ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

দৃষ্টির বদলটা কবে হবে?

লাইফ স্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ০৭:৫৯ এএম
দৃষ্টির বদলটা কবে হবে?

সৃষ্টিকর্তা প্রথম যখন কোনও জীব সৃষ্টি করে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করেন, সর্বপ্রথম তার চোখ দুটি আগে প্রস্ফুটিত করেন এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখার জন্য। এই পৃথিবীর সব থেকে উন্নত জীব, মানুষ ও এর ব্যতিক্রম নয়।একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে অনেকটা পরে গিয়ে, কথা বলা, চলাফেরা করা, বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করা আয়ত্ত করে।কিন্তু সে জন্মের কিছুক্ষণ পর থেকেই গোল গোল চোখ করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে এই পৃথিবীটিকে।সেই থেকেই তার দেখার শুরু।

যখন কোনও শিশু প্রথম এই পৃথিবীতে জন্মায় তখন তার মন থাকে একটা সাদা কাগজের মতো।তার মন তখন থাকে শান্তির প্রতীক।কিন্তু পরবর্তীতে এই সমাজ সংসারই তার সেই সুন্দর মনে হিজিবিজি এঁকে দেয় বা কোনও পরিবার তাকে আরও সুন্দর হতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।তাই এই পৃথিবীটাকে দেখার ,জানার, বোঝার দৃষ্টিভঙ্গী মানুষ প্রথম আয়ত্ত করতে শেখে এই পৃথিবী থেকেই।

আমাদের দৃষ্টি সবসময় আমাদের চারপাশে লাটিমের মতো ঘুরপাক খায়।মানুষের দৃষ্টির অগোচরে আছে এমন কোনও বস্তু এই পৃথিবীতে নেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়-
                               "দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া,
                                 ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া।"

তাই একটু দেরিতে হলেও দৃষ্টি আমাদের সকল জায়গাতেই পৌঁছায়। এই সমাজ ,সংসার, পরিবার, দেশ তথা পৃথিবীর সমস্ত কিছু আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গীর উপর নির্ভর করে। যে যেমনটি দেখতে চাই, এই পৃথিবী তাঁর কাছে তেমন ভাবেই ধরা দেয়।আমরা এই দৃষ্টির সাহায্যেই একজন মানুষ আর একজন মানুষকে পর্যবেক্ষণ করি।এমনকি নিজের ব্যক্তিত্বের ও প্রকাশ ঘটে এই দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে।এক একজনের দেখার দৃষ্টিপাত এক একরকম হয়।দেখার দৃষ্টিভঙ্গীর উপর ই মানুষের চরিত্রের প্রকাশ ঘটে।দেখার দৃষ্টি ই একজনের সঙ্গে আর একজনের পার্থক্য ও তৈরি করে।

কিছু মানুষের দৃষ্টি কুদৃষ্টির আকার ধারণ করে।আর একজন মানুষের চোখের জল ও ঝড়াতে বাধ্য করে।কুদৃষ্টি সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। শুধুমাত্র অ, আ, A,B,C,D জানা  প্রাণীকে শিক্ষিতের পর্যায়ে ফেলতে নারাজ হতেই হয়।শিক্ষিত তো সেই, যার পেটে বিদ্যা না থাকলেও মনে মানবিক বিদ্যা আছে।অন্য মানুষ কে সম্মান দেওয়ার ক্ষমতা আছে।

এখনো  ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে এই সমাজেই একটি মেয়ে কে পোশাক বিতর্কে জর্জরিত হতে হয়! বোরকা নাকি জিন্স? জিন্স টপ পড়া মেয়ে ভালো না খারাপ? ধর্ষণ হলে আগে সমালোচিত হতে হয় মেয়েটি কি পড়েছে তা নিয়ে। ঘরের বউ কি পোষাক পড়ে বাইরে বের হলো সেটাও এক জাতীয় সমস্যা হয়ে যায়। ঐ মেয়ে টা এতো রাতে কোথা থেকে বাড়ি ফিরল? ঘরের বৌযের বাইরে কাজ করাটা কতটা সম্মানের?

এই সব কিছু নিয়ে, এই সমাজেই চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেউ কেউ একটু গলার জোরটা বাড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলেন--

আমার মেয়ে! সে তো সেলেয়ার কামিজ ছাড়া অন্য কিছু পড়েই না।তাও আবার সঙ্গে তার ওড়না টা নেওয়া চাই ই চাই। আর ঐ তো দেখি অমুকের মেয়ে কি বাজে ,কি বাজে একটা ওড়না নেওয়ার কোনও বালাই ই নেই! 

