ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সিটি নির্বাচনগুলোতে হারছে কেন বিএনপি?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০১৮ বুধবার, ০৬:০২ পিএম
সিটি নির্বাচনগুলোতে হারছে কেন বিএনপি?

পাঁচ বছর আগের কথা। ২০১৩ সাল। এক এক করে কয়েকটি সিটি নির্বাচন হলো, যার সবগুলোতেই জিতল বিএনপি। ওই সময় ক্ষমতার ঘ্রাণ পেয়েছিল তারা। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করল বিএনপি। এর পর কেটে গেছে পাঁচটি বছর। সম্প্রতি দুই সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন দুটি নির্বাচনেই বিপুল ব্যবধানে ধরাশায়ী বিএনপি। নির্বাচন নিয়ে দলটি অনেক কথাই বলছে। কারচুপি, কেন্দ্র দখল সহ কত অভিযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের গতানুগতিক যেমন নির্বাচন তেমন নির্বাচনই হলো। বরং মাগুরা, ঢাকা ১০ নির্বচনের মতো ব্যাপক কারচুপিতে অভিযুক্ত নির্বাচনের চেয়ে দুই সিটি নির্বাচন বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ভাবেই হয়েছে। আর দেশও এখন অনেক বদলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মিডিয়া অনেক বেশি কাভারেজে। সবাই দেখছে কীভাবে নির্বাচন হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকরাও দেখেছে নির্বাচন কেমন হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি কেন সিটি নির্বাচনগুলোতে হারছে। পাঁচ বছরে কী পরিবর্তন হলো যে জনগণ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। সাদা চোখে দেখলে, মনে হবে, বিএনপির তো আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি জনগণের সহানুভূতি পাওয়া উচিত। দলটির চেয়ারপারসন কারান্তরীণ হয়ে আছেন চার মাসের বেশি হলো। দলটি শক্তিশালী কোনো আন্দোলন গড়ে তাদের চেয়ারপারসনকে মুক্তি করতে পারেনি। কিন্তু জনগণের সহানুভূতির বদলে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে কেন বিএনপি।

বিএনপির ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বিএনপির ভরাডুবির জন্য পাঁচটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন।

১. বিএনপিতে একটি নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তার, লন্ডনে পলাতক বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি এখনো। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব হিসেবেই আসলে এখন বিএনপি চালাচ্ছেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো মির্জা ফখরুল একদিনের জন্যও কিন্তু গাজীপুর যাননি। বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় থেকে গাজীপুর সর্বোচ্চ ঘণ্টা দেড়েকের দূরত্ব। অথচ দলের মহাসচিব হয়েও দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন নির্বচনে দলের পক্ষে প্রচারণায় যাননি দলের বর্তমান নিয়ন্ত্রক। একটি দলের একজন সর্বময় ক্ষমতার নেতা থাকবেন, যাঁর নির্দেশনা এবং প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভূমিকাতেই দলের কার্যক্রম চলবে। এমনটি বিএনপিতে এখন অনুপস্থিত।

২. ২০০৬ সাল থেকেই বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় না থাকার কারণে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। দিন দিন বিএনপির কর্মীদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমছে। মানসিক বিপর্যয়ও দেখা যাচ্ছে কারও কারও। দলের জন্য তাঁদের ‘ডেডিকেশনও’ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ২০১৩ তে বিএনপির কর্মীদের ধারণা ছিল এই নির্বাচনে জিতলে তারা জাতীয় নির্বচনেও জিতবে। স্বভাবতই সামনে আশা দেখলে চরম হতাশ মানুষও কিছুটা প্রাণশক্তি ফিরে পায়। মানসিক ভাবে শক্তি পায়। কিন্তু এখন  এমন কোনো আশা এখন বিএনপির কর্মীদের সামনে নেই। যে কারণে প্রাণশক্তিও নেই কর্মীদের মধ্যে। দুই সিটিতেই দেখা গেছে মাত্র কয়েকশ কেন্দ্র সেখানেই বিএনপির এজেন্ট দেওয়ার মতো লোকও পাচ্ছে না। বিএনপি বারবার অভিযোগ করছে তাদের এজেন্ট কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।  বরং রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সূত্রই নিশ্চিত করেছে, নির্বাচনের আগে পরে বিএনপির পক্ষ থেকে এজেন্ট হওয়ার কোনো কথা জানানোই হয়নি।

