ঢাকা, রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

“করোনা সংক্রমন ও মাদকাসক্তের হ্রাস”

মোঃ আরিফুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ শনিবার, ১২:৪৯ পিএম
“করোনা সংক্রমন ও মাদকাসক্তের হ্রাস”

আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি বছরই ২৬ জুন সারা বিশ্বে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু দিবস পালন করাই কি আর মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে পারবে?        

মহামারী কভিড-১৯ চলাকালীন সময়ে ধূমপান ও মাদকের ঝুঁকিপূর্ণতা সম্বন্ধে বরাবরই ঘোষণা এসেছে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডব্লিওএইচও(হু) থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, ধূমপায়ী বা তামাক এবং মাদকসেবীরা নানারকম স্বাস্থ্য সমস্যাসহ জটিল ও কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে বিধায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রাণহানির ঝুঁকিতে শীর্ষ অবস্থান করছে কারন ধূমপান করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলে। করোনাভাইরাস যেমন আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে তেমনি ধূমপান বা ই-সিগারেট কিংবা সিসা সমানভাবে আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও ধূমপান বা ই-সিগারেট, গাঁজা, হেরোইন, কোকেইন ও সিসার মাধ্যমে ফুসফুস সংক্রমিত হয়। সে কারণে তাদের রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে থাকার ঝুঁকি অন্য অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেকগুণে বেশি।

 শুরুর দিকে  বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস এর তেমন একটা প্রকোপ না থাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী কেহই তেমন একটা আমলে নেয় নি, মার্চের শেষের দিকে মিরপুরে যখন প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হলো তারপর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিক ভাবে সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়।এমতাবস্থায় মাদকাসক্ত তরুন যুবকরা আতংকিত হয়ে যায় এবং নিজেদের যতটা সম্ভব ধুমপান, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য সেবন কমিয়ে আনে। লকডাউনের কারনে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা এমনকি সাধারন মুদির দোকান(নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকবে) পর্যন্ত বন্ধ রাখার জন্য ঘোষণা করা হয়৷ তার সাথে সর্বপ্রকার জনসমাগম নিষিদ্ধ করে সামাজিক দূরত্ব বজার রাখার জন্যে কঠোরভাবে নির্দেশ আসে সরকার থেকে এবং স্থানীয়ভাবে অনেক স্থানে এলাকার লোকজন মদ্য, সিগারেট ও মাদকদ্রব্য বিক্রয় হয় এমন দোকানগুলোকে প্রশাসনের সাহায্য বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় একটি দীর্ঘ সময় ধরে ধমপান ও মাদকদ্রব্য বেচাকেনাও বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশের ফলে আমাদের তরুণ যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৪৯% ভাগ মানুষ বয়সে তরুণ। দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। প্রতিনিয়ত তাদের মাঝে মাদকাসক্তের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে যা মাদক ব্যবসায়ীদের আরো উৎসাহী করছে। সরকার ইতিমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- মহামারীর কারণে বেশ কয়েকটি দেশে নির্দিষ্ট কিছু মাদকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক যে কভিড-১৯ করোনা মহামারীর কারণে অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রীর মতো মাদক সরবরাহের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। এরই মধ্যে অনেক দেশে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল সহ আমদানিকৃত মাদকদ্রব্যাদির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে সেসব দেশে এখন এমন মাদকদ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে যেগুলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত যা শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে দুঃখজনক ও ভয়ঙ্কর চিত্র হচ্ছে, এসব মাদকদ্রব্য গ্রহণকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ। মাদক স্বল্পতার ফলে মাদকাসক্ত যুবকরা যেমন ধীরেধীরে নিজেদের সাধারণ জীবনযাপনে ফিরছে তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকারীরা নানান ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশে  গত বছরের প্রথম দিন থেকেই সারা দেশে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে। সম্প্রতি সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতেই হয়, বিষয়টি হচ্ছে, এখন থেকে সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে প্রার্থীদের  মাদক পরীক্ষা বা ডোপ টেস্ট করা হবে। যাদের ডোপ টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ হবে, তিনি চাকরির জন্য অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’(২৫ জুন,২০২০ইং) এর তথ্য মতে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ যার মধ্যে নারীরাও রয়েছে, ধারণা করা হয়, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। দিনকে দিন মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কভিড-১৯ এর মন্থরতা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে একটি পজিটিভ ভুমিকা লক্ষনীয়। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম  বিভাগ এর পরিচালক মুজিবুর রহমান পাটোয়ারীর ভাষ্যমতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীন গবেষণায় জানা যায় করোনাকালীন সময়ে পরিবহন বন্ধ থাকায় মাদকদ্রব্যের ঘাটতির কারনে এপ্রিল ও মে মাসে মাদকাসক্তের তীব্রতা অনেকটা কম ছিলো। গণপরিবহন খুলে দেয়ায় পরবর্তী সময়ে তা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে।

