ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

বন্ধুত্বে যখন ঈর্ষা

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার, ০৮:০০ এএম
বন্ধুত্বে যখন ঈর্ষা

আপনার খুব ভালো রেজাল্ট হয়েছে বা ভালো একটা চাকরি পেয়েছেন, আনন্দে গদগদ হয়ে বন্ধুকে জানালেন। মুহূর্তেই বন্ধুটির মুখ শুকিয়ে গেলো। শুকনো মুখেই আপনাকে অভিনন্দন জানালো। আপনি ভাবলেন, ব্যাপার কি! আবার দুদিন পর শুনলেন আপনার সেই প্রিয় বন্ধুটিই অন্য কারো কাছে আপনার এই সাফল্য নিয়ে বাঁকা কথা বলে বেড়াচ্ছে। আপনি তো অবাক। বন্ধু কেন এমন করছে, ঈর্ষা নয়তো?

আপনার নিজের মনটাই আপনার অধীনে নেই, সে কি চায় না চায় সবার অজানা। ক্রোধ, অহংকার, ভালোবাসা, আনন্দ কিংবা হিংসা— এগুলো সব জড়িয়ে পেচিয়ে আমাদের মধ্যে বাস করে। আপনাকে জানে, বোঝে বা আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকার মধ্যে বন্ধু অন্যতম তো বটেই। আপনি হয়ত কাছের বন্ধুটির জন্য সবসময় এগিয়ে আসেন, তাঁর বিপদে-আপদে আপনিই তার সবচেয়ে কাছের একজন। কিন্তু কখনো কখনো আপনি হয়ত নিজের অজান্তেই প্রিয় বন্ধুর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তে পারেন। কিংবা আপনার বন্ধুটিও হতে পারে ঈর্ষান্বিত। কিন্তু কেন হয় এমনটা!

বন্ধুটি পড়ালেখায় আমার চেয়ে এগিয়ে গেল, একই প্রস্তুতি নিয়ে ওর রেজাল্ট আমার চেয়ে ভালো হলো কীভাবে, ও আরেক বন্ধুটিকে বেশি সময় দিচ্ছে কেন, বন্ধুটি গতমাসে ভালো চাকরিতে ঢুকে গেলো অথচ আমার কিছু হলো না, বন্ধু যোগ্যতার বাইরে এত ভালো একটা ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ালো কীভাবে- এমন বিভিন্ন কারণেই মনের কোণে হিংসা উঁকি দিতে পারে। আর ব্যাপারটি সবসময় একপক্ষীয় হয় না। দুইপক্ষেরই হতে পারে। কখনো সেটা প্রকাশ হয়, কখনো হয় না।

সবকিছু মিলিয়ে একজন বন্ধু আরেকজনের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে পারে। এটা এক পক্ষ আরেকপক্ষকে করতে পারে, আবার দুজনে একসঙ্গেও করতে পারে। সমাজে আবার আরেকটা কথা বেশ প্রচলিত। ঈর্ষার দায়ভার মেয়েদের ঘাড়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি আমাদের। আসলে কিন্তু এমন নয়। অনেক ছেলেও তার মেয়েবন্ধুটিকে হিংসার চোখে দেখতে পারে। একটি ছেলেও আরেকটি ছেলেকে চরম ঈর্ষা করতে পারে। 

পড়াশুনা দিয়েই ঈর্ষার শুরু হয় বেশি। একই সঙ্গে একই শিক্ষকের কাছে, একই নোট নিয়ে পড়ার পরেও আরেকজনের রেজাল্ট ভালো হলো কীভাবে? ও এগোলো কীভাবে, তার মানে কিছু লুকালো নাকি? পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের শুরু এভাবেই। কাছের বন্ধুরা যখন হুট করেই বদলে যায়, নিজের থেকে এগিয়ে যেতে থাকে তখন তো মনের অজান্তেই সেটি ভিতরে বিঁধতে থাকে।

ব্যাপার আরও রয়েছে। সহকর্মীও কখনো কখনো ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে অফিসের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে ঈর্ষা। দেখা যাবে যে বস হয়তো একজনকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, অপরজন হয়তো সেই বসকে তেমন পছন্দ করেন না। ব্যস, শুরু হয়ে গেল দ্বন্দ্ব। এ থেকে ঈর্ষার লম্বা ইতিহাসের সূচনা এবং ধারাকবাহিকতা।

মজার বিষয় হলো, এই ঈর্ষা মনের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। এই ঈর্ষা বুকে চেপেই বন্ধুত্বগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে চলেও। দেখা যায়, বন্ধুত্বের সময়কাল পাঁচ থেকে ছয় বছরের, কিন্তু হিংসা বোধটাও সঙ্গেই রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে, আপনি হয়তো তাকে আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করছেন, কিন্তু সে হয়তো আপনাকে সেই চোখে দেখছে না।’

কী করবেন এক্ষেত্রে

যখন বুঝতে পারবেন, আপনার এতদিনের প্রিয় বন্ধুটিই আপনার বিপক্ষে রয়েছে, তখন খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। হয়তো মুখ ফুটে সরাসরি কিছু বলতেও পারছেন না। কিন্তু ভেতরে ঠিকই একাকিত্ব বোধ করছেন। সেক্ষেত্রে হাজারো মানুষের মধ্যে আপনার প্রকৃত বন্ধুকে চিনে নিতে হবে। একজন বন্ধুর এমন পরিবর্তন মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ভাবুন তো, আপনার বন্ধুটি আসলেই আপনার প্রকৃত বন্ধু তো? বিশ্বাস করে হয়তো তাঁকে অনেক কথাই বলে ফেললেন। কিন্তু আগে যাচাই করে নিন, বন্ধুটিও কি আপনাকে কাছের মনে করছেন কি না। এক্ষেত্রে আগে থেকেই কাউকে বিচার না করে বুঝতে শিখুন। সময় নিন।

পরিবেশ, ঘটনা, মানুষ আর আপনার পরিস্থিতি- সবকিছুই পরিবর্তনশীল। হয়তো এমন একটা পর্যায় এসেছে যে আপনার বন্ধুটি একটু বদলে গেছে। বদলে গেছে আপনাদের সম্পর্কটাও। দীর্ঘদিনের বন্ধুই বিপক্ষে চলে গেছে। এমন হলে আপনি সরাসরি তাকে সব খুলে বলুন। কোনো কারণে সে কষ্ট পেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করুন।

এরপরেও সমস্যার সমাধান না হলে আপনাকে বুঝতে হবে বন্ধুত্ব হয়ত শেষ হতে যাচ্ছে। একাকীত্ব কাটাতে বা বন্ধুর এরূপ ব্যবহার ভুলতে বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন। হয়তো সময় লাগবে কিন্তু অপর একজন বন্ধু পেয়ে যাবেনই।

বন্ধুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষকে না জানানোই ভালো। সবার আগে চেষ্টা করুন নিজেকে চিনতে। বন্ধুটি নয়, আপনারও কোনো সমস্যা তো থাকতে পারে। আবার হয়ত মফস্বল আর শহর থেকে আসা দুজন বন্ধুর মধ্যে একটা জটিলতা তৈরি হয়ে যেতেই পারে। সেক্ষেত্রে ভেবে দেখুন, আপনার কোনো বিষয় হয়ত বন্ধু মেনে নিতে পারেননি। সমঝোতায় আসুন। ঠিক না হলে আপসেই সরে আসুন।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