ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

প্রথম চাকরির প্রস্তুতি

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০৬ এএম
প্রথম চাকরির প্রস্তুতি

পরিশ্রমী জাতি হিসেবে চীনের জনগণের বেশ সুনাম রয়েছে। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বছর আগে লেখা চীনা কিছু ঐতিহাসিক লিপিতে বিখ্যাত একটি উক্তি পাওয়া যায়, যা চীনারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস এবং অনুসরণ করে। তা হলো, ‘হাজার মাইলের লম্বা পথ অতিক্রমের শুরু হয় মাত্র এক পা এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে’ (A journey of thousands miles begins with a single step). সেই প্রাচীনকালে চীনের দার্শনিক এবং লেখক লাওজী’র (Laozi) লেখায় এই প্রবাদটি পাওয়া যায়, যা অনুসরণ করে চীনারা সাফল্যের শিখরে উঠতে পেরেছে বলে সবাই বিশ্বাস করে।

এই প্রবাদের সূত্র ধরেই বলা যায়, বিশাল শিল্পগোষ্ঠী বা কর্পোরেট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তার কর্মজীবনের শুরুতে তিনিও একটি অফিসে একজন নতুন কর্মী বা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই। তাই যারা নতুন কর্মী বা এক্সিকিউটিভ হিসেবে কোনো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, প্রথমেই তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলবো তুমি দৌড়ের ট্র্যাকে উঠে গেছ। দৌড় শুরুর বাঁশিও বেজে গেছে। সামনে, পিছনে, ডানে, বামে সবাই ছুটছে শেষপ্রান্তের লালফিতার দিকে। সুতরাং বসে থাকার বা পিছিয়ে পড়ার আর কোনো সুযোগ নেই। সামনে যখন এগুতেই হবে, এসো জেনে নিই কীভাবে এগুলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা নেই; বরং রয়েছে অগ্রযাত্রা আর সাফল্যের সোনালি সম্ভাবনা।

মানসিক প্রস্তুতি

এতদিন ছিলে শিক্ষার্থী। স্যার বা ম্যাডাম বলে যাদের জানতে, তারা স্নেহের চোখে দেখতো তোমাকে। একটু দেরি, একটু ক্যাজুয়াল পোশাক, একটু অগোছালোভাব- এসবকে বড় কিছু মনে করতেন না কেউই। এখন কর্মজীবী হিসেবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তোমার কাছে প্রত্যাশাটাও ভিন্ন। বিষয়টা নিয়ে ভেবেছ কি? এই ভাবনাটাই হোক তোমার মানসিক প্রস্তুতির শুরু। এরপর এতদিন অফিসের সময়ে কি করতে যা আর করা যাবে না, তা নিয়ে ভাবতে পারো। অফিসের সময়টায় যারা ফোন করতো, আড্ডা দিতো, হ্যাংআউট প্লান করতো- তাদের অফিসের সময়টা জানিয়ে রাখতে পারো। মনে রেখো, এ এক নতুন যুদ্ধ। আর তুমিই যুদ্ধে সেনাপতি।

জামা-কাপড় তৈরি তো?

কর্পোরেট অফিসে লিখিত বা প্রচলিত একটি ড্রেসকোড থাকে, যা মোটামুটি সবাই অনুসরণ করে। ইন্টারভিউ দেওয়ার সময়ে যে ফরমাল ড্রেস পরতে হয়েছিল সেরকম পোশাকই যে পরতে হবে, তা নাও হতে পারে। সুতরাং মানবসম্পদ বিভাগ বা অফিসের পরিচিত কারো কাছ থেকে ড্রেস কোডটা জেনে নিতে হবে। আবার অফিসিয়াল ওয়েবপেইজ বা ফেইসবুক পেইজে থাকা ছবিগুলো লক্ষ্য করলেও ড্রেসকোডের ওপর একটা ধারণা পাওয়া যাবে। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রথম সপ্তাহের ড্রেস তৈরি করা চাই।

