ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

সামাজিক মাধ্যম ডেকে আনছে বিষণ্নতা

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সোমবার, ০৮:০১ এএম
সামাজিক মাধ্যম ডেকে আনছে বিষণ্নতা

কাজ শেষে খুব আয়েশ করে বসলেন সামাজিক মাধ্যমে। ভাবলেন নোটিফিকেশন দেখেই বের হবেন। কিন্তু কমেন্ট, ভিডিও আর চ্যাটিংয়েল ফাঁকে কখন যে ঘণ্টা পেরিয়ে গেছেন টেরই পেলেন না। এর মাঝখানে কাজ, ঘুমের ব্যাঘাত হলো। চ্যাটিং করে, বন্ধুর ঘোরাঘুরির ছবি দেখে মন খারাপ করে অন্য কাজে গেলেন। এই মন খারাপ থেকে শুরু হলো বিষন্নতা, ঘুম তো নষ্ট হলোই। এটা তো এখন আমাদের দৈনন্দিন ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ এত বেশি সময় মগ্ন হয়ে থাকছে যে বাস্তবজ্ঞান থাকছে না মাঝেমধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে নিরর্থক, ভার্চুয়াল দুনিয়াটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। এতে মনে চাপ পড়ছে, ভাবনাচিন্তার পরিধি পাল্টে যাচ্ছে। এইদিকে ফেসবুক বেশি এগিয়ে। তরুণরা ফেসবুককে তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে ধরে নিচ্ছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে তরুণরা মানসিক উদ্যম হারিয়ে ফেলছে, মানসিকভাবে অসুস্থ, অস্থিরচিত্ত, বিষণ্ণ হচ্ছে। মানসিক সুস্বাস্থ্যের পথে কাঁটা হচ্ছে ফেসবুক। সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের গঠনকে ধ্বংস করে ফেলছে।

ফেসবুকে লগইন করার পরই আমরা এক অন্য দুনিয়ায় হারিয়ে যাই। নিউজফিড স্ক্রল করার সময় আমাদের সামনে হরেক রকমের পোস্ট ভেসে আসে। এসব পোস্ট দেখে আমরা হাসি, কাঁদি আবার কখনো বিরক্ত হই। এই ভিন্নধর্মী আবেগগুলো আমাদের মনের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে। সোজা কথায়, ফেসবুক আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ফেসবুকের কল্যাণে আমরা এখন আমাদের বন্ধু বা চারপাশের মানুষজনের হাঁড়ির খবর জানতে পারছি। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই যখন আমরা নিজেদের সঙ্গে সেগুলো তুলনা করলে। আর হিসাব না মিললে বাধে ঝামেলা। কারণ অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করলে নিজের অবস্থাকে নেতিবাচক মনে হয়। কারো ট্যুরে যাওয়ার ছবি দেখে আপনার মনে হয়, আমি কেন ট্যুরে যেতে পারছি না। তখন ব্যর্থতা আর তুলনা মাথায় আসে। আর তখনই ঘটে যত বিপত্তি আর বিষণ্নতা।

ফেসবুক না থাকলে তো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব করে দুঃখ পাওয়ার মতো বোকামিটা আপনি এভাবে করতেন না। শুধু তো তাই নয়, কে আপনাকে না জানিয়ে ট্যুরে চলে গেলো, কার জন্মদিনে আপনাকে দাওয়াত দিলো না, বন্ধুদের হ্যাংআউটের ছবিতে আপনাকে ট্যাগ দিলো না বা আপনার ছবি কম দিলো, অমুকের বিয়ের ছবি দেখে আপনি প্রায়ই মনের অজান্তে বিমর্ষ হয়ে যান। এটা কেমন অদ্ভুত না?

