এডিটর’স মাইন্ড

ঘরের শত্রুদের হারাতে পারবে আ.লীগ?

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৩ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

দেশ নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু করেছে। যে কোনো সময় নির্বাচন কমিশন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করবে। অন্যদিকে নির্বাচন ঘিরে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগ সভাপতি গত বৃহস্পতিবার দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই নির্বাচন করতে হবে।’ নির্বাচনের পথে আনুষ্ঠানিক প্রধান বাধা বিএনপি। দলটি নির্বাচন ঠেকাতে সহিংস রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। নির্বাচন বানচালের শেষ পর্যন্ত তৎপর থাকবে দলটি, এমন আশঙ্কা আওয়ামী লীগের। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস, নাশকতা কঠোরভাবে মোকাবিলা করছে আওয়ামী লীগ। সহিংস রাজনীতির ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করেছে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটি। ২৮ অক্টোবর বিএনপির তাণ্ডব মোকাবিলায় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের বিএনপির আন্দোলন তাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে চলছে নানারকম খেলা। এসব খেলায় বিএনপি এবং পশ্চিমা কিছু দেশের কূটনীতিকরাই শুধু জড়িত নয়, আওয়ামী লীগেরও কেউ কেউ যুক্ত, এমন কথা কান পাতলেই শোনা যায়। বিএনপি যেমন আত্মঘাতী আন্দোলনে খাদের কিনারে গেছে, তেমনি আওয়ামী লীগেরও কারও কারও মধ্যে আত্মঘাতী তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে আবার অতি আত্মবিশ্বাসী। আবার ক্ষমতায় এসে গেছে, এমন একটা আবেশে তারা আক্রান্ত। যারা আওয়ামী লীগের মধ্যে এসব তৎপরতায় জড়িত, তারা আসলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি করছেন। এরা আওয়ামী লীগের শত্রু। বাইরের শত্রু মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ যতটা দক্ষ, ঘরের শত্রু মোকাবিলায় ততটাই অপ্রস্তুত। ঘরের শত্রুদের কী করবে আওয়ামী লীগ? ইতিহাস বলে, বাইরের শক্তি আওয়ামী লীগকে কখনো হারাতে পারেনি। অতীতে ঘরের বিভীষণদের হাতেই ঘটেছে আওয়ামী লীগের সর্বনাশ।

২০০৬ সালেও নির্বাচন নিয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বিএনপি ছিল ক্ষমতায়, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে। এবারের মতো সে সময়ও নির্বাচন নিয়ে সরব ছিল কূটনীতিকপাড়া। সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্যাট্রিসিয়া বিউটিনেস। গোপনে পরীবাগে আওয়ামী লীগের এক নেতার বাসায় গিয়েছিলেন। গোপন বৈঠক করেছিলেন। তখনই রোপিত হয়েছিল মাইনাস ফর্মুলার বীজ। ঠিক ১৮ বছর পর সেই একই বাড়িতে গেলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এবার পিটার হাস। কী আলোচনা হয়েছে, তা গোপন করা হলো। জলবায়ু নিয়ে হঠাৎ কী এমন তুলকালাম হলো যে, পিটার হাসকে অবরোধ ঠেলে পরীবাগে আসতে হলো? পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রদূতদের বাড়াবাড়িতে বিরক্তি প্রকাশ করছেন প্রকাশ্যে, ঠিক তখন আওয়ামী লীগের অনেকে পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে গোপন অভিসারে। এসব কীসের আলামত। এক-এগারোতে আওয়ামী লীগে যারা সরব ছিলেন, তাদের অনেকে এখন তৎপর। তাদের লক্ষ্য কী? তারা কী চান? এসব প্রশ্ন আজ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আড্ডায় আলোচনা হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে ছুটিতে পাঠিয়ে নির্বাচনী ফর্মুলার কোন মন্ত্রী ‘মৃদু সম্মতি’ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে নানা আলোচনা কান পাতলেই শোনা যায়। বিএনপির আটক এক নেতা আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট দুই নেতার সঙ্গে লন্ডনে পলাতক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের যোগাযোগের এক্সক্লুসিভ তথ্য এখন আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। তাদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কঠোর হতে পারে না কেন? ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগে যারা সংস্কারপন্থি ছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে। কয়েকজন আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন বটে, কিন্তু বাকিদের কারও পদোন্নতি হয়েছে, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংস্কারপন্থিদের সংখ্যা কম নয়। ২০০৭ সালে যারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিলেন, তারাই কি এখন প্রধানমন্ত্রীকে ছুটিতে পাঠানোর ষড়যন্ত্রে জড়িত? এ ষড়যন্ত্রকারীদের আওয়ামী লীগ মোকাবিলা করবে কীভাবে? অবশ্য ২০০৭ সালের আওয়ামী লীগ আর এখনকার আওয়ামী লীগের পার্থক্য অনেক। ২০০৭ সালে অনেক আওয়ামী নেতা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করতেন। চ্যালেঞ্জ করতেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি এক-এগারোর সময় যখন প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমালোচনা করলেন, দ্রুত নির্বাচন দাবি করলেন, তখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাকে সমালোচনা শুনতে হয়েছিল। আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রয়াত মুকুল বোস কেন্দ্রীয় কমিটিতে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এখন আর সেই দিন নেই। এক-এগারো শেখ হাসিনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। দলের তৃণমূল পর্যন্ত তার একক নেতৃত্ব সমর্থন করে। কর্মীদের ভালোবাসায় তিনি এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ষড়যন্ত্রকারীরা এখন বাঘ থেকে বিড়ালে রূপান্তরিত হয়েছেন। মিউ মিউ করা ছাড়া এদের কোনো ক্ষমতা নেই। তবে রাজনীতিতে দুটি শিক্ষা চিরন্তন। প্রথমত, একবারের বিশ্বাসঘাতক সারাজীবনই বিশ্বাসঘাতক হয়। বিশ্বাসঘাতকের চরিত্র কখনো বদলায় না। সুযোগ পেলেই এরা ছোবল মারে। খুনি মোশতাক ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করতে চেয়েছিল। ৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যা করে আবার বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার ঘৃণ্য চেহারা উন্মোচন করেছে। মোশতাকরা বদলায় না। এরা ভালো হয় না।

রাজনীতির দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, কোনো শত্রুকেই খাটো করে দেখতে নেই। ষড়যন্ত্রকারীরা যে কোনো সময়ই ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এজন্য বিশ্বাসঘাতকদের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। একজন বিশ্বাসঘাতকের জন্য একটি রাজনৈতিক দল বিপন্ন হতে পারে। আর শত্রুদের উপেক্ষা করার জন্য সুযোগ রাজনীতিতে নেই।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কী চায় তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্বস্তি দূর করতে হবে দক্ষ কূটনীতি দিয়ে। প্রকাশ্যে হুমকি নয়। প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। কোনো রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এক যুবলীগ কর্মী মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা ধৃষ্টতাপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য। আশার কথা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে যখন ভারতে আলোচনা হচ্ছে, সরকার যখন নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত, তখন আওয়ামী লীগের কারও কারও দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বিপদের কারণ হতে পারে। এরাই ঘরের শত্রু। এরাই ষড়যন্ত্রকারী।

