ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যাবে না’

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ০৪:০০ পিএম
‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যাবে না’

 

করোনা সংকটে জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এলেও স্থবির হয়ে আছে শিক্ষাখাত। করোনাকালীন সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নানা সমস্যা ও এ থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা ইনসাইডারের নিজম্ব প্রতিবেদক মির্জা মাহমুদ আহমেদ

বাংলা ইনসাইডারঃ করোনা সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে শিক্ষা খাত। এই সংকট থেকে উত্তরণে করণীয় কী?

মীজানুর রহমানঃ শুধু শিক্ষা খাত নয়, করোনা আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, পারিবারিক বা সামাজিক জীবন সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। করোনায় যে সকল সেক্টরগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর মধ্যে একটি হলো শিক্ষা। মার্চ মাসের শুরু থেকেই এবং আজ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্ম্পূণ বন্ধ আছে। অনান্য সেক্টরে ইন্ডাষ্ট্রিতে, শিল্পে বা ব্যবসা বানিজ্যে টুকটাক কাজ চললেও এবং খুললেও এখন পর্যন্ত আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে পারছি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্রুত খোলার কোন সম্ভাবনাও দেখছি না। আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয় যৌথভাবে অনলাইন ক্লাস চালু করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে প্রথম প্রথম সবারই একটু আপত্তি ছিলো। ইভেন আমিও বলেছিলাম অনলাইন পড়াশোনা কখনো অন ক্যাম্পাস পড়াশোনার বিকল্প হতে পারে না। অনলাইন পড়াশোনা অন ক্যাম্পাসের বিকল্প হলে পৃথিবীর উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্যামব্রিজ, হার্ভাড,অক্সফোর্ড তারা কেউই অন ক্যাম্পাস পড়াশোনা চালু রাখতো না। অনলাইনেই ক্লাশ করাতো। তাঁদের প্রযুক্তিও আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। কিছু পড়াশোনা আছে যেখানে কারিগরী বিষয় থাকে; যেমন মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান প্র্যকটিক্যাল যেখানে আছে সেখানে অনলাইনে পড়ানো সম্ভব নয়।

একটা পর্যায়ে বিবেচনা করা হলো একেবারেই যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ না থাকে তাহলে ছাত্ররা পড়াশোনা থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ড্রপ আউট বেড়ে যেতে পারে, শিক্ষার্থীরা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেই বিবেচনা থেকেই আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। দুই তিন মাস পর্যন্ত আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি নাই। এপ্রিল মে মাসের দিকে এসে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাস নেয়া শুরু করছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাধমিক স্কুলগুলোও অনলাইনে ক্লাস নেয়া শুরু করে। সারা পৃথিবীতে যখন অনলাইনে ক্লাস নেয়া শুরু হয়েছে তখন বাংলাদেশেও অনলাইনে ক্লাস নেয়া শুরু হয়েছে। টেকনিক্যাল কারণে বাংলাদেশে অনলাইন ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ কারো তেমন প্রশিক্ষণ ছিলো না। শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত ছিলো না। ওই ধরনের ডিভাইসও ছিলো না। এখন দেখা যাচ্ছে অনলাইন ক্লাসে মোটামুটি ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকছে। প্রথম প্রথম শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম ছিলো এটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবে অন ক্যাম্পাস ক্লাসেও ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে না। সেই বিবেচনায় অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থী উপস্থিতি সন্তোষজনক। যারা অনলাইন ক্লাস থেকে বাদ পড়েছে তাঁদের কথাও আমাদের চিন্তা করতে হবে। অনেকেই নেটওর্য়াক এর আওতায় আসে নাই। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকার কারণে অনলাইন ক্লাস নেয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকার রেডিও-টেলিভিশনে সম্প্রচার শুরু করেছে।

আমরা যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, গত সেমিস্টার যেটা জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিলো। সেই সেমিস্টারের কিছু ক্লাশ হয়েছিলো বাকী ক্লাশগুলো আমরা অনলাইনে নিয়ে নিব। কিন্তু পরীক্ষা নিব না। কারণ অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার মতো পরিবেশ এখনো আমাদের দেশে তৈরি হয় নাই। আইন-কানুনের কিছু বিধি নিষেধ আছে; ইচ্ছে করলেই অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া যায় না। আইন পরিবর্তন না করে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া যাবে না। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।