ফেসবুকে বসলে সময়জ্ঞান থাকে না। অল্প কিছুক্ষণের জন্য ফেসবুকে থাকবো মনে করলেও নিজেদের অজান্তেই ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ফেসবুকে ব্যয় করি। কখনো নিউজফিডে অলস স্ক্রলিং আবার কখনো অপরিচিত ব্যক্তির প্রোফাইল ঘেঁটে দেখতেই সময় অপচয় হয়। চ্যাটিংয়ের ব্যবস্থা তো রয়েছেই। এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হতে সময় লাগে না, সময়ও নষ্ট হয় অনেক।

নিজের ভালোটা আগে বুঝুন। এমন কোনো কাজ করুন যাতে আপনার লাভ হবে। আপনার সময়টুকু ভালো কাজে লাগান কোনো উৎপাদনশীল কাজে। যেমন, আমি যদি এই লেখাটা সেদিন না লিখে ফেসবুকে বসে থেকে মিম দেখে বেড়াতাম তাহলে কি আজকে আপনি এটা পড়তে পারতেন? এখন প্রকাশিত লেখাটা পাঠক পড়ছে দেখে আমার নিজের কাছেই তৃপ্তি হচ্ছে। সুতরাং ফেসবুকে বাড়তি সময় না দিয়ে এমন কাজ করুন যাতে নিজের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার প্রকাশ ঘটে, মানসিক সন্তুষ্টি আসে। তখন ফেসবুক নিয়ে মাথা ঘামবে না।

ফেসবুক যেন আপনার জীবনের বেশিরভাগ সময় না নিয়ে নেয় তার জন্য সচেতন হন। ফেসবুকে ঢুকে নোটিফিকেশন, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট চেক করতে পারেন, মেসেজের উত্তর দিতে পারেন। তারপর নিউজফিড ঘুরে দেখতে পারেন। কিন্তু এরপর আর ফেসবুকে না থাকাই উচিত। কারণ দরকারি কাজ সারার পর বাকিসময় ফেসবুকে থাকা সময়ের অপচয়। এছাড়া সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিনদিন ফেসবুকে লগইন করতে পারেন। বাকি দিনগুলোতে ফেসবুক থেকে দূরে থাকলে দৈনন্দিন কাজগুলো সারার জন্য হাতে যথেষ্ট সময় থাকবে। এভাবেও ভাবতে পারেন যে, দিনের মাত্র একঘণ্টা ফেসবুক ব্যবহার করবেন।

আবার আরেকটা ব্যাপারও হয়। মনের মধ্যে বাসনা থাকে বেশি লাইক, কমেন্ট বা শেয়ারের জন্য। কিন্তু লাইক-কমেন্টের সংখ্যা নিয়ে বেশি সিরিয়াস হলে হয় সমস্যা। লাইক-কমেন্ট বেশি হলে ভালো লাগে, আর কম হলে মন খারাপ হয়, নিজেকে ব্যর্থও মনে হতে থাকে। আমাদের ফেসবুক ব্যবহারের একটা বড় অংশই জুড়ে রয়েছে এই লাইক-কমেন্টের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির আক্ষেপ।

একটা সময় আসবে যখন হয়ত ফেসবুকে অন্যের কর্মকাণ্ড দেখে বিরক্তবোধ হবে। প্রতিটি পোস্টই অনর্থক মনে হবে। অন্যদের ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি দেখে আপনার কাছে সেগুলো খুবই তুচ্ছ বলে মনে হবে। এমনও হতে পারে, হতাশার চরম অবস্থায় পৌঁছে আপনি হয়তো আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি চিরতরে মুছে ফেলতে চাইবেন। এমন অবস্থা হলে আপনার কর্তব্য হবে ফেসবুক থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি নেওয়া। তবে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মুছে না ফেলাই ভালো। কারণ ফেসবুক কাজেও লাগে। বেশিরভাগ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ বা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ফেসবুক গ্রুপ আছে যেখানে ক্লাস শিডিউল থেকে শুরু করে পরীক্ষার রুটিন ইত্যাদি যাবতীয় দাপ্তরিক তথ্যাবলী শেয়ার করা হয়। তাই একেবারে মুক্তির উপায় নেই।

কিছুদিনের জন্য সোশাল মিডিয়া থেকে ছুটি নিন। ঐ সময়টুকু পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করুন। মেসেঞ্জারে লুডু না খেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাগজের লুডু খেলুন। পরিবারের কাজে মন দিন, পাড়াপড়শির খোঁজখবর নিন। ঘর থেকে বেরিয়ে চারপাশটা একটু বেড়িয়ে আসুন। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে সেলফি তোলার চিন্তা থেকে দূরে থেকে নির্ভার হয়ে অংশগ্রহণ করুন। জীবন তো একটাই। তাই জীবনটাকে ভার্চুয়াল জগতে বন্দী করে রেখে লাভ নেই।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