ষড়যন্ত্র নানভাবে হয়। এই যেমন লক্ষ্মীপুর-৩ এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনের কথাই ধরা যাক। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে এ নির্বাচন ছিল স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা। যারা এতে নির্বাচিত হবেন, তারা জাতীয় সংসদে একদিন বসারও সুযোগ পাবেন না। তবে ওই উপনির্বাচনে যারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তারা একদিক দিয়ে মহা ভাগ্যবান। কারণ তারা দুজনই নিশ্চিত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (দ্বাদশ জাতীয় সংসদ) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। তাই তাদের দায়িত্ব ছিল উপনির্বাচনে দৃষ্টান্ত স্থাপন। একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং সুন্দর নির্বাচন করে সব সমালোচনার জবাব দেওয়া। বিএনপি যখন বলছে, তারা অংশ না নিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে না। বিএনপির অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তখন বিএনপির এ অভিযোগ খণ্ডনের এক চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, এ দুটি উপনির্বাচনে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ উপনির্বাচন দুটি সুষ্ঠু হলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে আওয়ামী লীগের মান রক্ষা হতো। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে আওয়ামী লীগ বলতে পারত, এই দেখো আমরাও পারি। বিএনপি ছাড়াও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। এই নির্বাচন যদি ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনের মতো মাত্র ১৩ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি হতো, তাহলেও সমস্যা ছিল না। সবাই জানে শেষ মুহূর্তেই এরকম উপনির্বাচনের ব্যাপারে ভোটারদের আগ্রহ থাকে না। প্রার্থীদের দায়িত্ব ছিল শুধু সুষ্ঠু এবং সুন্দর ভোট নিশ্চিত করা। কিন্তু ৫ নভেম্বরের নির্বাচনে এ দুই আসনে লজ্জাজনক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। গণহারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরানোর দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভোট জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পেয়ে নির্বাচন কমিশন ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত করেছে। কী ভয়াবহ লজ্জার ঘটনা। আওয়ামী লীগ সারা জীবন ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছে। আওয়ামী লীগই এ দেশে গণতন্ত্রের সংগ্রাম করেছে, সেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী (দুজন) কী করে এরকম ন্যক্কারজনক কাণ্ড করতে পারেন। বিশেষ করে, যে সময় নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কড়া নজরদারি। এ দুই আসনের উপনির্বাচন আওয়ামী লীগ সভাপতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড় করাল। প্রধানমন্ত্রী সব আন্তর্জাতিক ফোরামে, বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘আগামী নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নির্বাচনে কোনো কারচুপি প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। নির্বাচনে সরকার প্রভাব বিস্তার করবে না।’ শুধু আন্তর্জাতিক ফোরামে নয়, দলীয় ফোরামেও প্রধানমন্ত্রী একই কথা বলছেন বারবার। প্রধানমন্ত্রীর এ অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ করল দুই অর্বাচীন প্রার্থী। জাতীয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে যারা এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড করে, তারা একালের মোশতাক। জাল ভোটে ব্যালট বাক্স ভরিয়ে তারা কী প্রমাণ করল? তারা কি এটাই প্রমাণ করল না যে, এটা তো জাতীয় নির্বাচনের একটি মহড়া মাত্র। জাতীয় নির্বাচনেও তারা এমনটাই করবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমারা কি বিশ্বাস করবে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে? অতি উৎসাহীরা কি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে দেবে? অর্থহীন দুই উপনির্বাচনে অতি উৎসাহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের কত বড় ক্ষতি করেছে, তা বোঝার সামর্থ্য কি তাদের আছে? তারা জেনেবুঝেই আওয়ামী লীগকে বিব্রত এবং বিতর্কিত করার জন্য এসব করেনি, তা কে বলবে?

আওয়ামী লীগের ভেতর অনেক মোশতাক। তারা নানা সর্বনাশের খেলা শুরু করে দিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এরকম বহু আত্মঘাতী তৎপরতা হয়তো আমরা দেখব। এসব ঘরের শত্রুদের মোকাবিলা করতে হবে আওয়ামী লীগকে। সন্ত্রাসী, অগ্নিসংযোগকারীদের বিরুদ্ধে সরকার যেভাবে কঠোর হয়েছে, এসব নব্য মোশতাক দুর্বৃত্ত, ছদ্মবেশীদেরও প্রতিহত করতে হবে এখনই। না হলে ঘরের শত্রুদের হাতেই আওয়ামী লীগ বিপর্যস্ত হবে আরও একবার।


লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল : poriprekkhit@yahoo.com


বাংলাদেশ   রাজনীতি   আওয়ামী লীগ   ষড়যন্ত্র   সৈয়দ বোরহান কবীর  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাস: স্বস্তির চেয়ে শঙ্কা বেশি

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ৬ মাস অতিবাহিত হলো। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ  হাসিনা। গঠন করেন নতুন মন্ত্রিসভা। সেই চতুর্থ মেয়াদের সরকারের ৬ মাস পূর্তি হয়েছে। যদিও ৬ মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। বরং এটি সূচনা মাত্র। তবে আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থ বারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তাই একটি নতুন সরকার বলতে যা বোঝায় সেইরকম কোন অবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য প্রযোজ্য নয়। টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারকে নতুন সরকার বলা যায় না। এটি ধারাবাহিকতা। সে কারণে এই সরকারের জন্য অপেক্ষাকালীন সময় নেই। সরকারকে জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে না, বরং কাজ চাইছে। প্রতিটি নতুন সরকারের যে ‘মধু চন্দ্রিমা’ সময় থাকে, সেটি উপভোগ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। মূলত এক কঠিন প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নির্বাচন করে এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এর প্রতিক্রিয়া কি হবে ইত্যাদি বিষয় ছিলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাবের কারণে নির্বাচন নিয়েই একধরনের শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিলো। 

বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য আওয়ামী লীগ ভিন্ন এবং অভিনব একটি কৌশল গ্রহণ করে । দলের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। যারা নৌকা প্রতীক পাননি, তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। যেকারণে নির্বাচন মোটামুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের উপরে গেছে  মূলত আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী কৌশলের কারণে। নির্বাচনের পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বললেও শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। 

