ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ৯ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা, ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’ নয় তো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ১২:১২ পিএম
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা, ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’ নয় তো?

সন্ধ্যায় জন্মদিনের একটা দাওয়াত আছে মিতুর। পুরো পরিবারই সেখানে যাচ্ছে, উপহার কেনাও শেষ। কিন্তু সকাল থেকেই এই দাওয়াতের কথা মনে আসছে, আর বিরক্ত লাগছে মিতুর। একদমই যেতে ইচ্ছে করছে না। মাকে না যাওয়ার কথা বলতেই বিশাল এক ধমকও খেল সে। বেশি লোকজনের মধ্যে যাওয়া, সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলা আর হৈ চৈ একেবারেই ভালো লাগে না। কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে সেটা নিয়ে মস্ত ভয় কাজ করে। সবাই তাকে কীভাবে নেবে, সাজলে কেমন অদ্ভুত লাগবে, অপ্রাসঙ্গিক কোনো কথা বলেই ফেলে নাকি- সেই ভয়েই মিতু কোথাও যেতে চায় না। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে চায়।

এই সমস্যাটা শুধু মিতুর নয়, অনেকেরই হয়। অচেনা পরিবেশে যেতে, বেশি লোকজনের সঙ্গে মিশতে অনিচ্ছা, ভয় অথবা টেনশন হলে বুঝতে হবে আপনি ‘Social Awkwardness’ এ আক্রান্ত। এর প্রকোপ বেশি হয়ে গেলে এই সমস্যাটির নাম ‘Social Anxiety’ বা ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’। এবার আসি এই ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’ কী সেটা নিয়ে। ধরুন সবসময় আপনার মনে হচ্ছে ‘অন্যরা আমাকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু ভাবছে’। এই কথা মাথায় সর্বদা ঘুরপাক খায়, মনের মধ্যে অস্বস্তিবোধ হতে থাকে। এই মনোভাবকেই মনস্তত্ত্ববিদেরা নাম দিয়েছেন ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’। বাংলায় যাকে সরাসরি ‘সামাজিক দুশ্চিন্তা’ বলি আমরা। একে সোশ্যাল ফোবিয়াও বলা যায়।

কেন হয় এই সমস্যা

মনোবিজ্ঞানীগণ অনেক আগে থেকেই ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি’র পেছনের কারণগুলো খুঁজে বেড়িয়েছেন। আমরা একবার সেগুলো দেখে নেবো-

১. সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা যদি কম থাকে।

২. পরিবার থেকে কোনো ব্যাপারে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া। হোক সেটা পড়াশুনা, সম্পর্কজনিত বা যে কোনো বিষয়ে।

৩. ছোটবেলায় কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া।

৪. কোনো কারণে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকে যদি।

৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করতে থাকলে।

৬. একস্থান ছেড়ে অন্যস্থানে গিয়ে বসবাস শুরু করা।

কীভাবে বুঝবেন সোশ্যাল অ্যাংজাইটি

এই সমস্যার লক্ষণ মূলত আপনি তিনটি পর্যায়ে দেখতে পাবেন। সেগুলো হলো আবেগের ক্ষেত্রে, আচরণের ক্ষেত্রে এবং আপনার শারীরিক ক্ষেত্রে।  

আবেগগত লক্ষণগুলো কেমন হবে

আপনার যদি অতিমাত্রায় আত্মসচেতনতা থাকে। সবসময় মনের মধ্যে খুঁতখুঁত হতে থাকবে যে আমি কি কাজটা ঠিক করছি নাকি করছি না। আবার নিজের দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে যদি সবসময় চিন্তা হতে থাকে।

আচরণগত লক্ষণগুলো কেমন হবে

সামাজিক বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে না যাওয়া, একেবারে চুপচাপ থাকা, কাছের বন্ধুবান্ধবকে সামাজিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে ঢাল বানানো এবং মাদকাসক্ত হয়ে পড়া।