করোনা পরবর্তী সময়ে মাদকের তীব্রতা স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অধিদপ্তরের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লকডাউনের পর গত আগষ্ট মাসে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ মামলা দায়ের করা হয়। তাই পরিস্থিতি কিছুটা সাভাবিক রয়েছে, এই ধারাবাহিকতা অব্যহত রেখে ছোট পরিসরে এওয়ারনেস প্রোগ্রাম করে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও যুবকদের কাছে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে মাদকের কুফল নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্লোগান ও পোস্টারিং এর মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন তারা।

তিনি আরো বলেন, মাদকের প্রভাব কমিয়ে আনতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর, পুলিশ ও সাংবাদিকদের পাশাপাশি সমাজের ইনফ্লুয়েনশিয়াল ব্যাক্তিরা যদি এগিয়ে আসেন ইনশাআল্লাহ তাহলে আমরা ভালো থাকতে পারবো। তিনি জানান, চট্টগ্রামের অন্যতম মাদক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বাকলিয়া সহ বেশকিছু এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন  ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ও পুলিশের সহযোগিতায় “মাদক ছাড়তে হবে, নাহয় এলাকা ছাড়তে হবে” এই স্লোগান সামনে রেখে সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে।

পরিশেষে সকল অভিভাবকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “যুব সমাজকে মাদকের এই ভয়াবহ আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হলে সকল গার্ডিয়ানদের উচিৎ তাদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। পরিবার থেকে সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা না হলে সমাজে মাদক নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”

 বাকলিয়া থানাধীন ১৯নং ওয়ার্ড এর বাসিন্দা(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) একজন কলেজ পড়ুয়া যুবক(২০) বলেন, বন্ধুদের পাল্লায় পরে প্রথম সখের বসে তিনি ই-সিগারেট খাওয়া শুরু করে পরে পকেট খরচের টাকা দিয়ে ইয়াবা ও মদ্য পান করে। তিনি যখন জানতে পারেন ধূমপায়ী ও মাদকাসক্তের করোনা সংক্রমণ এর ঝুঁকি বেশি এবং তা একজনের হলে তার পরিবারের লোকেরও হয় তারপর থেকে তিনি বাসা থেকে আর বের হয়নি প্রথম প্রথম লকডাউনে বাসায় বন্ধি থেকে লুকিয়ে কিছুদিন ধুমপান করলেও একটা সময় ধুমপান ছেড়ে দিতে তিনি বাধ্য হয়, এখন তিনি সম্পূর্ণ সাধারণভাবেই লেখাপড়ায় মনোযোগ দিচ্ছে। তার সাথে থাকা অন্য একজন(২১) বলেন, নিজের পরিবারের চেয়ে কখনো কিছু বড় হতে পারে পারে না, সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে জেনে তার বাবা তাকে মোটর বাইক কিনে দিয়েছে। ইয়াবা ও গাঁজা সেবনকারি মোঃ রুবেল(২৮) সাথে কথা বলে জানা যায়, ছোট বেলা থেকেই তিনি এসব মাদকদ্রব্য সেবন করে আসছে, অনেক চেষ্টা করেও তিনি তা ত্যাগ করতে পারেন নি তাই গত দেড় বছর আগে তাকে পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখন সে রিক্সার গ্যারেজ এ থাকে তার সাথে আরো অনেকেই এভাবে ইয়াবা সেবন করে নিজেদের মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আগামী প্রজন্মকে, সাথে তাদের পারিবার পরিজনকেও।।

 

নামঃ মোঃ আরিফুল ইসলাম

বয়সঃ (১৯)

কলেজঃ জে. এম. সেন কলেজ(বেচ-২০২০)।

কোতোয়ালী, চট্টগ্রাম