নির্বাচনের পর বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি করে তা নিয়েও একধরনের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠন করলে বিএনপি হতাশায় ভেঙ্গে পরে। রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে নিজেরাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নেয়। ফলে নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক চাপ যেমন আওয়ামী লীগ সামাল দিতে পেরেছে, ঠিক তেমনি দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিলো তা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া এই নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কাজেই নির্বাচনের পর বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কিনা, বাংলাদেশ একঘরে হবে কিনা ইত্যাদি শঙ্কা ১১ জানুয়ারির পর আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পরে। ফলে নতুন সরকারের সূচনা হয় স্বস্তির মধ্যে দিয়ে। 

কিন্তু নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পরও গত ৬ মাসে আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে নেই। আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপ নেই। বিরোধী দল নিষ্প্রভ। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আওয়ামী লীগের জন্য কোন রকম বড় ধরনের চাপ নেই। কিন্তু তারপরও সরকার অস্বস্তিতে, চাপে। নানা কারণে সরকারের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। অর্থমন্ত্রী তা নিজেই স্বীকার করেছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গত জুনে নতুন সরকার প্রথম বাজেট দিয়েছে। কিন্তু এই বাজেটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কতটুকু হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতির চেহারা বিবর্ণ থেকে উজ্জ্বল হবার কোন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং অনিয়ম। ব্যাংক খাতে রীতিমতো লুণ্ঠন হয়েছে, যে লুণ্ঠনের ক্ষতগুলো এখন দগদগে ঘায়ের মতো উন্মোচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপী ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। অর্থপাচারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিময়তা নষ্ট হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে যদি অর্থনীতিকে সামাল দিতে না পারে তাহলে সরকারের জন্য বড় সংকট অপেক্ষা করছে বলেই আমি মনে করি। 

অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে দ্রব্যমূল্যের। দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা ছিলো। কিন্তু গত ৬ মাসে এনিয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা বাজারে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। যেকোন সময় এই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের যে উদ্যোগগুলো এখন পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে তার কোনটারই সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং দ্রব্যমূল্যে সিন্ডিকেট, মুনাফা লোভী, মজুতদারদের দাপট বেড়েই চলেছে। প্রচন্ড ক্ষমতাবান সরকার বাজারের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।

দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি আলোচনায় তাহলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজদের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদকে সরাসরি দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্নীতির কারণে আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিল হয়েছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল বিত্ত-বৈভবের খবর পুরো জাতিকে চমকে দিয়েছে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির কেচ্ছা কাহিনী প্রকাশিত হতেই একে একে দুর্নীতিবাজদের চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে জাতির সামনে। দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের ফিরিস্তি এখন গণমাধ্যমের প্রধান খাদ্য। প্রতিদিন গণমাধ্যমে কোন না কোন দুর্নীতিবাজের রত্নভান্ডারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে ড্রাইভার পর্যন্ত শতকোটি টাকার মালিক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খোবলা করে দিয়েছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিপুল বিত্তের খবর প্রকাশ হওয়ার পরও তার আইনের আওতায় না আসা, তিনি দেশে আছেন না বিদেশে পালিয়ে গেছেন তা নিয়ে রীতিমতো চলছে লুকোচুরি। ছোট-মাঝারিসহ সব সরকারি কর্মকর্তাদের বিভৎস দুর্নীতির খবরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেন, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যাথা, মলম দিবো কোথায়’। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতটুকু আন্তরিক, এই যুদ্ধে সরকার শেষ পর্যন্ত কিভাবে জয়ী হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সামনের দিনগুলোতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যদি সরকার নির্মোহ, শক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারে তাহলে সরকারের জন্য সেটি হবে একটি বড় ধরনের সংকট। এই সংকটে মোকাবেলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেখতে চায়, সাধারণ মানুষ চায় দুর্নীতিবাজরা আইনের আওতায় আসুক। কিন্তু সেটি যদি সরকার করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে। সরকারকে বিশ্বাস করবে না জনগণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকারকে হঠাৎ করেই চাপে ফেলেছে। যদিও এবিষয়ে সরকারের কিছু করণীয় নেই। এটা স্পষ্ট যে, এর পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। এর আগেও ২০১৮ সালে কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছিলো শিক্ষার্থীরা। কোটার সেই আন্দোলনের ফলে সরকার প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকাররা আদালতে রিট পিটিশন করে এবং এর মাধ্যমে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল অবৈধ। ফলে ঐ পরিপত্রটি অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর এখন শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন করছে। তাদের বক্তব্য আংশিক যৌক্তিক, কিছুটা অযৌক্তিক। তাদের বক্তব্যের যৌক্তিক অংশটুকু হলো কোটা সংস্কার করা উচিত। বাংলাদেশে এখন এমন কিছু কোটা রয়েছে যেগুলো শুধু অযৌক্তিক নয়, অনভিপ্রেতও বটে। আবার এমন কিছু কোটা আছে যেগুলো থাকা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যেমন, নারী কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কোটা। এই কোটাগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। একটি সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অংশ তা পূরণের জন্যই কিছু কিছু কোটা রাখা অবশ্যই উচিত। তবে কিছু কোটা রয়েছে, যেগুলো থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের খারাপ দিকগুলো হলো, আন্দোলনকারীরা বেশি মনোযোগী হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। এই কোটা সংস্কার আন্দোলনে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। 

কোটা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ২০১৮ সালে যখন কোটা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো তখন এই আন্দোলনের নীল নকশা প্রণয়ন করেছিলো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্র শিবির। এবারও কোটা আন্দোলনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, প্রতিবছরই তিন থেকে পাঁচ হাজার চাকরিপ্রত্যাশিদের জন্য সরকারি চাকরিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করেন। সরকারি চাকরির জন্য সবাইকে কেন আগ্রহী হতে হবে? বিসিএস কি একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য? একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে বিজ্ঞানী হবেন, চিকিৎসক হবেন, গবেষক হবেন, সাংবাদিক হবেন কিংবা অন্যকোন সৃজনশীল পেশা বেছে নেবেন। তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন, বাংলাদেশকে বিনির্মাণের জন্য নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করবেন। কিন্তু এসব না করে সবাই এখন সরকারি চাকরিতে আগ্রহী হচ্ছেন এটি বাংলাদেশের জন্য উৎকণ্ঠার বিষয় বলে আমি মনে করি। কিন্তু কোটা আন্দোলনের রাজনৈতিক কূটকৌশলে সরকার রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পরেছে। ছাত্র শিবির করুক বা বিএনপিই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন কোটা আন্দোলনের ডাল পালা মেলছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এরকম আন্দোলন থেকে যেকোন ধরনের বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে হবে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। এখানে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

