ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাসাবাড়িতে কেমন আছে গৃহপরিচারিকারা?

রোকসানা আফরোজ তুলি
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২০ শনিবার, ০৬:১৭ পিএম
বাসাবাড়িতে কেমন আছে গৃহপরিচারিকারা?

কিশোরী মিম। মাগুরা থেকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে এসেছে ঢাকায়। ছোট্ট একটি পরিবারে। সেই পরিবারে সে আরবি আর বাংলা শিক্ষা পেলেও সেটা প্রাতিষ্ঠানিক নয়। তার আয়ের অর্থ কখনোই তার হাতে আসে না। পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার বাড়িতে। বিনোদন বলতে কখনো মালিকের সাথে বাইরে যাওয়া। এর বাইরে আলাদা কোনো বিনোদনের সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা গৃহমালিকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন মিমেরই নাকি আগ্রহ নেই।

মিমের বয়স এখন ১৪। এই বয়সেই সংসারের যাবতীয় কাজ সে করতে পারে। মিমের কাছে জানতে চাওয়া হয় বাড়ি ফিরে যাবে কবে। সে জানায় বাবা-মা বিয়ে ঠিক করলে তবেই সে যাবে। এর আগে যাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। কারণ সংসারে ২ বোন ১ ভাইয়ের দায়িত্ব তার কাঁধে। কষ্ট হলেও থাকতে হবে এখানে।

ছোট্ট এক কিশোরী সাদিয়া। বয়স মাত্র ১০ বছর। বরিশাল জেলার সাহেলা ও মনির দম্পতির দ্বিতীয় কন্যা। পারিবারিক দারিদ্রতার কারণে তাকেও দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই সে বড় হবে এবং শিখবে সংসারের ছোটখাট কাজগুলো। শেখার পাশাপাশি হাতে হাতে কাজ করে দেবে তার আত্মীয়ের। এতে কিছু অর্থ পাবে তার পরিবার। সাদিয়া তার পরিবার ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করে। সাদিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায় যখন সে গ্রামে থাকতো, প্রায়ই সকালে দুপুরে না খেয়ে থাকতো। বাড়িতে থাকতে তার অনেক কষ্ট হতো। তবে এখন আর তার কষ্ট হয় না কারণ সে প্রতিদিন ঠিকভাবে খাবার পায়। সে আরও বলে, মাঝে মাঝে খেলতে যেতে ইচ্ছে করে। তবে সে খেলার জন্য কখনোই বাইরে যায় না। কারণ তার গৃহমালিক তাকে বাইরে যেতে দেয় না। যখন তার খেলতে ইচ্ছে করে তখন সে গৃহমালিকের ছোট মেয়ে সাবিকুন এর সাথে খেলা করে। এ বিষয় গৃহমালিক শারমিন সুলতানা বলেন, সাদিয়া গ্রাম থেকে এসেছে মাত্র কয়েকদিন। সে তার এলাকার কিছুই চেনে না। তাই তিনি সাদিয়াকে বাইরে যেতে দেন না। শারমিন সুলতানা বলেন, বিনোদনের জন্য তিনি মাঝেমাঝে সাদিয়াকে বাসার বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান।

সুরমা, বয়স ১৬ বছর। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। অনেক শখ করে নদীর নামে নাম রাখা হয়েছিল তার। তবে দারিদ্র্য তাদের সন্তানকে কাছে রাখতে দেয়নি। মিরপুরের সাহিদা বেগমের ছোট্ট ফ্লাটে কাজ করে সুরমা তার আয়ের টাকাটা পাঠিয়ে দেয় বাড়িতে। সংসারের সব কাজে সে বেশ পারদর্শী। সে জানায়, তার যখন ১০ বছর বয়স তখন থেকে তিনি সাহিদা বেগমের বাড়িতে কাজ করে। বছরে দুইবার বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়, আবার মাঝেমাঝে গ্রাম থেকে তার মা এসে তাকে দেখেও যায়।

গৃহমালিক শারমিন সুলতানা তার গৃহপরিচারিকা সম্পর্কে জানালেন, তার মেয়েকে তিনি যেভাবে দেখেন, ঠিক তেমনি তার গৃহপরিচারিকাকেও দেখেন। তার মেয়ে কোনো অন্যায় করলে তিনি যেভাবে শাসন করেন, ঠিক তেমনি তার গৃহপরিচারিকাকেও শাসন করেন।

সরেজমিনে পরিদর্শন করে জানা যায়, শুধু সুরমা, সাদিয়া, মীম নয়, হাজারো শিশু- কিশোর কাজ করছে শহরের অনেক বাড়িতে। শহরের প্রায় সব পরিবারেই এক বা একাধিক গৃহপরিচারিকা রয়েছে। বাংলাদেশে গৃহপরিচারিকা রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ।

বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র পরিবারে যখন সংসারে আয়ের তেমন কোনো পথ থাকে না বা স্বচ্ছলতার অভাব পড়লে পরিবারের ছোট মেয়ে বা ছেলেটিকে শহরের কোনো আত্মীয় বা পরিচিতের বাড়িতে পাঠানো হয় গৃহপরিচারিকা হিসেবে।

এদেরই অনেকে অত্যাচারের শিকার হয় এবং হারিয়ে যায় তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ। এই শিশুরা না পায় কোনো বিনোদন, না পায় কোনো পড়াশোনার সুযোগ। সুন্দর শৈশবটাও নষ্ট হয়ে যায়। ইট-পাথরের শহরে বন্দী হয়ে যায় তাদের ছেলেবেলা এবং স্বপ্ন। খুব কম বয়সেই তাদের শিখে নিতে হয় সংসারের যাবতীয় কাজগুলো। এই শিশু গৃহকর্মীদের অনেকেই তাদের শৈশবে আরেকটি শিশুকে লালন-পালনে ব্যস্ত থাকে। নিজের হাসি-কান্নায় ব্যস্ত না থেকে অন্যের শিশুর হাসি-কান্নার মাঝেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হয় পরিবারের জন্য কিছু আয়ের লক্ষ্যে।

করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর মীম, সুরমা, সাদিয়ার মতো অনেকেই তাদের কাজ হারিয়েছে। তাদের মধ্যে নতুন করে অভাব অনটন শুরু হয়েছে। অনেকে থাকার জায়গা না পেয়ে ভাসমান জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা যেমন মীম, সাদিয়া, সুরমার মতো শিশু-কিশোর গৃহপরিচারিকার কাজ করুক, তা চাই না। একইভাবে তারা উদ্বাস্তু হয়ে যাক বা কর্মহীন হয়ে পড়ুক এটাও কাম্য নয়। দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে তাদের জন্য আনন্দময় কাজের পরিবেশ তৈরি করা, তাদের বিকশিত করার সুযোগ করে দেওয়া এবং তারা যেন পড়ালেখার সুযোগটা পায়, এই প্রত্যেকটা বিষয় নিশ্চিত হবে, এটাই আমরা কামনা করি।

লেখক: রোকসানা আফরোজ তুলি

বয়স: ১৮

উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষ, দুয়ারিপাড়া সরকারি মহাবিদ্যালয়