দৈহিক লক্ষণগুলো কেমন হবে

আপনার হাত ও পায়ের তালু ঘামবে, উচ্চমাত্রায় হৃৎস্পন্দন, শরীর ঘামা আর শরীর কাঁপা।

এ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে

সমস্যাটি স্বীকার করুন

নিজের মধ্যে লক্ষণগুলো বুঝতে পারলে সমস্যাটি স্বীকার করে নেবেন। অনেকেই নিজের সমস্যা স্বীকার করতে চায় না। নিজের কাছে স্বীকার করতেই দ্বিধা হয়। ভুলেও এটা করবেন না। সমস্যাটি স্বীকার করুন। এতে সমাধান সহজ হবে। এটাও ভাবুন যে, এ ধরনের সমস্যা অনেকেরই আছে। তাই আপনি একা নন, এর সমাধান সম্ভব।

চিন্তার লাগাম টেনে ধরুন

সবসময় আপনার চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবেন। চিন্তা যদি নেতিবাচক হতে থাকে তাহলে সেটার লাগাম টেনে ধরবেন। আপনার অবচেতন মন যদি বলতেই থাকে যে সারাটা দিন খারাপ যাবে, আপনি জীবনে সফল হতে পারবেন না- তাহলে সেই চিন্তা থামান। নিজেকে ভাবতে শেখান যে আপনি ভালো কিছু আশা করেন আর ভালো কিছু আপনার দ্বারা সম্ভব। যদি খারাপ কিছু হয় তো সেটা মেনে নিন।

নিজেই শুরু করুন

আপনার কারো সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ হতেই পারে। হয়তো ভাবছেন অপরপক্ষ আগে কথা বললে তবেই আপনি বলবেন। কিন্তু আপনি আগে একবার শুরু করেই দেখুন না। আপনার অতিপরিচিত মানুষদের সঙ্গেই সামাজিকতা ঝালাই করে নিন। যার সঙ্গে কথা বলছেন তার পছন্দের বিষয় নিয়েই কথা শুরু করুন। এতে সংকোচ আর দ্বিধা আস্তে আস্তে কাটতে শুরু করবে। অপরিচিত কেউ হলে তার সাধারণ চলতি বিষয়ে আলাপ করুন। আর কখনো নিজের বা কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে আগ্রহ দেখাবেন না।

আপনার ভয়কে জয় করুন

মনে রাখবেন ভয় পেলে কখনো জয় করা সম্ভব না। আগে চেষ্টা করুন ভয়কে হারাতে। সবাই আপনাকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করে, এই ভাবনাকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাড়িয়ে দিন। কোনো উপস্থাপনা নিয়ে ভয় পেলে নিজে নিজে আগে প্র্যাকিটস করে নিন। বন্ধুদের সাহায্য নিন। আয়নার সামনে গিয়ে কথা বলার চর্চা সেরে ফেলুন। যারা ‘এক্সট্রোভার্ট’ বা বহির্মুখী তাদের কাছ থেকে শিখুন। সামাজিক বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটান।

দম নিয়ে নিন মন ভরে

অনেক সময়ে মনে হতে পারে যে আপনি বোধহয় আর পারবেন না। এজন্য প্রথমে চোখ বন্ধ করুন। এবারে যতোটা সম্ভব ধীরে ধীরে শ্বাস টানুন। এরপরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এবার ভেবে দেখুন তো পারবেন কি না। মনে হবে পারবেন। শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন। যোগব্যায়ামের দুই একটা আসন শিখে নিন, নিয়মিত চর্চা করুন। আত্মবিশ্বাস বাড়বে, সাহস সঞ্চিত হবে আর মানসিক শক্তি পাবেন অনেকটুকু।

প্রয়োজনে পরামর্শ নিন

নিজে যদি নিজের সাহায্যে আসতে নাই পারলেন তবে কারো সাহায্য আপনাকে অবশ্যই নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কারো বা মনস্তাত্ত্বিকদের সাহায্য নিন। তাদের কাছে আপনার সমস্যা খুলে বলুন। তারা আপনাকে যে পরামর্শ দেবে তা মেনে চলুন।

বাংলা ইনসাইডার/এমআর