ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চাঁদ রাতের কেনাকাটা

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৮:০২ এএম
চাঁদ রাতের কেনাকাটা

‘ঈদের কেনাকাটা শেষ হলো? না, বাবা তো চাঁদ রাতে সব কিনবে।’ একথা বহুদিন কারো মুখে শুনিনা। আজকাল নগর সভ্যতার যুগে ঈদের কেনাকাটা ঈদের অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়। চাঁদ রাতের কেনাকাটা বলতে আমাদের কাছে বিশেষ কিছু নেই। চাঁদ ওঠা মানেই আমরা বুঝি আগামীকাল ঈদ হতে যাচ্ছে। কিন্তু চাঁদ রাতকে ঘিরে আগের সেই কেনাকাটা, হৈ হুল্লোড় একেবারে হারিয়ে যেতে বসেছে যেন।

একটা সময়ে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য শহর-গ্রামে হুটোপুটি শুরু হয়ে যেত। বিশেষ করে রমজানের শেষে ঈদের চাঁদ উঠবে, আগামীকাল নাকি পরশু ঈদ হবে সেটা নিয়ে আমাদের আগ্রহের কোনো শেষই থাকতো না। এই চাঁদ দেখা, আতশবাজি বা পটকা ফুটানোর সেই চল এখন কমে গেছে। চাঁদ দেখা নিয়ে এই আগ্রহের আরেকটা মূখ্য কারণ ছিল। এই চাঁদ দেখা গেলে তারপরেই পাড়া-মহল্লার লোকজনদের মধ্যেই ঈদের কেনাকাটার ধুম পড়তো। পোশাক, কাঁচাবাজারের সব কেনাকাটাই হতো বহু আকাঙ্ক্ষিত চাঁদ রাতে।

অথচ এখনকার চিত্র ভিন্ন। আমাদের প্রজন্মও একসময়ে এই চাঁদ রাতের কেনাকাটা দেখে আসলেও পাড়া-মহল্লাতেও এখন আর তেমন এই প্রবণতা দেখা যায় না। মানুষ যেন এখন কেমন বেশি গোছানো হয়ে গেছে, কেনাকাটা শুরু করে রোজা শুরুর আগে-পরে। সেই কেনাকাটা শেষ করে মাঝামাঝি রোজায়। মানে ঈদের আমেজ আগে শুরু করে আগেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। এর অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে। এখন মানুষ বেশি ব্যস্ত বলেই হয়ত একটু একটু করে কাজ গুছিয়ে রাখে। আর সবাই খুব গুছিয়ে কাজ করতে চায় বলে হয়ত কেনাকাটার চাপ জমিয়ে না রেখে আগেই কাজ শেষ করে থাকে।

অথচ এই চাঁদ রাতটাকে ঘিরে আগে কত মজাই না হতো। চাঁদ উঠলেই বাড়ির মুরুব্বি, ছোট ছোট বাচ্চাগুলো একসাথে বেরিয়ে পড়তো শেষদিনের কেনাকাটায়। এ যেন ছিল একেবারে ঈদের আগেরদিন আরেক উৎসবের মুহূর্ত। সবার জন্য যাবতীয় কেনাকাটা শেষে দুহাত ভরে সবাই বাড়িতে ফিরতো অনেক রাতে। চাঁদ রাতকে ঘিরে বাজার বসতো, চলতো গভীর রাত পর্যন্ত। কিছু চাকরিজীবীরা বেতন বোনাস পেতই রোজার শেষদিকে, ব্যবসায়ীরাও হাত গুটাতো শেষ সময়ে। চাঁদ রাত ছাড়া কেনাকাটার আর কোনো উপায়ও ছিল না।

মানে চাঁদ না উঠলে ঠিক ঈদের আমেজটা মাথাতেই আসতো না। আর প্রিয়জনেরাও অপেক্ষায় থাকতো এই দিনে ঠিক তার হাতে পৌঁছে যাবে ঈদের উপহার। চাঁদ ওঠা মানেই ছিল ঈদের শুরু, তার আগে রোজা নিয়েই মাতামাতি ছিল। চাঁদ না উঠলে ঠিক ঈদের আমেজটা বোঝা যেত না। এই রাতেই হিসাব বসত কে কয়টা কাপড় কিনলো বা কারটা কত সুন্দর। অনেক রাত পর্যন্তই থাকতো কেনাকাটা নিয়ে মাতামাতি। বাড়ির সবাই অপেক্ষা করতো এই চাঁদরাতের জন্য। তখন আনন্দও যেন ছিল উপচেপড়া। এখন যেমন সেটের পর সেট কাপড় না কিনলে ঈদ হয়না। একটা কাপড়, একটা জুতো পেলেই খুশি আর ধরতো না তখন।

আর এখন? রোজার আগে থেকে শুরু হয় কেনাকাটা। সারামাস ধরেই সেই কেনাকাটা চলে। পরিবারের জন্য কয়দিন ধরে কেনাকাটা, কাকে কয়টা উপহার দেওয়া হবে তার জন্য আলাদা কেনাকাটা করতে করতে পুরো মাসই লেগে যায়। সেখানে এখন আর চাঁদ রাতের জন্য কেনাকাটার চিন্তা জমিয়ে রাখতে হয় না। এখন চাঁদ রাত বলে তেমন আলাদা কোনো আবহ তৈরি হয় না। এমনকি নগর সভ্যতার ভিড়ে এখন ঈদের চিকণ সুন্দর চাঁদটাকে আমরা আর চোখেও দেখতে পাই না। আমরা ছোটবেলায় যে আগ্রহ নিয়ে চাঁদ দেখতে বাড়ির ছাঁদে বা খোলা মাঠে চাঁদ দেখতে যেতাম, এখনকার দিনের ছেলেমেয়েরা চাঁদ দেখতেও পায় না, চাঁদ দেখা নিয়ে তাদের তেমন কোনো আগ্রহও নেই। চাঁদ রাতের কেনাকাটা আর সেই আনন্দ নিয়ে তাদের কোনো ধারণাও নেই। এটাও আমাদের ঐতিহ্য ছিল, যেটা যান্ত্রিক জীবনে এসে একেবারে হারিয়ে গেছে যেন। এখন সামাজিক মাধ্যমে জানতে পারি যে আজ চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ। ব্যস, এটুকুই। কোনো কেনাকাটাও বাকি নেই, কোনো মজার জন্যেও আর অপেক্ষা করতে হয় না। চাঁদ রাতে দুহাত ভরে বাজার করার সেই দিনগুলো এখন লোকমুখে শোনা স্মৃতি হয়েই রয়ে গেছে।