ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অধরাই রয়ে গেলো রাজীবের স্বপ্ন

সাদিয়া খাতুন ইলমা, ফাহিম মুনতাসির জিহাদ
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৪:৫৪ পিএম
অধরাই রয়ে গেলো রাজীবের স্বপ্ন

‘রোজ রাতেই আমার ছেলে আমার স্বপ্নে আসে। মনে হয় যেন সত্যিই এসেছে। আর ঘুমাতে পারিনা। ছেলের স্মৃতিগুলো মনে করতে করতেই সকাল হয়ে যায়।’ এ যেন এক রূপকথা। কিন্তু না। আবার যেন রূপকথার চেয়েও কোনো অংশে কম না। ছেলেহারা এক মায়ের কথার কাছে রূপকথার গল্প যেন অর্থহীন। ‘মা’ এমন একটি শব্দ যার কাছে পৃথিবীর সকল সুখ হার মেনে যাবে। সুখের রানী সেই মা তখনই হার মেনে নেয় যখন তার স্বপ্ন দেখা সেই সন্তান, যে কিনা ভবিষ্যতে আর্মি অফিসার হবে- সে তার স্বপ্নেই হারিয়ে যায়। মায়ের সেই স্বপ্নের রাজা তার ছেলের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে আর্মি অফিসার হবে। ধীরে ধীরে স্বপ্নপূরণের জন্য এগিয়েও যাচ্ছিলো। কিন্তু ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই যেন কাল হয়ে আসে তার জীবনে।

ঘাতক বাস জাবালে নূর কেড়ে নিলো মায়ের বুক থেকে তার মানিককে। বাসের চাকার নিচে চাপা পড়ে গেলো মা- ছেলের সেই স্বপ্ন। অধরাই রয়ে গেলো সেই স্বপ্ন। হেরে গেলো এক মা। একজন নয়, রাজীবের মৃত্যুসঙ্গী ছিলো আরও একজন। আর তার নাম দিয়া খানম মিম। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় নিহত হয়েছিল শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২ শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজ্বী ও দিয়া খানম মিম। বলছিলাম নিহত সেই রাজীবের মায়ের কথা।

ঘাতক জাবালে নূরের বাসের চাপায় মা ছেলের সেই স্বপ্ন চাপা পড়ে গেছে। হেরে যাওয়া সেই মা আজও জেতার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। কবে আসবে সেই দিন। নাকি আসবে না?

মিম ও রাজীবের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের জন্য সারা দেশব্যাপী যে আন্দোলন হয়েছিল তা ছিল বিশ্বকে জানান দেওয়ার জন্য এক আন্দোলন। সেই আন্দোলনে বিশ্ব জেনেছিল রাজীব-মিমের কথা। এখন হয়ত ভুলেও গেছে। হয়তবা কোনো পরশপাথরে খোদাই করা হয়নি তাদের নাম। কিন্তু খোদাই করা রয়েছে যেন তার মায়ের হৃদয়ের সেই রক্তিম হৃদপিণ্ডে। এখনো ছেলের কথা মনে করলে চোখের জলে ভেসে যায় রাজীবের মায়ের আঁচলের সেই স্নিগ্ধ সুবাস। সবাই সেই রাজীবকে ভুলে গেলেও ভোলেনি সেই মমতাময়ী মা। হয়ত যতদিন বেঁচে থাকবে, এভাবেই মনে রাখবে তার ছেলেকে। প্রতি মুহূর্তে ছেলের অভাবে কষ্ট পাবে সে।