৩. বিএনপির অন্ত:কলহগুলো এখন প্রবল হয়েই দেখা দিয়েছে। খুলনার সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে বাদ বিএনপি সেখানে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয় নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। একই ভাবে গাজীপুরে গতবারের বিএনপি নির্বাচিত মেয়র আব্দুল মান্নানের পরিবর্তে বিএনপি মনোনয়ন পেল হাসান উদ্দিন সরকার। খুলনায় মনিরুজ্জামান গোপনে দলের বিপক্ষে গিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও গাজীপুরে মান্নানের লোকজনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীরের পক্ষে কাজ করার বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। দুই সিটিতে দলের মধ্যেকার অন্ত:কলহগুলো বিএনপির ভরাডুবির অন্যতম কারণ। ২০১৩’র নির্বাচনে বিএনপি ছিল অনেক সংঘবদ্ধ। খুলনা ও গাজীপুরে তৎকালীন বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থেকেই নির্বাচন করেছিল। ঐক্যবদ্ধে সেই সাফল্য এখন অনৈক্যে হারিয়ে ফেলেছে বিএনপি।

৪. মানুষ এখন উন্নয়নমুখী। এখন মানুষ চায় তার এলাকার উন্নতি হবে, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হবে। তাঁর এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন জনপ্রতিনিধিরা। খুলনা-গাজীপুর দুই সিটি নির্বচনেই মানুষ তুলনা করেছে- আওয়ামী লীগ আমলে কী কাজ হয়েছে, আর বিএনপি আমলে কী কাজ হয়েছে। তুলনার কারণেই আওয়ামী লীগের ভোটের বাক্সই ভরেছে।

৫. লক্ষ্যহীনতাই বিএনপির বর্তমান সময়ের সব ব্যর্থতার কারণ। বিএনপির রাজনৈতিক লক্ষ্য কি? তারা আসলে কী করতে চায়? একজন কোনো দায়িত্ব নিতে চাইলেই হয় না-তাঁকে বোঝাতে হয় সে ওই দায়িত্ব নিয়ে কী করতে চায়। বিএনপি এখন একটি লক্ষ্যহীন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। দুই সিটি নির্বাচনেই তাদের প্রার্থীরা নগরবাসীর জন্য কী করবেন-তার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেননি। খুলনা, গাজীপুর দুই সিটির বিএনপি প্রার্থীরাই শুধু অভিযোগের কথা বলে বেরিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে নগর নিয়ে পরিকল্পনার কথা তারা কয়বার বলেছেন। নগরবাসীর মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, বিএনপি প্রার্থী নগর পিতা হয়ে কী শুধু সরকারকে গালাগালিই করবে? নগরের কোনো উন্নয়ন না করে শুধু সরকারকে গালাগালির জন্য কোনো দলকে মানুষ ভোট দেবে কেন? বর্তমান সময়ে সব মানুষই নিজের, নিজের চারপাশের উন্নতি চায়। কারও সমালোচনার জন্য নিজের মহামূল্যবান ভোটাধিকার কয়জন দেবে বিএনপিকে।

এ তো গেল বিএনপির ব্যর্থতার পেছনের কারণ। আওয়ামী লীগ কীভাবে দুই সিটির নির্বাচনে এতটা সাফল্য পেল। এর পেছনে আছে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। আওয়ামী লীগ এবার দলীয় ঐক্যের ব্যাপারে কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে। খুলনা-গাজীপুর দুই সিটিতেই গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল দলীয় কোন্দল। এবার আওয়ামী লীগ সেই কোন্দলের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। দুই সিটিতেই নেতাকর্মীদের ঐক্যের বিষয়টি নিরীক্ষণ করা হয় দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এতেই সফলতা এসেছে খুলনা-গাজীপুর দুই সিটিতে।

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