এই সমস্ত মানুষ গুলোর দেখা আমরা কম বেশি সকলেই পাই।এই সমস্ত মানুষগুলোকে একটাই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে--

আপনার মেয়ে কে আঁটো সাঁটো করে বুকে ওড়না পেঁচিয়ে নিতে খুব তো বলেন, সে তো খুব ভালো কথা। তা আপনার ছেলে কে কি কখনো এই শিক্ষা টা দেন, যে- শোন না ,তুই কখনো কোনও মেয়ের বুকের ওড়না সরে গেলে তাঁর দিকে যেন লোভনীয় দৃষ্টি ভঙ্গীতে তাকাস না, তাঁকে তুই বোন/ দিদির সম্মান দিয়ে চোখটি নামিয়ে নিস।কারণ এই পৃথিবীতে তোর জীবন সঙ্গী মাত্র একজন ই হবে।বাদ বাকি সবাই তোর মায়ের জাত, মায়ের অংশ।

না, এই শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা, বা মানসিকতা সবার নেই।কিন্তু সমস্ত মা তাঁর মেয়ে কে অনেক কিছু ই শেখায়।যেদিন আমাদের দেশের মায়েরা তাঁর পুত্রসন্তানটিকে মেয়েদের সম্মান কিভাবে করতে হয় সেই শিক্ষা দিতে পারবে সেদিন ই প্রতিটা দেশ ধর্ষণ মুক্ত হবে।কারণ দেখার দৃষ্টিভঙ্গী টা স্বচ্ছ, সুন্দর না হলে কখনোই সমাজ উন্নত হতে পারে না। পরিবার ই পারে তাঁর সন্তান কে সুশিক্ষা দিতে, আবার এই পরিবারের কোনও না কোনও সদস্যের কাছ থেকে সেই সন্তান টিই কুশিক্ষা ও আয়ত্ত করতে পারে।
             
তাই কেউ যখন বাজে কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়,তখন তাঁর পরিবারের দিকেই আঙুল টা আগে ওঠে।কারণ তাঁর এই বাজে স্বভাবের দায়,তাঁর পরিবারের উপর ই বর্তায়।

মানুষ কতটা নিন্মমানসিকতার হলে,কতটা বর্বরোচিত পরিবার, পরিবেশে মানুষ হলে,কতটা কুশিক্ষা আয়ত্ত করলে, একটি মানুষ আর একটি মানুষের মুখে অ্যাসিড ছুঁড়তে পারে! চিরতরে একটি মানুষের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি টা নষ্ট করে দিতে পারে!

এগুলো ভাবলেই গাঁয়ে কাঁটা দেয়।এই সব মানুষ রুপি জানোয়ার গুলো কিন্তু তার পরিবার কে দেখেই বড়ো হয়েছে। এরা এটা শিখেছে যে, মেয়েরা ভোগ্য সামগ্রীর বস্তু বই অন্য কিছু নয়।তাঁদের কে নিজের ইচ্ছা মতো না কাছে পেলেই চিরতরে শেষ করে দিতে হয়।কোনও বাবা যদি তাঁর সন্তানের সামনে তাঁর মা কে সম্মান করে, মেয়ে জাতিকে সম্মান করে, তাহলে সেই বাবার ছেলে আর যাইহোক কখনোই রেপিষ্ট হবে না,এটা দায়িত্ব নিয়ে বলা যায়।

বর্তমানে কাজের প্রয়োজনে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে, একটু স্বাধীনভাবে বাঁচর ইচ্ছে বুকে নিয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কর্পোরেট জগতেও মেয়েরা এখন প্রবেশ করছে। বেসরকারি জগতে সব কিছুই রঙিন, চকচকে, হাইফাই।কত মেয়ে এই রঙিন জগতের লালোসাময় দৃষ্টিতে ডুবে যেতে বাধ্য হয়, তার হিসাব রাখা দুষ্প্রাপ্য! প্রতিনিয়ত কত মেয়েদের গুঁমড়ানো কান্নার শব্দ কেবলমাত্র ইঁটের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী হয়ে রয় তার পরিসংখ্যা কেউ জানে না। 
        
যে মেয়ে প্রকাশ্যে ধর্ষিত হয়, তাঁর খবর খবরের কাগজে খবর হয়ে প্রকাশ পায়, আলোচনা, কোনটা জাতীয় ইস্যু হয়ে যায়, আবার ধর্ষণ হয় ,অন্য কোনো অন্ধকার গলিময় রাস্তায়। এখানে মেয়েটি কেনো অন্ধকার গলিতে গেছে, সেই প্রশ্ন টাই সবার আগে স্হান পায়। এটাই হচ্ছে আমাদের `দৃষ্টি`।

তাই সব কিছুর আগে এই দৃষ্টিভঙ্গীর বদল চাই।যদি বীজ পোতা ভালো হয়, তাহলে সৃষ্টি ভালো হয়,আর সৃষ্টি ভালো হলে, পৃথিবী এক নতুন রূপ পায়।