জুলাই-আগষ্টে সেকেন্ড সেমিস্টারের ক্লাশ ইতিমধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের শেষের দিকে ডিসেম্বর বা জানুয়ারীতে একটা স্বাভাবিক অবস্থা আসবে। শিক্ষার্থীরা যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজে আসবে তখন তাদেরকে এই সেমিস্টারের প্র্যাকটিকাল ক্লাস বা অসম্পূর্ণ ক্লাসগুলো নেয়া হবে। এছাড়াও গত সেমিস্টারে যা পড়ানো হয়েছিলো এগুলোর ওপরে রিভিউ ক্লাস হবে। তারপর দুই সেমিস্টারের পরীক্ষা একসাথে নেয়া হবে। এটাই এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের  চিন্তাভাবনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সেই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সব রকমের প্রস্তুতি ছিলো। কিন্তু পরীক্ষা দিতে না পারায় এবং পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। সেটা বিলম্বিত হবে বোঝাই যাচ্ছে।

এখন বলা হচ্ছে অটো প্রমোশন দেয়া হবে, সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা হবে বা কম পরীক্ষা নেয়া হবে; আমি মনে করি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় এরকম কিছু করার সুযোগ নাই। কারণ আমাদের যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় তারা কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের পরে হাজারো হাজারো শিক্ষার্থী  বিদেশে পড়তে যায়। কোন শর্টকাট মেথডে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়া হলে পরে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পূর্নাঙ্গ সিলেবাস অনুযায়ী নিতে হবে।  সামাজিক দুরত্ব মেনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে আমি একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের সব ভালো ভালো স্কুল কলেজকে কেন্দ্র হিসেবে নিয়ে দুরত্ব বজায় রেখে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে যদি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে নেওয়া যায় তবে একটা বড় কাজ হবে। এটা করা না হলে আগামী বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি ব্যাহত হবে। যারা বাইরে পড়তে যাবে তারাও সমস্যায় মধ্যে পড়বে। এজন্য আমি মনে করি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূর্নাঙ্গ সিলেবাসের ওপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে নেয়া উচিত।

বাংলা ইনসাইডারঃ করোনার কারণে বহু বছর পর আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেশন জটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই সেশন জট নিরসনে কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে…

মীজানুর রহমানঃ সেশন জট আমরা অনেকটাই কমিয়ে এনেছিলাম। বলতে গেলে সেশনজট ছিলোই না। বিশ্ববিদ্যালয় যদি খুলে সেক্ষেত্রে আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে; বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ যে ছুটিছাটা থাকে সেসব ছুটি বাতিল করা হবে। শুধু সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। আর এখন তো সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা তখন শনিবারের ছুটি বাতিল করে দিব। সপ্তাহে ছয়দিন ক্লাশ নিব। এরপরও শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাশ নিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন। সারা পৃথিবী একই রকম সমস্যায় পড়েছে সেশনজট নিরসনে আমরা তাদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাবে। খুব সর্তকর্তার সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা যাবে না।

করোনা পরিস্থিতির যদি একেবারেই উন্নতি না হয় তবে; অনলাইন ক্লাশের ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করে ক্লাশ নেয়া হবে।

বাংলা ইনসাইডারঃ অনলাইন ক্লাস এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করছে বলে অনেকে মনে করছেন এ ব্যাপারে আপনার মত কী?

মীজানুর রহমানঃ মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বিল গেটসও বলেছেন, অনলাইন ক্লাসে বৈষম্য বাড়বে। স্বাভাবিক ভাবে আমাদের দেশেও অনলাইন ক্লাস বৈষম্য বাড়াবে। আমি আগেই বলেছি অনলাইন ক্লাস অন ক্যাম্পাস ক্লাসের বিকল্প না; বরং এটা মন্দের ভালো। সারা বিশ্বেই ইন্টারনেটের গতির তারতম্য আছে। সেজন্য সরকার অনলাইন ক্লাসের বৈষম্য কমাতে রেডিও-টেলিভিশনে ক্লাস সম্প্রচার করছে। কনটেন্টগুলো ইউটিউবে আপলোড হচ্ছে। ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রে গিয়েও কিন্তু ক্লাসের অ্যাসেস নেয়া যাচ্ছে। ক্লাসের কনটেন্ট যাতে শিক্ষার্থীরা ডাউনলোড করতে পারে সেজন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল ইমেইল ঠিকানা দিতে যাচ্ছে।  গ্রামীণ ও টেলিটক ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেয়া শুরু করেছে। ডিভাইস কেনার জন্য শিক্ষার্থীদের ঋণ দেয়ার ব্যাপারে ইউজিসি আমাদের কাছে নাম চেয়েছিলো। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা নাম পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি স্মাটফোন নাই এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কম। এরপরেও ডিভাইস কিনতে যাদের সমস্যায় আছে তাদের বিনা সুদে ঋণ দেয়া যেতে পারে। অনলাইন ক্লাস নিয়ে প্রথম দিকে যা সমস্যা ছিলো সেটা অনেকটাই কমে এসেছে।