আরও জানতে হবে

নতুন প্রতিষ্ঠান বা অফিস সম্পর্কে আরও জানতে হেবে। ইন্টারভিউ দেওয়ার আগে যা জেনেছ, তা কিন্তু যথেষ্ট নয়। ওয়েবপেইজ, ফেইসবুক, টুইটারসহ যত সোশ্যাল মিডিয়া  আছে, সবকিছু দেখতে থাকো। অফিসে যারা কাজ করছে তাদের প্রোফাইল খুঁজে খুঁজে জানতে থাকো সবার সম্পর্কে। বিশেষ করে যারা শীর্ষস্থানীয়, তাদের প্রোফাইল দেখতে লিংকড ইন এবং অন্যান্য সব তথ্যভাণ্ডার খুঁজতে থাকো। এতে নিজেকে প্রস্তুত করতে এবং যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে সুবিধা হবে। আর প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, কাজের ধরন, সাফল্য, চলমান প্রকল্প, আসন্ন প্রকল্প বা প্রোডাক্ট- এসব বিষয়ে যতই জানবে, ততই তুমি সেরা হয়ে উঠবে।

যাওয়াটা যেন জুতসই হয়

নিজের বাসস্থান থেকে নতুন কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য জুতসই একটা পরিকল্পনা করতে হবে। সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে সময়ের দিকে। প্রথম দিনগুলোতে কোনোভাবেই দেরি করা চলবে না। বৃষ্টি, যানজট, গাড়ি না পাওয়া, লিফটে লম্বা লাইন- এসব অজুহাত কেউ আশা করে না। প্রয়োজনে যোগ দেওয়ার আগে প্রতিদিন যেভাবে যেতে চাও তা সরেজমিনে দুএকবার অভ্যাস বা প্র্যাকটিস করো। বিকল্প ব্যবস্থাও ভেবে রেখো। উবার, পাঠাও, সহজ বা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করতে চাইলে প্র্যাকটিসের সময় ঘড়ির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এরপর অফিসেই হয়তো একটা দল বা আশেপাশের সহকর্মীর সঙ্গে একসঙ্গে যাওয়া যাবে। বাহনের কথা মাথায় রেখে পোশাক নির্বাচনটাও জরুরি।

কাগজপত্র গুছিয়ে রাখো

নতুন অফিসে যোগ দেওয়া মাত্র যেসব কাগজ জমা দিতে হবে তার একটা তালিকা করে নাও এবং একে একে সব কাগজ গুছিয়ে নাও। আগে জমা দিলেও এক কপি বায়োডাটা, ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, সত্যায়িত শিক্ষাগত যোগ্যতার কপি, প্রশংসাপত্র বা অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক হিসাব নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি প্রায় সব অফিসেই চেয়ে থাকে। তাই এগুলো রেডি করে রাখা ভালো।

প্রথম থেকেই কথা বলতে হবে সাবধানে

নতুন হিসেবে তোমাকে পরিচিত হতে হবে সবার সঙ্গে। পেশাদার কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগ নতুন কেউ আসার আগেই একটা ওরিয়েন্টশন প্রোগ্রাম তৈরি করে রাখে। তবে প্রোগ্রাম তৈরি থাকুক বা না থাকুক, তোমাকে নিজ মুখে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। কর্তাব্যক্তি থেকে টি-বয় পর্যন্ত সবাই তোমার সম্পর্কে জানতে চাইবে। বায়োডাটা তো সবার কাছে যাবে না, তাই মুখের কথাতে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। সুতরাং কোন পর্যায়ের সহকর্মীকে কীভাবে কি বলবে তা আগেই ভাবতে হবে। বিব্রতকর বা ব্যক্তিগত প্রশ্নও করতে পারে কেউ। সুতরাং স্মার্টলি সবকিছুর উত্তর দিতে হবে। এজন্য সাবধানতা এবং পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে কথা বলাই বাঞ্ছনীয়। নিজেকে বড় কিছু হিসেবে জাহির করা, কোনোকিছু বানিয়ে বলা, নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরা- কিছুই প্রত্যাশিত নয় নতুনদের কাছ থেকে। বিয়ে করেননি কেন, বাচ্চা নিচ্ছেন না কেন- এমন অবান্তর প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। তুমি কি তৈরি? লিফটেই হয়ত দেখা হয়ে যাবে সিইওর সঙ্গে জিজ্ঞেস করবে কোন ফ্লোরে যাবেন, কার কাছে যাবেন? উত্তর রেডিতো?