কোটা আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়েও এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা প্রচলিত পেনশন স্কিমের বদলে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমের আওতায় এসেছেন। জাতীয় পেনশন স্কিম সরকার প্রবর্তন করেছিলো। সরকার আশা করেছিলো, এই পেনশন স্কিম অত্যন্ত সফল হবে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী বা ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সেক্টর, কর্পোরেশন এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ জুলাই থেকে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। আমলারা অন্য সব পেশার মানুষকে যেন রীতিমতো খেপিয়ে তোলার প্রকল্প নিয়েছে এই পেনশন স্কিমের মাধ্যমে। অদুর ভবিষ্যতে এই পেনশন স্কিম সরকারকে ভোগাবে। 

আওয়ামী লীগের চতুর্থ মেয়াদে দেখা যাচ্ছে সব ক্ষেত্রে চাটুকার মতলববাজ সুবিধাবাদীদের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ক্ষমতার সব মধু খেয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার একটি উদহারণ। চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ শিক্ষকদের সিন্ডিকেট যোগ্যতা ও মেধাকে গিলে খাচ্ছে ক্রমশ:। এই ৬ মাসে সরকারের জন্য স্বস্তির খবর খুবই কম। সামনের দিনগুলো সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার বার্তা দিচ্ছে। সরকার আগামী দিনগুলোতে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে আমি মনে করি, সরকারকে সমস্যার সংকটগুলোর গভীরে যেতে হবে, সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সবকিছুকে উপেক্ষা করা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সর্বনাশ ডেকে আনে। অতীত ইতিহাস সেকথাই বলে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নীরব কেন?

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

কোটা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কথা বলেছেন। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা বলছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল। এবং সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে চমৎকার ভাবে সার্বিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও কোটা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের বিষয়টি শুধু সরকারের বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। এতে একটি রাজনীতিকরণ ঘটেছে। এবং এই রাজনীতিকরণের ফলে এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। 

কোটা সংস্কার নিয়ে এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরকে নীরব দেখা যাচ্ছে। হেভিওয়েট নেতারা কোটা আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনও কথা বলছেন না। 

আওয়ামী লীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলেন আমির হোসেন আমু। আমির হোসেন আমু এখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে মুখ খোলেননি। তাকে কোনও কথাও বলতে দেখা যায়নি। অথচ একটা সময় ছাত্রলীগের মধ্যে তার বিপুল প্রভাব ছিল। জাতীয় পর্যায়ে তার একটা পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। কোটা আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আরেক হেভিওয়েট নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরীকেও। মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকেও এখন পর্যন্ত কোটা আন্দোলন নিয়ে কোনও কথা বলতে দেখা যায়নি। কথা বলেননি আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোফায়েল আহমেদও। তবে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। এমনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাই তার বিষয়টি হয়তো সহানুভূতির সঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদেরকেও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কোটা সংস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত কথা বলেননি। অথচ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কোনও রকম কথা বলতে দেখা যাচ্ছেনা। কথা বলছেন না আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও। তবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাছিম কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সরব রয়েছেন। বিভিন্ন ফোরামে তিনি কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, ছাত্রলীগ যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তেমনি যুবলীগ সহ অন্যান্য সংগঠনগুলোরও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলা উচিত। কোটা নিয়ে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করছে সেই বিভ্রান্ত দূর করার জন্য জনপ্রিয় নেতাদের কথা বলা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যাদেরকে পছন্দ করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পরিচিত তাদের এ নিয়ে প্রকৃত তথ্য শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে।


কোটা আন্দোলন   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাসে আলোচিত ৬ মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৫:০২ পিএম, ১০ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার তার ৬ মাস পূর্ণ করেছে আজ। এই ৬ মাসে সরকারকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারী নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও ৭ জন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু এই ৬ মাসে সব মন্ত্রী একই সুরে এগোতে পারেননি। সব মন্ত্রীর সাফল্য ইতিবাচক নয়। যদিও ৬ মাস সময় একজন মন্ত্রী বা সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু সকালের সূর্য সারা দিনের আভাস দেয়। সেই বিবেচনায় ৬ মাসে যে সমস্ত মন্ত্রীরা স্ব-প্রতিভ, আলোচিত এবং উজ্জ্বল ছিলেন তাদেরকে নিয়েই এই প্রতিবেদন। 

এই ৬ মাসে আলোচিত এবং দৃশ্যমান মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-

১. ওবায়দুল কাদের: 

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল হয়েছে। এটি তার অসাধারণ সাফল্য। তবে বর্তমান ৬ মাস মেয়াদে সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরিসমাপ্তি অনুষ্ঠান হয়েছে সফলভাবে। ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসময় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরব ছিলেন। এই ৬ মাসে সবচেয়ে সরব মন্ত্রী হিসেবে উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের। 

২. ড. হাসান মাহমুদ: 

ড. হাসান মাহমুদ তথ্যমন্ত্রী থেকে এ মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশে ভারসাম্যের কূটনীতির ধারা অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সমাদৃত হয়েছে। তাছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন করছেন হাসান মাহমুদ। ভারতের নির্বাচনে পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করছেন। এসমস্ত অর্জনের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এক্ষেত্রে ড. হাসান মাহমুদকে অত্যন্ত স্ব-প্রতিভ এবং উজ্জ্বল দেখা গেছে। 

৩. ডা. সামন্ত লাল সেন

১১ জানুয়ারীর মন্ত্রীসভায় সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে কেমন দায়িত্ব পালন করবেন  তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা রকম কৌতূহল ছিলো। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে প্রথম ৬ মাসে উজ্জ্বল ছিলেন সামন্ত লাল। তার সততা, নিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সর্বমহলে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন অনিয়ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন তিনি। তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রোকেয়া সুলতানা। সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খোল-নলচে পাল্টে গেছে প্রথম ৬ মাসে। 

৪. আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। প্রথমবারের মতো তিনি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। এবার মৎস্য এবং প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। এ দায়িত্ব গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সাধু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। রমজানের সময় ন্যায্য মূল্যে মাংস, দুধ, ডিম বিতরণ করার ক্ষেত্রে তার অবদান প্রশংসিত হয়েছে। এবার কোরবানি ঈদে দেশিয় প্রাণী দিয়ে কোরবানির উদ্যোগে কোনরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে আব্দুর রহমান প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ মন্ত্রীত্বেও দক্ষতা দেখাতে সক্ষম। 

৫. জাহাঙ্গীর কবির নানক 

জাহাঙ্গীর কবির নানক এবার দ্বিতীয় বারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। বস্ত্র এবং পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। যদিও এই মন্ত্রণালয়টিকে অনেকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবুও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি তার মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে এ মন্ত্রণালয়কে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করছেন। বিশেষ করে পাটের সোনালী যুগ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি মেধাসত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে তার তড়িৎ পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাটের বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্র সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। 

