ঢাকা, রোববার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বার্ধক্যে আচরণ অসঙ্গতি নাকি ভীমরতি?

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ০৮:০০ এএম
বার্ধক্যে আচরণ অসঙ্গতি নাকি ভীমরতি?

আজকাল নাদিম সাহেবকে নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছে তার পরিবার। তার বয়স ৭০ পেরিয়েছে। শারীরিকভাবে কিছুটা বার্ধক্যজনিত সমস্যা তো রয়েছেই। কিন্তু বেশি সমস্যা করছে তার আচার-ব্যবহার। দিন দিন যেন একেবারে অবুঝ ছোটমানুষ হয়ে যাচ্ছেন তিনি। কোথায় কি কথা বলে বসেন, এই ভয়ে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বা বাড়িতে কেউ এলে তাকে সামনে নিয়ে আসাটা বিপদ হয়। এভাবে আটকে রাখা বা তাকে আলাদা করে রাখাটাও পরিবারের জন্য কষ্টকর। কিন্তু উপায় নেই।

জীবনের অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে বার্ধক্যে এসে ঠেকে সময়। সারাজীবনের ঘানি টেনে এসে এই সময়টা যেন একটু বেশিই নিরিবিলি, কখনো একা থাকা, অসুখবিসুখে ভোগা। সেই সঙ্গে মনে দানা বাধে কত না অসুখ। অনেককিছু মনে থাকে না, আরও ভবিষ্যতে কি হবে না হবে, সন্তানেরা কেমন থাকছে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নিচ্ছে কিনা ঠিকমতো- মনের এই দ্বন্দ্বগুলো কেমন যেন জেঁকে বসে। এই সময়টাতে নিঃসঙ্গতা বেশি হয়, পরিবার আর সমাজের মেলামেশায় কমতির জন্য একরকম বিচ্ছিন্ন হতে হয়।

তবে বৃদ্ধবয়সে যে সমস্যাটি বেশি হয় সেটা হলো সময়ে-অসময়ে বেফাঁস ধরনের কথা বলে বসা। এটাকে অনেকে ভীমরতি, কেউ মাথা নষ্ট কেউবা বয়সের দোষ বলতে পারে। এই বয়সে শারীরিক-মানসিক অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কমনসেন্স কমে আসতে থাকে। কখন কি করতে হবে, বলতে হবে, সেটা বুঝতে পারে না।

কেন হয় এমন

এর অন্যতম কারণ হতে পারে বৃদ্ধ বয়সের নানা ধরনের দুশ্চিন্তা। কারণ এসময়ে অনেক দুশ্চিন্তা আসতে থাকে। আয় কমে যায় বা থাকে না, চিকিৎসার খরচ বাড়ে, সন্তানরা দূরে চলে যায়, সমবয়সী কারো মৃত্যু, অসুস্থতা, মৃত্যুভয় চলে আসে নিজের মধ্যে। তখন সবসময় ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে।

পাশাপাশি নিজের কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্যের ওপর নির্ভরতাসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের মধ্যে হীনমন্যতাও দেখা যায়। দুশ্চিন্তার সঙ্গে ডিমেনসিয়া বা স্মৃতিভ্রমের সমস্যা থাকলে ব্যক্তির নিজের পক্ষে এই অবস্থা থেকে বের হওয়া কঠিন।

এই বয়সটাকে কখনোবা বাল্যকালের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কারণ বার্ধক্যে আচরণ অনেকটাই শিশুদের মতো হয়ে যায়। বোধবুদ্ধি লোপ পায়, চিন্তাশক্তি অপরিপক্ক হয়ে যায়। কথায়, আলাপে বাৎসল্যভাব চলে আসে। তাই ভুলভাল, উদ্ভটভাবে কথা বলা, আচরণে পরিবর্তন চলে আসে।

প্রায়ই মন খারাপ থাকলে, কিছু মনে না থাকলে, কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়া, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলা, একাকী থাকতে চাওয়া, রেগে যাওয়া, হতাশামূলক কথা বলা, ঘুমের পরিবর্তন হওয়া, ক্লান্তি অনুভব করা, ক্ষুধা ও ওজন কমে যাওয়া, অপরাধবোধে ভোগা, মৃত্যু বা আত্মহত্যার কথা মাখায় আসা থেকে বৃদ্ধকালে উদ্ভট কথা বলে ফেলার সম্ভাবনা থাকে।

করণীয় কী

এই সময়টা কঠিন। তাদের এই সময়ে অনেকেই সহ্য করতে পারেন না। তাদের এড়িযে চলেন, কারো সামনে আনতে চান না। কিন্তু এই সময়টাতে তাদের সহমর্মিতার সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে ও সমস্যার সমাধান করতে এমনভাবে সাহায্য করতে যাতে তারা মনে না করেন যে তিনি অযোগ্য। মনে রাখবেন যে এই বয়সে মানুষের অভিমান বেড়ে যায়। তাই কথা বলার সময় অন্যদের বাড়তি সচেতনতা রাখতে হবে। তাঁরা যেন কিছুতে কষ্ট না পান সেটাও দেখতে হবে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শারীরিক সমস্যাগুলোতে বেশি সচেতন থাকতে হবে পরিবারের সবার। নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে সে কি খেলো না খেলো, সব নিষেধাজ্ঞা মেনে চললো কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের যখন তখন এদিকেসেদিকে বাইরে পাঠানোও ঠিক নয়। কখন কোন বিপদ ঘটায় তারও ঠিক নেই।

একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির উচিৎ নিজেকে সাধ্যমতো ব্যস্ত রাখা। নিজের শরীরকে কার্যকর রাখলে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে, আনন্দদায়ক কাজে অংশগ্রহণ করলে, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করলে, স্বেচ্ছাসেবা বা সহযোগিতামূলক কাজে অংশগ্রহণ করে বৃদ্ধ বয়সের জীবনকে মেনে নিয়ে সব পরিস্থিতিতে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করলে বার্ধক্য খুব একটা চেপে ধরতে পারে না।

মূল কথা হলো, বৃদ্ধ বয়সের অসহায় অবস্থা সবার জীবনেই আসবে। কাজেই জীবনের শেষ সময়টুকু তাঁরা যাতে নিশ্চিন্তভাবে আনন্দের সঙ্গে কাটাতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বয়স্ক মানুষগুলোকে যাতে সংসার, সন্তান, প্রিয়জন, প্রিয় পরিবেশ ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে না হয় কখনো। একটু সহনশীলতা, উদারতা ও আন্তরিকতা পরিবারের সবার মাঝে আনন্দে, তৃপ্তিতে, নিরাপত্তা ও নির্ভরশীলতার মধ্যদিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। তাতে ভীমরতিটা তো কমানো সম্ভব।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