ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কীভাবে কাটাবেন ‘কোয়ালিটি টাইম’?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বুধবার, ০৮:৩২ এএম
কীভাবে কাটাবেন ‘কোয়ালিটি টাইম’?

শরীফ আর আরশির বিয়ে ১৪ বছর হতে চলেছে। দুজনেই চাকরি করেন, বেশ ব্যস্ত। বাসায় একটি মাত্র ছেলে আর শরীফের বাবা-মা সারাদিন বাসায় থাকে। একদিকে সারাদিন একটি শিশু বেড়ে উঠছে বাবা-মাকে ছাড়া, আবার বৃদ্ধ বাবা-মাও বন্দি জীবন পার করে দিচ্ছে শহরের একটি ফ্ল্যাটে। এদিকে তারা স্বামী স্ত্রী অফিস থেকে ফেরে চোখে ক্লান্তি নিয়ে।

পরিবারে কর্তা এবং কর্ত্রী দুজনই যখন জীবনজীবিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন অর্থাৎ চাকরি করেন, সংসারটা একেবারে ভিন্নভাবে চলে। তাদের সন্তান, আত্মীয় পরিজন কাছে থেকেও অনেকটা দূরে থাকার মতোই। সারাদিনের ব্যস্ততা আর কাজের চাপে পরিবারকে নিয়ে ভাবার সময়ও হয়তো মেলে না। আর বাসায় ফিরলেই চেপে ধরে একগাদা ক্লান্তি। দেখা যায় ক্লান্তি নিয়ে ফিরে কারো সঙ্গে ভালোমতো কথাও বলা হয়না, আবার এমন অনেক পেশার বৈচিত্র্য আছে যেখানে চাকরিজীবি স্বামী-স্ত্রী কারো সঙ্গে কারো দেখাও হয়তো হয় না। কিন্তু চাইলেই ব্যস্ততার বাইরের সময়টিকে দারুণভাবে কাজে লাগানোই যায়।

একদিকে সংসার আরেক দিকে পেশা সামলানো খুব সহজ বিষয় নয়। কারো সঙ্গে ভালোমন্দ দুটো কথা বলা, সমস্যা শেয়ার করারও ইচ্ছে আর থাকে না। অথচ একটু হিসাব মতো বুঝেশুনে সময়কে ভাগ করে নিয়ে পরিবারকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়াই যায়।

কোয়ালিটি টাইম বিষয়টি কি

কোয়ালিটি টাইম বলতে মূলত সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে মনোযোগ দিয়ে তাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু সময় কাটানোকে বোঝায়। কোয়ালিটি টাইম খুব স্বল্প সময়ের হলেও মানুষের মনোযোগের চাহিদার অনেকখানি পূরণ করতে পারে যেটি সারাদিন স্বাভাবিক সময় দিলেও পূরণ হতে চায় না। কারণ সারাদিন আমাদের অনেক কাজেই করতে হয়। আবার সেই সঙ্গে পরিবার বা সন্তানদের নিয়েও ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। অর্থাৎ প্রথমে মনোযোগটাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করি, সেই মনোযোগের কিছু অংশ পরিবারকে দিই আমরা। অর্থাৎ, একট নির্দিষ্ট সময় পরিবারকে দিতে হয়। কোয়ালিটি টাইম যদি ভালোভাবে উপভোগ বা কাজে লাগাতে হয় তবে পুরোপুরি মনোযোগ পরিবার বা সন্তানদেরকে দিতে হয়। 

তবে কোয়ালিটি টাইম দেওয়া মানেই যে ও ‘অনেকটা’ সময় দিতে হবে, তা না। অনেকখানি সময় তাদের সঙ্গে থেকেও যদি সময়টার সদ্ব্যবহার করা না যায়, তাহলে তেমন কোনো লাভই নেই। পরিবার অনেক বড় একটি বিষয়, ব্যস্ততার অজুহাতে তাদের সময় কম দেওয়া মানে নিজের অস্তিত্বের একটি অংশকে আড়াল করে রাখা।

কেমন হতে পারে আদর্শ কোয়ালিটি টাইম

একজন কর্মজীবি স্বামী বা স্ত্রী যখন সঙ্গী বা সন্তানদের সঙ্গে থাকেন তখন সময়টা কেবল তাদের জন্যই বরাদ্দ রাখা উচিৎ। এতে করে সন্তানের কখনো এটা ভাবার অবকাশ থাকবে না যে বাবা বা মা তাদেরকে পর্যাপ্ত সময়টা দিতে পারছে না। ঠিক একইভাবে পেশাগত কাজ করতে করতে সন্তান আর পরিবারকে  সবসময় ভাবতে হবে বা সময় দিতেই হবে এমনটা নয়। কাজের সময়ে কাজে মন দেওয়াই ভালো। নিতান্ত প্রয়োজনের বাইরে কাজের সময়ে পরিবারকে না ভাবলেও চলে। এর চেয়ে বরং পরিবারের সঙ্গে যখন থাকা হয়, তখন যে শুধু তাদেরকেই ভাবা হয় বা কাছে রাখা হয়। এতে সন্তান বুঝতে পারে যে, বাবা-মায়েরা আসলেই তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে ভালোবাসা আর টান দৃঢ় হয়।