প্রযুক্তি বিষয়ে জেনে নিন

প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় সব অফিসেরই কিছু পলিসি থাকে যা জানা প্রয়োজন। যেমন কিছু অফিসে ব্যক্তিগত ল্যাপটপ নেওয়া নিষেধ। এছাড়া ট্যাব, ক্যামেরা, স্মার্টওয়াচ, এমনকি পেনড্রাইভের মতো এক্সটারনাল বা মেমোরি ডিভাইসও নিষিদ্ধ হতে পারে। অফিস চলাকালে কোনো সোশ্যাল মিডিয়া বা সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। এসব না জানলে শুরুতে বিপত্তি ঘটতে পারে। আবার অনেক অফিসে নিজস্ব ডিভাইস ব্যবহার প্রত্যাশিত যা Bring your own device বা BYOD Policy নামে পরিচিত। সুতরাং অফিসে ঢোকার আগে জানার চেষ্টা করলে দোষ নেই- বরং লাভের সম্ভাবনাই বেশি।

ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কেও জানতে হবে

হাতে সময় থাকলে নিজ অফিসের বাইরে একই ধরনের আরও প্রতিষ্ঠান বা সার্বিকভাবে এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কেও জানতে হবে। ধরা যাক, তুমি কোনো বেসরকারি বিমান সংস্থায় যোগ দিচ্ছ। সুতরাং শুধু নিজের বিমান সংস্থাই নয়, দেশ-বিদেশের অন্যান্য বিমানসংস্থা বিষয়েও জেনে নিতে পারো। এই পূর্বপ্রস্তুতি পরবর্তীতে কাজে লাগবে।

নিজেকেও সময় দিতে হবে

একটা চাকরির জন্য হয়ত অনেক টেনশন গেছে। চেহারাও খারাপ হয়ে গেছে ছুটতে ছুটতে। এবার একটু স্থির হতে হবে। নিজেকে নিয়ে ভাবতে হবে। প্রয়োজনে সেলুন বা পার্লার থেকে ঘুরে আসো অফিস শুরুর আগেই। বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়র সঙ্গে দেখা করে আসো। বন্ধু বা প্রিয় কারো সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ারও প্রয়োজন আছে জীবনে। কি স্বপ্ন ছিল, কি হতে পারতাম, কি হারালাম- এসব নিয়ে এখন ভাবার দরকার নেই। বরং নতুন অফিসে প্রথম থেকেই কীভাবে মানিয়ে নিবে তা নিয়ে ভাবো।

নামায ও খাবার পরিকল্পনা

অফিস শুরুর আগেই নামাযের সময় এবং নামাযের নির্দিষ্ট এলাকা সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো। নিজ অফিস বা নিজ বিল্ডিংয়ে অযু ও নামাযের ব্যবস্থা থাকলেতো ভালো। না থাকলে আশেপাশে কোথায় নামায পড়বে তা দেখে রাখা উচিৎ। একই কথা খাবারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নতুন বলে লজ্জায় না খেয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সময়মতো খেয়ে নতুন উদ্যমে কাজ করাটাই সমীচীন। তাই নাস্তা বা দুপুরের লাঞ্চের জায়গাটা আগেই নির্বাচন করে রেখো। এতে সময় বাঁচবে। অফিসে খাবার সরবরাহ বা বাসা থেকে নেওয়া খাবার সংরক্ষণ এবং খাওয়ার ব্যবস্থা জানা থাকা ভালো। ধূমপানের বদঅভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করার এটাই উত্তম সুযোগ। আজকাল অধিকাংশ অফিসে ধূমপান নিষিদ্ধ। কোনো সিনিয়র ধূমপান করলে নতুন যোগ দেওয়া কেউ ধূমপান করবে- এটা মানবে না কেউই। তাই ধূমপানের আলাদা জায়গা না খুঁজে ছেড়েই দাও ধূমপান। অনেকে তো আবার ধূমপানের পর মুখে আর হাতে যে গন্ধ হয় সেটাও সহ্য করতে পারে না। তোমার বস যদি এমনই কেউ হয়!

ব্রিটিশ সব্যসাচী লেখক ও চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হাজলিট (William Hazlitt) উনিশ শতকের শুরুতে লিখেছিলেন যে, ‘প্রথম সাক্ষাতে যা দেখা যায়, তা-ই সবচেয়ে বেশি সত্য হয়ে থাকে (First impressions are often the truest)। আবার ইংরেজিতে প্রবাদ আছে, ‘প্রথম অনুভূতিই শেষ অনুভূতি’ (First impression is the last impression)। সেনাবাহিনীতে প্রচলিত কথা ‘হলো একটি ভালো শুরু মানেই অর্ধেক যুদ্ধ’ (A good start is half of the battle)।

হে নতুন, তোমার শুরুটা শুভ হোক।

 

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক। সেনাবাহিনী ও কর্পোরেট জগতে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। বিদেশে স্কুল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এক দশক।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