ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

`১৬ মাসেও স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে আমরা কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না`

মো. মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২১ রবিবার, ০৪:০১ পিএম
`১৬ মাসেও স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে আমরা কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না`

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের জন্য তো লকডাউন দেওয়া হয় যাতে এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আমাদের প্রায় ১৬ মাস হয়ে গেলো বাংলাদেশে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে তো আমরা কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না। বাংলাদেশকে করোনার বিষয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না।

লকডাউন পরবর্তীতে করনীয়, করোনা মোকাবেলায় করনীয় সম্পর্কে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার নানা বিষয় নিয়ে বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেছেন অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। পাঠকদের জন্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলা ইনসাইডারের প্রধান বার্তা সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসান

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, লকডাউন একটি সাময়িক পদক্ষেপ। যখন করোনা সংক্রমণ উর্ধ্বগতি থাকে তখনই লকডাউন দেওয়া হয় করােনার সংক্রমণটাকে আটকিয়ে দিয়ে এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় কিভাবে। এটার কিন্তু সুফল আমরা পেয়েছি। গত বছরও পেয়েছি এবং এ বছর ৫ এপ্রিলে ২৩ শতাংশ ছিল যখন লকডাউন দেওয়া হলো কিন্তু এটা ধাপে ধাপে কিন্তু ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু যে সমস্যার কারণে বেড়ে গেলো সেই সমস্যাগুলো আমাদের রোধ করতে হবে। এবার যে দ্বিতীয় ঢেউটা হলো বাংলাদেশে বিশেষ করে দ্বিতীয় ঢেউ এর শেষ পর্যায়ে এখনো দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। গত মার্চ থেকে সংক্রমণ যে বাড়া শুরু করলো সেটাই এখনাে ওঠা নামা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং নিয়ম কানুন অনুযায়ী টানা দুই সপ্তাহ যখন সংক্রমণ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে যাবে তখনই আমরা বলবো যে নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। এছাড়াও কিন্তু আমরা বলতে পারি না। সে কারণেই ৭ শতাংশে নামার পরও আমরা সেটাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বলতে পারবো না। দ্বিতীয় ঢেউ এরই ওঠা নামা চলছে এবং গত কয়েকদিন ধরে তো শতাধিক মৃত্যু এবং সংক্রমণ ও ৩০ শতাংশের ওপরে হচ্ছে। 

তিনি বলেন, এখন নতুন করে যে করোনার আবার উর্ধ্বগতি হলো সেটি হলো গত ঈদে যাতায়াত করার জন্য। আর একটি বিষয় হলো যখন ভারতের দ্বিতীয় ঢেউ একেবারে পিকে চলে গেলো তখন ভারত সীমান্ত দিয়ে যে মানুষগুলো ঢুকলো এবং তারা ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সংক্রমণ নিয়ে ঢুকলো। ওই সময় সীমান্তবর্তী ৭ টা জেলাতে লকডাউন দেওয়া হলো ঠিকই কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা গেলো না। লকডাউন তো হটস্পটগুলোতে দেওয়া হয়। সেখানে হটস্পটের ভেতরে যারা আছে তারাও বের হবে না আবার বাইরে থেকে কোনো লোকও যাবে না। এটি হলো আইডিয়াল লকডাউন। যেটা করা খুবই ডিফিকাল্ট তারপরও আমরা যখন লকডাউন দেবো এবং চেষ্টা করবো এটা নিয়ন্ত্রণের তখন তো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রটা আমাদের দুর্বল। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রটা আমাদের দুর্বল। ২০২০ এর মার্চ থেকে যখন বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হলো তখন থেকে আজ পর্যন্ত কি আমরা স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করেছি? মানে নির্দেশনা অনুযায়ী শিথিল তো করি নি। তাহলে বাস্তবায়ন তো ঠিক মতো হলো না। এতো দিন তো মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে অভ্যস্ত হওয়া দরকার। 

বিএসএমএমইউ সাবেক উপাচার্য বলেন, এই যে লকডাউনটা দেওয়া হচ্ছে সেটাও স্বাস্থ্যবিধির চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য লকডাউনটা দেওয়া হয়। চারটি জিনিস আমরা মূলত বলি। একটি হলো নিয়ম মতো মাস্ক পড়তে হবে, ভালো করে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে, শারীরিক দূরত্ব কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব মেইনটেইন করতে হবে এবং ভীড় এড়িয়ে চলতে হবে। এটি হলো স্বাস্থ্যবিধির মূল কথা। সেটাই বাস্তবায়নের জন্য তো লকডাউন দেওয়া হয় যাতে এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আমাদের প্রায় ১৬ মাস হয়ে গেলো বাংলাদেশে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে তো আমরা কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না। বাংলাদেশকে করোনার বিষয়ে কিন্তু বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না। ব্যর্থতা যেমন বাংলাদেশে আছে সেই ব্যর্থতা অনেক উন্নত বিশ্বেও আছে। এখন পর্যন্ত এক নাম্বারে সব থেকে শক্তিধর দেশটিই আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দশটি দেশের মধ্যে ফ্রান্স আছে, রাশিয়া আছে, ইংল্যান্ড আছে ইউরোপ আছে এরা সবাই আছে প্রথম দিকে। সেই জায়গাটায় সবারই একই ধরনের পরিস্থিতি। কিন্তু উন্নত বিশ্বটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন চীন, চীন হলো আইডিয়াল। স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য চীন সব থেকে আইডিয়াল। আর কেউ পারে নি। প্রথম তিন মাসেই তারা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। আমাদের ওই জায়গাটায় প্রধান দুর্বলতা গত ১৬ মাসে যে, আমরা স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি নি।