বিশেষ করে কর্মজীবী মা ও একক পরিবারের শিশুদের জন্য বিষয়টি খুব প্রয়োজনীয়। শিশুদের নানা রকম আচরণগত সমস্যাগুলো হয় তাদের মনোযোগের চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ না হওয়ার কারণে হতে পারে। কোয়ালিটি টাইম দিলে শিশুদের মধ্যে মনোযোগের চাহিদা অনেকখানি পূরণ হয়। তাদের নেতিবাচক আচরণ করার প্রবণতা কমে। এছাড়া, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয় এবং সেই সঙ্গে শিশুদের রাগ, জেদ, অন্যায় আবদার ইত্যাদির পরিমাণও কমে যায়। ফলে মায়ের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কোনো নেতিবাচক আচরণ করে না তারা।

সঙ্গী পরস্পরকে কোয়ালিটি টাইম দিলে দুজনের সম্পর্ক আরও গভীর হয়, মতের মিল বাড়ে, দুরত্ব থাকলেও সেটা কমে যেতে থাকে। ভালোবাসার আস্থা দৃঢ় হয়, একজন আরেকজনের গুরুত্ব বুঝতে শেখে।

কোয়ালিটি টাইম এর জন্য কিছু পরামর্শ

১. সঙ্গী ও সন্তানদের সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কাজ থেকে দূরে থাকবেন। এই যেমন টিভি দেখা, ল্যাপটপ বা মোবাইলে কোনো কাজ করা বা অফিসের কোনো কাজ করে আপনাদের সময়টাকে যেন কোনোভাবেই নষ্ট করবেন না।

২. অবশ্যই সন্তানদের পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধবের ব্যাপারে খোঁজ নেবেন। কিশোর বয়সী সন্তান হলে তাকে উপদেশের পাশাপাশি তার বিভিন্ন কথাবার্তা, আচরণের ওপর মনোযোগ দিন। সবচেয়ে ভালো হয় একটা হালকা পরিবেশ তৈরি করলে। এতে করে সে সে নির্ভয়ে ও বিশ্বাসের সঙ্গে মনের কথা বলবে। এতে করে সমস্যা থাকলে তার সমাধানও হয়ে যাবে।

৩. শিশুদের সঙ্গে একেবারেই মিশে যান। তাদের সঙ্গে তাদের মতো করেই কিছুক্ষণ খেলুন কিংবা মজার মজার গল্প বলুন। মনে রাখবেন যে আপনার সন্তানটি অনেক কিছুই বোঝে। সামান্যতম মনোযোগের সুষম বা অসম বণ্টনও তার চোখে পড়ে। তাই তাদের প্রতি নিজের পুরোটা মনোযোগ দিতে চেষ্টা করুন।

৪. পুরো সপ্তাহ যত কাজই থাকুক না কেন, ছুটির দিনটি অবশ্যই পরিবারের জন্য রাখুন। এই দিনটি পরিবারকে অবহেলা করার কথা ভাববেন ও না। আগেই সবাই মিলে পরিকল্পনা করুন দিনটিকে সুন্দর করে কাটানোর।

৫. সঙ্গী, সন্তানসহ পরিবারের সদস্যগুলোর প্রতি সবদিক থেকে মনোযোগী হন। কাজ থেকে বাসায় ফিরে ক্লান্তিভাব দেখাবেন না। ফ্রেশ হয়ে সবাই মিলে হালকা নাস্তা করে নেবেন অবশ্যই। সম্ভব হলে স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে রাতের রান্নটা সেরেও নিতে পারেন।

৬. সারাদিন যে যার কাজে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে সময়টা নিতান্তই পরিবারের সবার। রাতে সবাই একসঙ্গে একটু বিনোদন নিতেই পারেন। একসঙ্গে টেলিভিশন বা ল্যাপটপে যেকোনো পছন্দের নতুন নাটক, সিনেমা বা কোনো শো দেখতে পারেন। আবার সবাই মিলে মজার কোনো খেলা খেলে দারুণ কিছু সময় কাটাতেই পারেন।

৭. সারা সপ্তাহের ব্যস্ততার অজুহাত কাটিয়ে সন্ধ্যের পর কাজে বা ঘুরতে বাইরে বের হতে পারেন। পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিন। সম্ভব হলে মাঝেমাঝে সবাই মিলে বাইরে খাওয়াদাওয়াও করে আসতে পারেন।


বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/জেডএ