ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব যখন দাম্পত্যে

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০১৯ রবিবার, ০৮:০১ এএম
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব যখন দাম্পত্যে

‘তুমি যদি অফিস থেকে ফিরেও সারাক্ষণ ফেসবুকেই কাটায় দাও, তো জরুরি কথাটা তোমাকে বলবো কখন!’- এটা বর্তমান সময়ের দম্পতিদের একটি খুব কমন অভিযোগ। দাম্পত্য মানে একে অন্যকে বোঝা, সময় দেওয়া, বোঝাপড়া, একসঙ্গে সংসারটা সামলানো। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির যুগে গা ভাসিয়ে দিয়ে  সারাক্ষণ যদি ফেসবুকসহ অন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকেন তো সঙ্গীকে বুঝবেন কখন, সময় দেবেন কখন, সংসারে মন দেবেন কীভাবে? ভালোলাগা, ভালোবাসার প্রকাশটাই বা করবেন কীভাবে?

সারাদিন ক্লাস, কাজ বা অফিসের ফাঁকে, ঘুমাতে যাবার আগে অথবা ঘুম থেকে উঠেও কখনও প্রথম কাজটাই হয় নিউজফিড একবার চেক করে দেখা। বিভিন্ন  গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ে বিচ্ছেদের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমগুলোর অত্যধিক ব্যবহারই দায়ী। গবেষণা এটাও বলে, যে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন, তারা তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দম্পতির চেয়ে কিছুটা হলেও সুখী।

সামাজিক মাধ্যম ঠিক কীভাবে প্রভাব ফেলে, সেটা নিয়ে থাকছে আজকের আলোচনা-

শুরু হয় সন্দেহ, ঈর্ষা বা লুকোচুরি

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ বাড়ায়। লুকিয়ে সঙ্গীর ফোন, মেসেজ চেক করা, এমনকি অফিসিয়াল মেইলগুলো চেক করার ঘটনাও ঘটে। একজন আরেকজনের সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায় না। সন্দেহের কোনো কারণ না থাকলেও ফোন, ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকলে মনে হয় এই বুঝি লুকিয়ে ফেসবুকে কার না কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে!

অস্বচ্ছতা তৈরি হয়

দুর্ভাগ্যবশত বা সঙ্গত কারণবশতই সঙ্গী বা সঙ্গিনীর কাছে খুব কাছের বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুর কথা বলতে দ্বিধা হয়। যেকোনো সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ রাখলেও মেসেজ বা ফোনকলের লিস্ট মুছে ফেলতে হয়। কখনো হঠাৎ করে সঙ্গীর সামনে সেই বন্ধু বা কাছের কলিগের ফোন বা মেসেজ ভেসে উঠলেই শুরু হয় লংকাকাণ্ড। এটা নিয়ে এক-দুই কথায় ভয়াবহ কিছু ঘটে যেতে পারে। বন্ধুত্ব বা ভালো সম্পর্কগুলো এই সামাজিক মাধ্যম আর অবিশ্বাসের কারণেই দূরে সরে যায়, দাম্পত্যেও চিড় ধরতে পারে এবং ধরেও। এই কারণে ভেঙে যেতে পারে সাধের সংসারটিও। অথবা একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে বাঁচাতে হয়।

স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটতে পারে

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার অনেকের কাছে এখন অন্যান্য কাজের চেয়েও জরুরি। কিছুক্ষণ পর পর ফেসবুকের নিউজফিড চেক করা, ইন্সট্রাগ্রামে আপলোড করার জন্য ছবি তোলা, ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করা, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত খবরটা বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করার মতো ব্যাপারগুলো ঘটে।

এগুলো অন্যজনের কাছে কোনোভাবেই কাম্য নয়। বার বার ফোনের কাছে ছুটে যাওয়া, নাওয়া খাওয়া ফেলে চোখের সামনে ফোনটা ফেলে রাখা দৃষ্টিকটু এবং সন্দেহজনক। অনেকেই রাতজেগে ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এটাও অসম্ভব হয়ে পড়ে কখনো কখনো। আবার সম্পর্ক কুল রাখতে সঙ্গীর কাছে পাসওয়ার্ডটি আবার তুলে দিতে হতে পারে। মানে আপনি পড়ে গেলেন একেবারে নজরদারির মধ্যে।

এখানেই ঘটনার শেষ নয়। যখনই মনে একটু সন্দেহ উঁকি দেয় তখন অন্যজনের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ভাইবারে একটা ঢুঁ মেরে আসাই হয় প্রতিদিনের কাজ। কে কোথায় কি কমেন্ট করলো তা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখা চাই। এতে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। ‘ও তোমার ছবিতে লাইক দিলো কেন, আজকাল অমুকের সঙ্গে এত চ্যাট করছো কেন, ফোন নম্বর কি ফেসবুকেই দিছো নাকি’- এই প্রশ্নগুলো রীতিমতো অত্যাচার হয়ে যায়।

আবার অনেকসময় সাধারণ কোনো ঝগড়াও গিয়ে শেষ হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তার মাধ্যমে এমন কিছু কারণ উঠে আসে যা হয়ত আপনি কখন ভাবেননি। এসব কারণে তিক্ততার সৃষ্টি হয় অনেক বেশি। একপক্ষ ভাবা শুরু করলো যে, এইটুক বিষয় নিয়ে কীভাবে এতগুলো কথা শুনতে হলো। অপরপক্ষ ভাবছে কীভাবে আপনি এমনটা করতে পারলেন। কিন্তু সমস্যা এখানেই ডালপালা গজাতে থাকে।

সামাজিক মাধ্যমগুলো সত্যিই আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কিন্তু এটি যখন আমাদের বাস্তবজীবন থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় তখনই শুরু হয় ঝামেলা। কিছু সুঅভ্যাস আপনাকে এই সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে-

১. গল্পের বই পড়ুন। বই পড়লে সাধারণত সামাজিক মাধ্যমের দিকে ঝোঁক কমে আসে। নিয়মিত প্রতিদিন পড়ার চেষ্টা করুন।

২. ফোনে অ্যালার্ম সিস্টেম দিয়ে রাখুন। প্রাথমিক অবস্থায় একঘণ্টা করে অ্যালার্ম দিতে পারেন। ভাবুন অ্যালার্ম না বাজা পর্যন্ত কোনোভাবেই মুঠোফোনের কাছে গিয়ে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবো না।

৩. গান শুনুন। একটানা কাজ করলে শরীর এবং মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন বিরতি হিসেবে ফেসবুক স্ক্রল না করে একটা পছন্দমত গান শুনে ফেলুন।

৪. ফোনেই অন্য কাজ করুন। এই ধরুন কোনো কুইজ খেললেন, মজার কোনো গেম খেললেন কিছুক্ষণ, মুভি দেখলেন, ইন্টারনেটে জানা-অজানা পড়াশুনা করলেন।

৫. পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। ঘুরতে যান, বন্ধুদের সঙ্গে স্বশরীরে দেখা করুন। সামাজিক মাধ্যমে সামাজিক না হয়ে সত্যিকার অর্থে সামাজিক হওয়ার চেষ্টা করুন, পারবেন।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