তিনি বলেন, আমরা যদি এটি করতে পারতাম তাহলে আমাদের লকডাউন প্রয়োজন হতো না। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যারা লকডাউন দেয় নি। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এই সমস্ত দেশগুলো। তারা কিন্তু স্বাস্থ্যবিধিটা বাস্তবায়ন করেছে। স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করতে গেলেই সমাধানটা এর মধ্যেই। একদিকে লকডাউন, একদিকে স্বাস্থ্যবিধি, আরেকদিকে টিকা। টিকার এখন আমাদের সিরিয়াস ক্রাইসিস যাচ্ছে। আমরা এখন সব থেকে খারাপ অবস্থায় আছি বাংলাদেশ করোনা নিয়ে। টিকা দেওয়ার টার্গেট হলো ৮০ শতাংশ মানুষকে আমরা টিকা দিব। সেটা করতে কমপক্ষে এক বছর লগবে। আমি যত বেশি টিকা আনবো তত। এই মুহূর্তে আমার লক্ষ্যটা হলো মানুষকে বাঁচাতে হবে। সংক্রমণ বাড়লে মানুষ মরবে বেশি আবার সংক্রমণ কমলে মৃত্যুর হারটা কমে আসবে। এটি হলো সাধারণ কথা। 

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যেটা মনে করি তিন সপ্তাহ দেওয়া উচিৎ। তিন সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। লকডাউন এক সঙ্গে দেওয়া উচিৎ নয়। লকডাউন দেওয়ার সময় হটস্পট দেখে দেওয়া উচিৎ কিন্তু যেহেতু গোটা দেশ ছড়িয়ে পড়েছিল এই লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে। কিন্তু লকডাউন যখন তুলে নিবেন তখন ধাপে ধাপে তুলে নিতে হবে। এটাকে লকআউট বলে। এটা হলো এক। আমাদের মূল রক্ষাকবজ হলো স্বাস্থ্যবিধি মানা। এটা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। ফলে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। করোনার অবস্থা বাংলাদেশেও ভালো নেই আবার গোটা বিশ্বেও ভালো অবস্থায় নেই। ভারত কিন্তু মনে করছে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় ঢেউ উঠবে। ডেল্টা প্লাস নিয়ে তারা খুবই উদ্বিগ্ন। ইউরোপেও একই অবস্থা। তারা মনে করছে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ শুরু হবে এবং শেষ দিকে গিয়ে ৯০ শতাংশ লোক আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অলরেডি ব্রিটেনে শুরু হয়ে গিয়েছে। গত ৩০ জুন ২৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে লকডাউন চলছে। জাপানে তৃতীয় ঢেউ চলছে। সব জায়গাতেই তো অবস্থাটা ভালো না। 

তিনি বলেন, সে কারণে আমরা যেটা বলি যে, আমাদের এখন বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নিতে হবে লকডাউন আছে, এই লকডাউনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন করা। সামনে ঈদ আছে এটি একটি বড় ধরনের সমস্যা। সেখানে মানুষের যাতায়াত করা যাবে না। যদি যেতে দিতেই হয় তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেতে দিতে হবে। বাস, লঞ্চ, প্রাইভেট কারে গাদাগাদি করে যেতে দিলে সংক্রমণ বাড়বে। আজকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ঢাকা জেলাতে সবথেকে বেশি সংক্রমণ। সে হিসেবে আমাদের হাসপাতালে সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সক্ষমতা যদি একবারে ফুরিয়ে যায় তাহলে চিকিৎসার বিশাল সংকট সৃষ্টি হবে। সে কারণে আমার কাছে মূল বিষয়টি মনে হয়, আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য সরকার যতদিন সরকার মনে করবে ততদিন করবে। এটা তো নির্ভর করবে সংক্রমণের ওপরে। সংক্রমণ যদি কমে যায় তাহলে আস্তে আস্তে লকডাউন উঠিয়ে দেবে। আর সংক্রমণ যদি না কমে তাহলে তো লকডাউন প্রত্যাহার করা যাবে না। লকডাউন আবার দীর্ঘদিন দেওয়া যাবে না। 

তিনি আরও বলেন, বাস্তবায়ন খাতে আমরা দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছি। মানুষকে মানানোর জন্য মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সে রকম দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে লকডাউনটা আমরা খারাপ বলবো না ভালোই চলছে। কিন্তু জনসম্পৃক্ততা দরকার। জনগণ যখন সম্পৃক্ত হবে, সামাজিক আন্দোলন তৈরি হবে সব কিছু ঠিকভাবে চলবে। এই জনসম্পৃক্ততাটা করা দরকার। তাহলে ১. লকডাউন প্রত্যাহার নির্ভর করবে সংক্রমণের হারের ওপর। ২. স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা করতে হবে। ৩. কর্মহীন মানুষ তাদেরকে প্রণোদনা এবং খাদ্য সহায়তা সরকারের সঙ্গে ধনী শ্রেণী যারা আছে তাদেরও সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। নইলে মানুষ ঘরে থাকবে কেনো? ৪. জনসম্পৃক্ততা। জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে আমরা সফল হবো।