ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ৯ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আড্ডায় মাদক

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৩:০১ পিএম
আড্ডায় মাদক

কিছুদিন আগেও মাহিন বন্ধুদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল, পরিবারের সবার কাছে ছিল আদরের। হাসি আনন্দে, গানে আর পড়াশুনায় তার কোনো কমতিই ছিল না। কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে যেতে লাগলো হঠাৎ করে। পুরনো বন্ধু এড়িয়ে নতুন কিছু বন্ধু হলো তার। ক্লাস ফাঁকি দিতে শুরু করলো, পরীক্ষার ফলাফল হলো খারাপ। নতুন বন্ধুদের সঙ্গে এদিক-ওদিক যাওয়া আর আড্ডা মেলামেশা দেখে বাবা-মায়ের কেমন যেন সন্দেহ হতে শুরু হলো। আচার আচরণে পরিবর্তন চোখে পড়লো। হঠাৎ কী হলো মাহিনের? এই আড্ডার ছলে-বলেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো না তো?

একটা সময় গল্প আর আড্ডার কোনো বাধ ছিল না। কিশোর, তরুণ, প্রৌঢ়- সময়ে অসময়ে মেতে উঠতো আড্ডায়। কোনো এক চায়ের ছোট্ট দোকান, কলেজের বারান্দায়, বাসার ছাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত মুখর আড্ডা গল্পে। হাতে গরম চায়ের কাপ, সঙ্গে ভাজাপোড়া খেতে খেতে উঠে আসতো কতোই না গল্পের ঝাঁক। কখনো গানের আসর বসতো আড্ডার ফাঁকে। হাতে পুরনো কোনো গিটার আর ভাঙা গলার গানে কেটে যেত দারুণ সব সময়।

আগে আড্ডা জমানোর কোনো পরিকল্পনাই থাকতো না। আড্ডার সঙ্গী আর বন্ধুরা জানতো কখন কোথায় মিলিত হতে হবে। ঠিক সেই মতোই সবাই এক হতো। বিশেষ কোথাও যেতে হলে সেই পরিকল্পনা অবশ্য তারা নিজেদের মধ্যেই করে রাখতো। মোট কথা আড্ডা ছিল নিছকই আড্ডা আর সময় কাটানো। নিজেদের মনের সব কথা উজাড় করে দেওয়া হতো।

কফি হাউজের সেই আড্ডার দিন কিন্তু আজ আর নেই। সবার হাতে এখন সময় খুব কম। এখন যাবতীয় আড্ডা হয় সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে বিভিন্ন গ্রুপ করে আড্ডায় মেতে ওঠে বন্ধুরা। বাইরে গিয়ে আড্ডার কোনো প্রয়োজনই নেই এখন। ঘরের মধ্যে শুয়ে বসেই আড্ডা হয়ে যাচ্ছে।

তবে এই আড্ডা এখন পেয়েছে নতুন মাত্রা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে আড্ডার ধারণা একেবারেই পাল্টে গেছে। তাদের কাছে আজকাল আড্ডা মানেই অন্যকিছুর সুযোগ নেওয়া। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আড্ডার সংজ্ঞা এখন একেবারেই বদলে গেছে।

বলতে বা শুনতে খারাপ লাগলেও তাদের আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো মাদক বা ড্রাগস। বিশেষ করে শহরের নামীদামী পরিবারের ভদ্র, শিক্ষিত তরুণেরাই এই মাদকের ছোবলে বেশি পড়ছে। তারা আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে মাদক বা মাদকের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হল, মেসগুলো, বিভিন্ন ফ্ল্যাটগুলোতে বসে এই মাদকের আড্ডা। আবার শহরের অভিজাত শহরগুলোতে মাদকের আড্ডা বেশি।

আজকাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতাটা বেশি। এরা এখন পরিবার থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা পায়। পরিবার অর্থনৈতিকভাবেও তাদের অসম্ভব সহায়তা করে। পড়ালেখা, ঘুরতে যাওয়া, কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষের নাম নিয়ে বড় ধরনের টাকা নিয়ে সংগ্রহ করে মাদক। এদের মাদক জোগাড় করার জন্য যথাযথ যোগসূত্রও থাকে। এদের বিষয়ে পরিবার কখনো জানছে, আবার কখনো জানছেই না। জানলেও তাদের ফেরানোর পথ তাদের কাছে অজানা।

এই অবস্থা রুখবেন কীভাবে

সবার আগে সতর্কতা নিজের কাছে। তরুণ বয়সে নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট জ্ঞান আর ম্যাচিউরিটি চলে আসে। এই সময়টাতে জেনেশুনে মাদকের চক্করে পড়াটা বেমানান। পারিবারিক স্ট্যাটাস আর নিজেকে স্মার্ট প্রমাণ করতে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডার ছলে মাদকে জড়িয়ে যাবেন, এটা করাটা বোকামী।

এই বয়সে আবেগের বশে অসৎ সঙ্গে পড়ে ভুল করে ফেললেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাদকাসক্ত আড্ডাবাজ বন্ধুর খপ্পরে পড়বেন না। মাদকের আঁচ বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই সে চক্কর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

নিজেকে স্মার্ট প্রমাণ করতে বা স্ট্যাটাস বজায় রাখতে মাদক নয়, অন্যপন্থা দেখুন। নিজেকে স্মার্ট করতে পড়াশুনায় ভালো ফলাফল করুন। সৃজনশীল কাজে নিজেকে দক্ষ প্রমাণ করুন। ভদ্রতা আর শিষ্টাচার মেনে নিজেকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলুন। এ ধরনের বন্ধুদের আপনি নিজে সংশোধনের চেষ্টা করুন।

অর্থনৈতিক দিকটির কথা একবার চিন্তা করুন। কারণ তরুণরা যে মাদকগুলো গ্রহণ করে সেগুলো যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এগুলোর পিছনে তাদের অনেক অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্ষতিকর কোনো কিছুর জন্য কেন এতো অর্থ ব্যয় করবেন? এর চেয়ে ভালো হয় সেটা অন্য ভালো কাজে ব্যয় করুন, ঘুরতে যান, কেনাকাটা করুন।

অভিভাবক হিসেবেও পিতামাতাকে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আড্ডা, ঘুরতে যাওয়ার নামে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কোন বন্ধুর সঙ্গে মিশছে, ঠিকমতো পড়াশুনা করছে কিনা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা খোঁজ রাখতে হবে। মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে সংশোধনের প্রথম দায়িত্ব পিতামাতার। 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/এমআর