এমন ছিল যে, ব্রিজ কালভার্ট ঠিক করতে হবে, আবার সমুদ্রে কোথায় মাইন পুঁতে রাখা আছে, সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। মানুষের মুখে খাবারও তুলে দিতে হবে, নিরাপদ রাখতে হবে সবাইকে। এত এত সমস্যার মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল নিয়ে ভাবাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। কিন্তু জাতির পিতা সব দিক সামলে এটা নিয়েও কাজ করেছিলেন।

ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, জাতির পিতা কৃষি গবেষণার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটার ফল আমরা এখন পাচ্ছি। আমরা কেউই ভাবতে পারিনি যে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। কিন্তু এখন সেটা বাস্তব।

জাতির পিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন বাঘা বাঘা অনেক রাজনীতিবিদই ভাবতেন, পার্টিতে একটা পোস্ট পাওয়া, অথবা এমপি- মন্ত্রী হওয়া, এটাই অনেক বড় কিছু। বঙ্গবন্ধুর সাথে অন্যদের পার্থক্যটা ছিল এখানেই। তিনি মন্ত্রী, এমপি হওয়াটাকে গুরুত্ব দেননি। এটাই তার বিশেষত্ব। দলের জন্য তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। দলকে সংগঠিত করা এবং বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশ করাটাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশ্বে খুব কম রাজনীতিবিদই এমনটা করতে পেরেছেন।

ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, বড় বড় রাজনীতিবিদরা ৭০ ৮০ বছরে যেটা না করতে পারে, বঙ্গবন্ধু সেটা একেবারে স্বল্প সময়ে করে ফেলেছিলেন। দেশের সমস্ত উন্নয়নের বীজ তিনিই রোপন করে গিয়েছিলেন। আমরা সেটার ফল এখন ভোগ করছি। যে কাজগুলো তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেননি সেগুলো এখন এগিয়ে নিচ্ছেন তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের দেশের মানুষের দ্বিমুখী আচরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা অনেকেই বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে নিয়ে সমালোচনা করি, কিন্তু খুঁজলে দেখা যাবে, যারা এই সমালোচনাগুলো করছেন, তারা কোনো না কোনোভাবে এই পরিবারটির কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছেন। আমি অবাক হয়ে দেখি যে, যারা জননেত্রীর দয়ায় আজ কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই বলছেন, এটা করা হয়নি, ওটা করা হয়নি, এটা করা উচিৎ ছিল, ওটা করা উচিত ছিল।  বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোথায় কী ভুল আছে, আমরা তা নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত। কিন্তু জাতির পিতা এবং জননেত্রী এ দেশের চেহারা যে আমূল পাল্টে দিয়েছেন, আমরা সেটা নিয়ে কথা খুব কমই বলি। সমালোচনা করা ভালো, কিন্তু একপেশে সমালোচনা এবং সমালোচনার নামে মিথ্যার ফুলঝুড়ি ছোটানো ঠিক না। জাতির পিতা না থাকলে আমরা বাংলাদেশটাই পেতাম না। দ্বিমুখী আচরণ না করে আমরা যদি জাতির পিতার স্বপ্নগুলোকে মনে প্রাণে ধারণ করতে পারতাম, এবং সে অনুযায়ো কাজ করতে পারতাম, তাহলে আমাদের দেশটা নিঃসন্দেহে আরও এগিয়ে যেত।