৬. মহিবুল হাসান চৌধুরী

মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী থেকে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে পাবলিক পরীক্ষাগুলো এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে পাঠ্য বইসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার মেধা দীপ্ত উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।  


সরকারের ৬ মাস   মন্ত্রী  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কর্তারা করেন দুর্নীতি, দোষ হয় রাজনীতির

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৮ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

দুর্নীতি নিয়ে দেশে এখন তোলপাড় চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি। সে যে- হোক, দুর্নীতি করলে কারও রক্ষা নেই। যারাই দুর্নীতি করবে, তাদেরই আমরা ধরব।প্রধানমন্ত্রীর এই অনুশাসনের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, দুর্নীতির ক্ষেত্রে অতীতের সংস্কৃতি থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বেরিয়ে আসতে চাইছে। অতীতেও আমরা লক্ষ করেছি, বড় দুর্নীতি হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। সরকারের মদদে। সব সরকারের আমলেই সরকারের ছত্রছায়ায় কিছু ব্যক্তি ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠেছিলেন। রাষ্ট্র তাদের সহযোগিতা করেছে। কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি কিংবা বিচারও হয়নি। একটি অস্বীকার করার সংস্কৃতিকে লালন করা হয়েছে। কিন্তু এবার সরকারের ভেতর যারা প্রভাবশালী, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, সরকারের সঙ্গে যাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা সবাই জানত। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার বিষয়টি অস্বীকার করেনি। ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হবে কি হবে না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি জাগরণের সূচনা হয়েছে কথা নিঃসংকোচ বলা যায়। অন্য দুর্নীতিবাজ যারা সরকারের প্রভাব বলয়ে থেকে, সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে দুর্নীতি করার সাহস পেতেন তারা কিছুটা হলেও দমে গেছেন। বেনজীর আহমেদকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হবে, তার সম্পত্তি জব্দ হবে এরকম স্বপ্নেও হয়তো তিনি ভাবেননি। ভাবেননি এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানও। কিন্তু সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকার পরও তারা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। সামনের দিনগুলোতে ধারায় আরও যারা স্বীকৃত দুর্নীতিবাজ আছেন তারাও আইনের আওতায় আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। দুর্নীতি নিয়ে এই চর্চার মধ্যই কে বেশি দুর্নীতিবাজ তা নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। সরকারি চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী না সুশীল সমাজ, কারা বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত? এই প্রশ্ন এখন সবার। নিয়ে নানাজনের নানা মত। আপাতত সাধারণ মানুষের চোখে সরকারি কর্মকর্তারাই শীর্ষস্থান দখল করে আছেন। ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হলেও তারা এক ধরনের দায়মুক্তি পাচ্ছেন। দুর্নীতিতে তারাভিকটিমহিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে ব্যবসা চালাতে তারা রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্তাদের ঘুষ দেন। এটা যেন অন্যায় নয়, তাদের অসহায়ত্বের প্রকাশ। ঘুষ দিয়ে ব্যাংক ঋণ নিতে হয় ফলে ঋণখেলাপি হন। ঘুষের জন্যই অর্থ পাচার করেন। ব্যবসায়ীরা দুর্নীতিতে দাতা পক্ষ, গ্রহীতা পক্ষ নন। সুশীল সমাজের দুর্নীতি শ্বেত শুভ্র। দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। . ইউনূসের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তিনি নিজেকেধোয়া তুলসী পাতাপ্রমাণে মরিয়া। অর্থ পাচার, অর্থ নয়ছয়ের সব অভিযোগকেই তিনি অসত্য বলে রীতিমতো বিক্ষোভ করেছেন। এভাবে সুশীলরা সুশাসন আর উন্নয়নের নামে লুণ্ঠনের দোকান খোলেন। যেগুলো নিয়ে কথা বললেই হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ। দুর্নীতি কোথায় নেই? কোন পেশা দুর্নীতিমুক্ত?

দুর্নীতি নিয়ে আলোচনার একটি বিষয় নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। দুর্নীতিবাজদের কথা যখন বলা হচ্ছে তখন রাজনীতিবিদদের দিকেই তীর ছোড়া হচ্ছে। রাজনীতিকে দূষিত কলঙ্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে। দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতির যোগসাজশ আবিষ্কারের এক প্রাণান্ত চেষ্টা লক্ষণীয়। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, দুর্নীতির ভয়াবহ দূষণের জন্য রাজনীতিই দায়ী।

রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির যে ঘটনাগুলো আমরা দেখি, সেটি এখন সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির চেয়ে কমই শুধু নয়, তুচ্ছও বটে। কিন্তু তার পরও সব দুর্নীতির পেছনে রাজনীতির সম্পর্ক কেন খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অনেক গভীরে যেতে হবে। বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের কলঙ্কিত করার একটি নীরব প্রচেষ্টা সবসময় ছিল। সবসময় সুশীল জনগোষ্ঠী, বুদ্ধিজীবী এবং সরকারি আমলারা রাজনীতিবিদদের মূর্খ, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণের জন্য একটি সংঘবদ্ধ মিশনে ছিলেন, আছেন। যে কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি রাজনীতিবিদ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিবিদ মাত্রই খারাপ, এমন একটি প্রচারণা চলে সারাক্ষণ। এর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে রাজনীতিমুক্ত করা। বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা। এতে বেশি লাভবান হবেন সুশীল এবং আমলারা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যদি ব্যাহত হয়, তাহলে বাংলাদেশে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা গ্রহণ সম্ভব হবে। ক্ষমতালোভী সুশীলরা সিংহাসনে বসে তাদের ইচ্ছামতো লুণ্ঠন করতে পারবেন। আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ-এর ঘোষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা দখল করা। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ শাসকদের সেবাদাস হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের কিছু সুশীল।

আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৭৫-পরবর্তী সময়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তির বিরোধ সমান্তরালভাবে চলছে। এই বিরোধ সবসময় দৃশ্যমান। জিয়াউর রহমান রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি যেসব স্তাবক এবং চাটুকারকে নিয়ে দল গঠন করেছেন, তাদের মধ্যেও সত্যিকারের রাজনীতিবিদ ছিলেন কম। যারা রাজনীতিবিদ হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তারা ছিলেন পরিত্যক্ত উদ্বাস্তু এবং রাজনীতিতে উৎকট আবর্জনা, নীতিভ্রষ্ট সুবিধাবাদী। এসব আবর্জনাকে নিয়ে জিয়াউর রহমান একটি রাজনৈতিক ক্লাব খুলেছিলেন, যার নামবিএনপি এই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক আমলা, উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী এবং কিছু পতিত রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটা খিচুড়ি করা, যা দিয়ে সৎ, আদর্শের রাজনীতিকে ধ্বংস করা যায়। জিয়া নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করব।এরশাদও একই ধারাই বাংলাদেশের রাজনীতিকে হাস্যকর করার চেষ্টা করেছিলেন। এরশাদ রাজনীতিতে কিছু ঝাড়ুদার, চাটুকার ক্লাউনও যোগ করেন। এভাবেই রাজনীতিকে দূষিত হয়েছে অগণতান্ত্রিক ধারায়। দুর্নীতির বিস্তার ঘটে এদের হাত ধরেই।