কিন্তু এমন ছিল না তাদের দিন। ছেলের জন্য আজ সে যতটা কষ্ট পাচ্ছে একসময় ঠিক ততটাই আনন্দ পেতো। কাউকে কষ্ট পেতে দিতো না। রাজীব সকলকে মাতিয়ে রাখতো আনন্দে। আজ সে সকলকে কষ্টের এক বিশাল বহর উপহার দিয়ে চলে গেছে অচেনা পৃথিবীতে। যেই পৃথিবীতে খুব ছোটবেলায় তার বাবা চলে গেছেন। বাবা চলে যাওয়ার পর রাজীবের সব আবদার ছিল বড়বোন কুলসুমকে ঘিরে। ভাইয়ের স্বপ্নটি পূরণ করার জন্য ঢাকায় এনেছিল তাকে। স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হবে। আর স্বপ্নপূরণ হলে ভাই পরিবারের সবাইকে খুব সুখে রাখবে। তাই সেই স্বপ্নের ছোঁয়া বাস্তবে রূপান্তর করতে বোনের কাছে আসা। কিন্তু সেই বোনও জানতো না আদরের রাজীব তার স্বপ্নের বিনিময়ে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে বিমানবন্দর সড়কটি। যেই সড়কের প্রতিটি ইট সাক্ষী ছিল রাজীবের পথচলার।

রাজীবের পথচলার নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল তার বন্ধু মাহফুজ হাসান রাহাত। একে অপরের গানেরও সঙ্গী তারা। কাকতালীয়ভাবে তাদের বন্ধুত্বটা তৈরি হয়েছিল, তেমনি চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেছে সব। বন্ধুর ফোন নাম্বারটি আজও তার ফোনে সেইভ করা, কিন্তু আর কোনো ফোন আসেনা। হয়ত আর কখনো দুইবন্ধুর হাঁটা হবে না ওই রাস্তাটিতে। এটাই হয়ত নিয়তি!

সবার এই অদ্ভুত অপেক্ষা দেখে রাজীবেরও ভালো লাগছে। যে কখনো কাউকে কষ্ট দিতো না, সে এখন সবাইকে কষ্টের এক বিশাল সাগরে ভাসিয়ে পরপারে সুখেই দিন কাটাচ্ছে। রাজীব ও মিমের পরিবারের মতো না জানি আর কত পরিবার কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে।

মীম, রাজিবের সাথে সেদিন আর যেই ৬জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছিল, তারা আজও সেই ভয়াবহ দৃশ্য ভুলতে পারেনি। রাজীব-মীমের জীবনের বিনিময়ে পাশ হয়েছিল সড়ক আইন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শহীদ বীর বিক্রম রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজকে ৫টি বাস উপহার দিয়েছেন। তাদের জীবনের বিনিময়ে যে সড়ক আইন পাশ হয়েছে তার প্রভাব জনজীবনে বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে তা জানার জন্য শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থী শান্তা মনিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, সড়ক আইন পাশ হলেও তা কার্যকর এবং বাস্তবায়নে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তারা এখনো নিরাপদ সড়ক পায়নি। এক্ষেত্রে সরকারের যেমন যথাযথ আইন প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও দায়ী। ভালো নেই রাজীবমীমের পরিবার। কষ্টকে নিত্যদিনের সঙ্গী করেই তাদের দিন কাটছে।

আমরা আর কোনো রাজীব-মীমকে হারাতে চাই না। জনগণ চায় না আর কোনো রাজীব-মীম বেলাশেষে এভাবে ঝরে পড়ুক। ঘাতক পরিবহনগুলোর জন্য ঝরে পড়ছে হাজারো রাজীব-মীম। প্রতিনিয়তই কাড়ছে প্রাণ, মেরে ফেলছে স্বপ্ন। হয়ত রাজীব তার মায়ের স্বপ্নে এসে হাতছানি দেয় এই বলে যে, ‘মা, তোমার আর কোনো সন্তান যেন অকালে ঝরে না পড়ে। তাদের স্বপ্ন যেন পূর্ণ হয়। দেশবাসী যেন বেলাশেষে অধরা এক স্বপ্নের রূপকথা আর না শোনে।

লেখক: সাদিয়া খাতুন ইলমা
বয়স: ১৮
উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষ, শহীদ বীর বিক্রম রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল

ফাহিম মুনতাসির জিহাদ
বয়স: ১৬
দশম শ্রেণী, বাউনিয়াবাঁধ আইডিয়াল হাই স্কুল