ঢাকা, রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কি হবে কালশী বাউনিয়াবাঁধ বস্তির ভাসমান মানুষদের ভবিষ্যৎ?

জাকারিয়া আজিজ আরাফাত, শাহেদ আহমেদ মোহন
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৫:৫৯ পিএম
কি হবে কালশী বাউনিয়াবাঁধ বস্তির ভাসমান মানুষদের ভবিষ্যৎ?

ছোট ছোট কাঠের টং ও মাচা গড়ে উঠছে। ফুটপাতে প্লাস্টিক বর্জ্য বা ভাঙারির ছড়াছড়ি। অর্ধশতাাধিক ঘরের নির্মাণ কাজ চলছে। সড়কের পাশেই খালের উপর গড়ে উঠছে এসব কাঠের টং ও টিনের ঘর।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া টিনগুলো সরিয়ে নতুন করে তারা আবার উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করছে। এতক্ষণ যে দৃশ্যপটের বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার দর্শন পাওয়া যাবে কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তি এলাকায়।

একরাতের ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিয়েছিল চার শতাধিক মানুষের সহায়সম্বল। ঘরের আসবাবপত্র ও জিনিসপত্রের সাথে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল তাদের হাজারো স্বপ্ন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার রাতে। সম্প্রতি শিশু জিহাদের (১২) এর কাছ থেকে জানা যায়, ঐ অগ্নিকাণ্ডে বই-খাতা পুড়ে যাওয়ায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সে। না চাওয়া সত্তে¡ও খেলাধুলা ছেড়ে লেগুনায় হেল্পার হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে সংসারে সৃষ্ট আর্থিক সমস্যার পাহাড়ের উচ্চতা কিছুটা হলেও কমানোর জন্য। এখনো সে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে সেই রাতের অগ্নিকাণ্ডের কথা মনে পড়লে।

পাশেই নতুন তোলা দোকানঘওে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন শাহজাহান ব্যাপারী (৪০)। তিনি বলেন, চেকবই আর আইডি কার্ড পুইড়া গেছে। ঘর তুলতে যে টাকা লাগবো, ব্যাংক থেকে উঠামু কেমনে? এইজন্য লাভে টাকা ঋণ নিছি। কার্ড ও কাগজ উঠাইতে ব্যাংকে গেছিলাম। তারা অনেক ঘুরাইতেছে।’

হাজেরা বেগম (৩৫) বলেন, জরুরি কাগজপত্র পুড়ে গেছে। অন্যদের কাছ থেকে পরনের কাপড় পরতে হয়। কামাই রোজগার নাই। ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিতে পারি নাই। ভাড়াবাড়িতেও থাকার সামর্থ্য নাই।’

মনির হোসেন (৩৫) বলেন, তিনি এ বস্তিতেই বেড়ে উঠেছেন। ভাঙারীর দোকান পুড়ে যাওয়ায় গত দুইমাস যাবৎ বেকার তিনি। দোকান উঠলে মহাজন তাকে কাজ দিবে। 

রাহিমা বেগম (৩৭) বলেন, ‘মাইয়ারে স্কুলে পড়াইতাম। জানুয়ারি মাসে ভর্তি চলাকালীন সময় টাকার অভাব ছিল। থাকনের জায়গাও নাই। কি আর করমু? এভাবেই দোটানার সৃষ্টি হওয়ায় মেয়ের শিক্ষা বাদ দিয়ে মাথাগোজার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাকে প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। এখন নতুন করে ঘর তোলার জন্য চড়া সুদে ঋণ এনেছেন বলে জানান তিনি।

ফজল মিয়ার (৬০) কাছ থেকে জানা যায়, তার দুটি গরু আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার ধারণা, বস্তিতে বিদ্যুৎ এর অবৈধ সংযোগের কারণেই অগ্নিকাণ্ডের সূচনা।

এই বস্তিতে চারশতাধিক লোক বসবাস কওে আসছে। বস্তির ঘরগুলো ঘিঞ্জিমতো। একটির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া। ফাঁকা জায়গা বলতে গেলে নেই। একটি কক্ষে অনেকে ঠাসাঠাসি করে থাকেন। প্রায় অধিকাংশই নিম্নআয়ের নদীভাঙা লোকের বসবাস। কেউ গার্মেন্টসকর্মী, কেউ রিকশাচালক, কেউবা দিনমজুর। ভাঙারির ব্যবসায়ী ও গৃহকর্মী হিসেবেই এরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। জীবনে নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরু করতে হচ্ছে এই বস্তিবাসীদের। এদের আর কোথাও যাওয়ার ঠাঁই নেই।

নতুন করে ঘর ওঠানোর বিভিন্ন জায়গা থেকে চড়াসুদে টাকা ধার করেছে অনেকেই। স্কুলগামী শিশু জোনাকী (১৩), মনির (৯), কাওসার (১৩), রহিম (৯), তানিয়া (১১) সহ আরও অনেকের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে তাদের বাবা-মা শিশুশ্রম করাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই ভাসমান শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব কে নেবেন? যদিও এনজিও এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে যৎসামান্য সাহায্য দেওয়া হয়েছে। তবুও এদের আবাসনের প্রশ্ন থেকেই যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, ‘মুজিববর্ষে কেউ গৃহহারা থাকবে না। সবার আবাসনের ব্যবস্থা হবে।’

তবে ভাসমান এই মানুষগুলো আজ বাদে কাল কোথায় যাবে যদি এই বস্তিটি কোনো কারণে না থাকে? শুধু তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে কোনো স্থায়ী বাসস্থানের কোনো পদক্ষেপ কি কর্তৃপক্ষ বা সরকার নেবে? কারণ যে সাহায্য দেওয়া হয়েছে তা তাদের চাহিদার তুলনায় নগণ্য। সরকার কি তাদের ভাসমান জীবনে স্থায়ী বসতির ব্যবস্থা করে তাদের জীবনযুদ্ধে একটুখানি মানবিক ও মানসম্মতভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেবে?

 

লেখক: জাকারিয়া আজিজ আরাফাত

বয়স: ১৯, সম্মান প্রথম বর্ষ, বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ

 

শাহেদ আহমেদ মোহন

বয়স: ১৪, নবম শ্রেণী, বাউনিয়াবাঁধ আইডিয়াল হাই স্কুল