অবৈধ শাসক জিয়া যেমন রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণের চেষ্টা করেন। তেমনি ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য, অশিক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করেন। আবার এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক ধারা সূচনা হয়, তা নষ্ট করার জন্য সুশীলদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা চালু হয়। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি ছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্র। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিবিদরা অযোগ্য, রাজনীতিবিদরা একটি নির্বাচন করতে অক্ষম এরকম একটি ধারণাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল তার মূল লক্ষ্য ছিল সুশীলদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করা। ক্ষমতায় সুশীলদের হিস্যা নিশ্চিত করতেই ব্যবস্থা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ থাকত তিন মাস। সুশীল এবং বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সুশীল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। আর এটি করার জন্যই রাজনীতিবিদদের বিরোধ উসকে দিয়ে ২০০৭ সালে আনা হয় অনির্বাচিত সরকার। তারা রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করে। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা করে। এক-এগারোর সরকারের সময় আমরা দেখি রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়। তাদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণের জন্য শুরু হয় নানারকম তৎপরতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু প্রতিষ্ঠা করা গেছে? রাজনীতিবিদরা কত টাকা দুর্নীতি করেছেন? রাজনীতিবিদরা দেশের বারোটা বাজিয়েছেন বলে যেসব গালভরা খবর সে সময় করা হয়েছিল, তার কতটুকু সত্যতা পাওয়া গেছে নিয়ে ভালো গবেষণা হতে পারে।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ, চোর, দুর্বৃত্ত বানিয়ে তাদের চাঁদাবাজ হিসেবে প্রমাণ করে এক-এগারোর সরকার নিজেরাই দুর্নীতির এক মহোৎসব শুরু করেছিল। দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল এক-এগারোর সরকার। মূলত এক-এগারোর সময় একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা হলো আমাদের সুশীলদের চেয়ে রাজনীতিবিদরা অনেক সৎ। সুশীলরা সুযোগ পেলে যে কী ভয়ংকর দুর্বৃত্ত দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠতে পারেনতার প্রমাণ এক-এগারো।

এক-এগারোর পর বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। সুশীলদের আক্ষেপ হতাশা এবং নানা অপপ্রচারের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। সময় আমলাতন্ত্র সুশীলদের বিকল্প হয়ে সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলতা সুযোগ নিয়ে আমলারা দারোয়ান থেকে গৃহকর্তা হয়ে যাওয়ার কসরত করছেন। গণতান্ত্রিক সরকারকে নানাভাবে বশীভূত করে আমলারা আসলে ক্ষমতাকেন্দ্র প্রায় দখলের চেষ্টা করেছেন। প্রবণতাটি ভয়ংকর আকার ধারণ করে কভিডের সময়। সে সময় রাজনীতিবিদদের ঘরে তুলে আমলারা দেশে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে যান। বিভিন্ন জেলায় আমলাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকরা সংসদ সদস্যদের ওপর খবরদারি শুরু করেন। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন জনগণের প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানরা। আমলাতন্ত্রের এই সর্বগ্রাসী থাবার ফলে দেশে রাজনীতি কোণঠাসা হয়ে যায়। বিরোধী দলহীন সংসদ, গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে সরকার পুরোপুরি আমলানির্ভর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল মূলত রাজনৈতিক দলের অবয়বে একটি আমলাতান্ত্রিক সরকার। এই ভূতুড়ে ব্যবস্থার কারণেই বেনজীর-মতির সৃষ্টি। সময় যেসব আমলা ক্ষমতাবান হয়েছিলেন তাদের লুণ্ঠনের তদন্ত হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। তাদের দুর্নীতির যদি নির্মোহ তদন্ত হয় তাহলে দেখা যাবে যে, দুর্নীতিতে তারা সুশীলদেরও হারিয়ে দিয়েছেন।

২০২৪ সালে টানা চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা এলাকার কর্তৃত্ব গ্রহণ করছেন। বেনজীর-মতি বা যেসব সরকারি কর্মকর্তাদের হাঁড়ির খবর বেরিয়ে আসছে, আমি তাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখি না। এটি আমলাতন্ত্রের ক্ষত। এর মাধ্যমে একটি জিনিস প্রমাণিত হয়েছে, সুশীলরা যেমন ক্ষমতা পেলেই দুর্নীতিবাজ হয়, আমলারাও ক্ষমতা পেলে হয় দুর্বিনীত। সরকারের ভেতর এরকম অনেক বেনজীর-মতি রয়ে গেছেন। প্রয়োজন হলো তদন্ত করে তাদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা। রাজনীতিবিদরা শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমী। শেষ পর্যন্ত তাদের জনগণের কাছে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের জবাবদিহি করতে হয়, তা যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন। তাই একজন দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদও জনগণের জন্য কাজ করেন। সম্পদের একটি অংশ জনগণের মধ্যে বণ্টন করেন। এর মানে এই নয় যে, রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিকে আমি সমর্থন করছি কিন্তু রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির ছিটেফোঁটাও তার কর্মী-সমর্থকরা পায়।

অন্যদিকে আমলা বা সুশীলদের দুর্নীতির টাকা চলে যায় বিদেশে। তাই ঘটনাগুলোই একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতিবিদদের চালকের আসনে বসতে হবে। ক্ষমতার সবটুকু রাজনীতিবিদদের দিতে হবে। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি করলে জনগণ তার বিচার করবে। রাজনীতিবিদদের জেলে যাওয়ার নজির অনেক। এই দেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। শত শত মন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে জেল খেটেছেন। কজন সচিব, কজন সরকারি কর্মকর্তা জেল খেটেছেন? কজন সুশীল দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন? আমলা বা সরকারি কর্তারা দুর্নীতি করলে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন। সুশীলরা দুর্নীতি করে বিদেশে ঠিকানা করেন। দুর্নীতি মুক্তির যুদ্ধে রাজনীতিবিদদেরই সামনে আনতে হবে। আমলাতন্ত্র সুশীলমুক্ত আদর্শবাদী রাজনীতি দুর্নীতি প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com

 


দুর্নীতি  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কার ‘পুতুল’ বেগম জিয়া

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ০৫ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বেগম জিয়ার ডাক নাম ‘পুতুল’। একসময় আপোষহীন নেত্রীর খেতাব পাওয়া এই রাজনীতিবিদ এখন নিজেই যেন ‘পুতুল’ হয়ে গেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। সপ্তাহ জুড়ে বিএনপির বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী ছিলো। শনিবার ঢাকায় সমাবেশ করেছে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। পহেলা জুলাই মহানগরগুলোতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। আর ৩ জুলাই জেলায় জেলায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসমস্ত সমাবেশ কতটা আন্তরিক বা কতটা আত্মরক্ষার কৌশল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বেগম জিয়া কি বিএনপির আন্দোলনের একমাত্র অস্ত্র? এই আন্দোলন করে কি বেগম জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব?

৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি এখন দিশেহারা। ক্ষত-বিক্ষত এবং আত্মবিশ্বাসহীন একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। নিজেদের ভুল তারা বুঝতে পারছে কিন্তু স্বীকার করছে না। দলটির ভেতর চলছে অন্তঃকলহ।  দলের মধ্যে নেই কোন সমন্বয়। সবকিছু হচ্ছে স্বৈরাচারী কায়দায়। এর মধ্যেই হঠাৎ করেই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন কেন সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিএনপি মনে করছে এটাই তাদের আত্মরক্ষার সহজ পথ, দল গোছানোর সুযোগ। বেগম জিয়া অসুস্থ। তিনি হাসপাতালে। তার অসুস্থতা নিয়ে জনগণের আবেগকে উস্কে দিতে চায় বিএনপি। আর একারণেই খালেদা জিয়াকে তারা পুতুল হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া আসলে বিএনপির পুতুল নাকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাকে ব্যবহার করছে?

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বেগম জিয়াকে গত ১৫ বছরে রাজনীতিতে ‘এতিম’ করেছে। বিশেষ অনুকম্পায় মুক্তি দিয়ে করুণাপাত্রে পরিণত করেছে। সরকার তার হাতের মুঠোয় খালদাকে নিয়ে বিএনপিকে চাপে রাখছে। সরকারের করুণায় তার মুক্ত জীবন। আওয়ামী লীগ চাইলেই এখন কারাগারে পাঠিয়ে দিতে পারে বিএনপি’র নামমাত্র চেয়ারপার্সনকে। বেগম জিয়া যেন এক অর্থে আওয়ামী লীগের ‘পুতুল’।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিলো হঠাৎ করেই। তিনি রাজনীতিতে এলাম, দেখলাম, জয় করলাম এর মতো করেই সবকিছু পেয়ে গেছেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আপোষহীন নেতার মর্যাদা পান বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, কোনরকম অতীত অভিজ্ঞতাহীন একজন গৃহবধূর রাজনীতিতে আসার প্রধান কারণ ছিলো জিয়ার ইমেজকে ব্যবহার করা। রাজনীতিতে এসে বেগম খালেদা জিয়া তার সীমাবদ্ধতাগুলো ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একারনেই তিনি ‘পুতুল’ হিসেবেই রাজনীতিতে ছিলেন। কখনো পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের  পরামর্শে, কখনো দলের সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে, এভাবেই রাজনীতিতে মৌণব্রত পালন করে তিনি ক্রমশ শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। মূলত আওয়ামী লীগ বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এবং ভোট ব্যাংকই ছিলো খালেদার সম্পদ। তারাই বেগম খালেদা জিয়াকে নেতা বানিয়েছেন। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই বেগম খালেদা জিয়া সবকিছু করেছেন। চিরকালই বেগম জিয়া ‘পুতুল’ই ছিলেন।

পাকিস্তান পন্থী ৭১ এর যুদ্ধাপরাধী এবং ৭৫ এর খুনীরাই বেগম খালেদা জিয়াকে নেতার আসনে আসীন করেছিলেন। আর একারণে বেগম জিয়া সবসময় স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এবং ৭৫ এর খুনীদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি দেখিয়েছেন। তাদেরকে ছাড় দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার সামনে গণতান্ত্রিক নেতা হওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিলো। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি নিজেই কাজে লাগাননি।

একসময় বেগম খালেদা জিয়াকে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হতো। কেউ কেউ এটাও প্রমাণের চেষ্টা করতেন বেগম খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার চেয়ে জনপ্রিয়। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী, বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিরোধী, যারা ৭৫’র ষড়যন্ত্রের অংশীদার তারা সবসময় বেগম খালেদা জিয়াকে লাইম লাইটে আনার চেষ্টা করতেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে চিরস্থায়ী করতে পারে নি তারা। কারণ বেগম খালেদা জিয়া নিজের আলোয় আলোকিত ছিলেন না। নিজের মেধায় রাজনীতিতে বিকশিত হননি। রাজনীতিতে প্রজ্ঞাহীনতাই তাকে পরিত্যক্ত করেছে।

৮৬’র নির্বাচনে বেগম জিয়াকে পরামর্শ দেয়া হয় তিনি যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকেন। আর একারণে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও বেগম খালেদা জিয়া পাকিস্তান পন্থীদের পরামর্শে নির্বাচন থেকে সরে আসেন। ঐ নির্বাচনে না যাওয়াটাই বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সাপে বর হয়েছে। ৯১ সালের নির্বাচনে একারণেই বিজয়ী হয়েছেন বলে অনেকেই মনে করেন। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯১ এর নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির বিজয়ের প্রধান কারণ ছিলো দেশি-বিদেশি চক্রান্ত। আওয়ামী লীগকে তারা ভয় পেত। আওয়ামী লীগের উপর আস্থা রাখতে পারেনি। আর একারনেই একজন ‘পুতুল’ প্রধানমন্ত্রীকে তারা পছন্দের তালিকায় রেখেছিল। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সেই সব কাজই করেছেন যা তার প্রভুরা চেয়েছে। আর আর একারণেই তিনি ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ’ বাতিল করেননি, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেন নি, ৭৫ এর খুনীদের কূটনৈতিক চাকরি থেকে অপসারণ করেননি।  ১৯৯৬ সালে তিনি তীব্র গণআন্দোলনের মুখে তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। তখন তার ‘আপোষহীন’ তকমাটা খসে পড়েছিল। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া এবং পাকিস্তানপন্থী স্তাবকরা বেগম খালেদা জিয়াকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা থেকে সরে যাননি।

৯৬ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী দলে যায় বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়া হন বিরোধী দলের নেতা। কিন্তু বিরোধী দলের নেতা হয়ে তিনি শুধু সময়ের অপচয় করেছেন রাজনীতির পরিপক্কতা বা বিচক্ষণতার প্রমাণ রাখতে পারেননি। ২০০১ সালে আবার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই বেগম খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় আনা হয়। এবার তার উত্থানের পিছনে জামায়াতের অবদান আড়ালে ছিলো না। পুতুল নাচে যে পুতুলটি নাচে তার সুতোটা দেখা যায় না। কিন্তু ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের পিছনে যে সুতো ছিলো তা সকলের কাছেই দৃশ্যমান হয়। এসময় বেগম খালেদা জিয়া দুই সুঁতোয় নাচতেন। একটি সুঁতো ছিলো আইএসআইয়ের হাতে, অন্যটি তারেক জিয়ার কাছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘হাওয়া ভবনের’ উত্থান ঘটে। বেগম খালেদা জিয়া হন নামমাত্র প্রধানমন্ত্রী। হাওয়া ভবন থেকেই পরিচালিত হতো রাষ্ট্র। দু’টি সমান্তরাল সরকার দেশ শাসন করতো। এই শাসনামলে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ শে আগস্ট গ্রেণেড হামলার মতো অনেক নজীর বিহীন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। বেগম খালেদা জিয়া পুত্র স্নেহে অন্ধ থেকে এসমস্ত ঘটনার দায় নিজের কাঁেধ নিয়েছেন, এসব অপকর্মে সহযোগিতা করেছেন। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি, একজন অন্ধ মা হতে পেরেছেন মাত্র। পুত্রের কাছে দেশকে বিসর্জন দিয়েছেন।

২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঘটনা তাতেই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের পতনের সূচনা হয়েছিলো বলে আমি মনে করি। তিনি যে দেশ শাসনের জন্য অযোগ্য, অক্ষম এবং অদূরদর্শী এটি প্রমাণিত হয়েছে এসময়। আর বেগম খালেদা জিয়ার এই অপরিণামদর্শী নেতৃত্বের কারণেই ২০০৭ সালে এক-এগারো আসে। গণতন্ত্র নির্বাসনে যায়।

মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু ঘটে বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের আমলেই। এই সময় সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয় যাতে সাবেক বিএনপি নেতা বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হতে পারেন। এ ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর সারাদেশ আন্দোলনে ফুঁসে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। এরপর ড. ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের মতো একজন স্তাবক, মেরুদন্ডহীন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়। যিনি হাওয়া ভবনের নির্দেশ ছাড়া কিছুই করতেন না। আর এরকম নীতিহীন, ব্যক্তিত্বহীন রাষ্ট্রপতি এবং তত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পক্ষপাতের কারণেই অনিবার্যভাবে এক এগারো এসেছে। ড. ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বেগম জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দলের থেকে তাকে মাইনাস করার চেষ্টা করা হয়।বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়ের আসল সমাপ্তি ঘটেছিলো এক এগারের মাধ্যমেই।

২০০৮ এর নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার দল শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। এসময় পাকিস্তানি প্রভুরা বেগম জিয়াকে ছুঁড়ে ফেলে। নিজেরাই সমস্যা আক্রান্ত হয়ে তারা বাংলাদেশে আগ্রহ হারায়। ফলে রাজনীতিতে দিশাহীন হয়ে পরেন বেগম জিয়া। নিতে থাকেন একের পর পর এক ভুল সিদ্ধান্ত। বেগম খালেদা জিয়া কি নিজের রাজনৈতিক বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? বেগম জিয়া কি তার নিজস্ব বুদ্ধি প্রয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নিন্দা জানিয়েছিলেন? বেগম খালেদা জিয়া কি নিজস্ব প্রজ্ঞায় ২০১৫ সালে লাগাতার অবরোধের ডাক দিয়ে গুলশানে তার কার্যালয়ে অবস্থান করেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর- না। বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে এসব করানো হয়েছিলো। কারণ তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও যোগ্যতা নাই। সব সিদ্ধান্ত ছিলো তারেক জিয়ার । আর তারেক জিয়ার এই অপরিপক্ক, ভ্রান্ত, উদ্ভট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। এমনকি ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া মামলার রায় হবার আগে লন্ডনে গিয়েছিলেন পুত্রের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সেসময় তিনি যদি লন্ডনেই থাকতেন তাহলে রায়ের ফলাফল যাইহোক না কেন তাকে অন্তত কারাগারে যেতে হতো না। । কিন্তু তারেক জিয়া তাকে ‘পুতুল’ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। আরো নির্দিষ্ট করলে বলা যায়, তারেক জিয়ার গিনিপিগ হিসেবেই তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন মামলার রায়ের আগে। বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারের পরেই তারেক জিয়া বিএনপি দখল করেন। বিএনপির রত্ন ভান্ডারের চাবি চলে যায় তার কাছে। এখান থেকে চাঁদাবাজি, কমিটি বাণিজ্য, মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে অগাধ সম্পদের মালিক হবার স্বর্ণদ্বার খুলে যায় তারেক জিয়ার সামনে। আর একারনেই তিনি নিজের মাকে জিম্মী করেন। এখন যখন বেগম জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর দাবি করা হয়, তখন প্রশ্ন আসে, ২০১৮ সালে কেন তাকে লন্ডন থেকে দেশে আনা হলো?

বেগম জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার মুক্তির জন্য বিএনপি কি করেছে? বিএনপির নেতারা বলেছিলো যে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে। কিন্তু আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারেনি। বেগম খালেদা জিয়ার আইনি লড়াইও থমকে রয়েছে। বিএনপির বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে বিএনপি কতটা আন্তরিক সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তার জামিনের জন্য আদালতে যাচ্ছে না কেন আইনজীবীরা? বেগম জিয়ার এই পরিণতির জন্য কে কতটুকু দায়ী, তা নির্মোহভাবে হিসেব করতে হবে। সরকার ২০২০ সালের মার্চে তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় জামিন দিয়ে উদারতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে বিদেশ পাঠানোর জন্য প্রয়োজন আইনী লড়াই করা। সে লড়াইয়ে বিএনপি কেন দ্বিধাম্বিত?

বেগম জিয়া আসলে তারেক জিয়ার পুতুলে পরিণত হয়েছেন। তারেক জিয়ার রাজনৈতিক আকাঙ্খা পূরণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যবহার করে বিএনপি একদিকে যেমন তার হতাশা কাটাতে চাচ্ছে অন্যদিকে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইছে। আবার বেগম খালেদা জিয়ার যদি কিছু হয় তাহলে সবচেয়ে লাভবান হবে তারেক জিয়া। একদিকে বিএনপির চেয়ারপার্সন হওয়াটা তার জন্য চিরস্থায়ী হবে। অন্যদিকে এই ইস্যুতে বিএনপিকে হয়তো কিছুদিন সচল রাখতে পারবেন। কিন্তু মাকে পণ বানিয়ে কিংবা কূটচাল ব্যবহার করে রাজনীতিতে সাময়িকভাবে জয়ী হওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অর্জন থাকে শূণ্য। রাজনীতিতে নিজস্ব প্রজ্ঞায় আলোকিত না হলে ‘পুতুল’ হয়েই থাকতে হয়।

 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


শনিবারের কলাম  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন