ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অবিশ্বাসে বসবাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৯:৫৯ পিএম
অবিশ্বাসে বসবাস

নামকরা রাজনৈতিক নেতা। দলের মধ্যে বেশ ‘পাওয়ারফুল’। দলের কোনো নীতি নির্ধারণ তাঁকে ছাড়া হয় না। কিন্তু এতকিছুর পরও দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে বিশ্বাস করেন না। তাঁকে নিয়ে আস্থার সংকট। তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না কেউ। তাঁকে সবসময়ই অন্য কারও এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী বলেই মনে করা হয়। সব দলের এমন কিছু নেতার দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম। সাবেক প্রভাবশালী এই আমলা মুক্তিযুদ্ধের সময়ই মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট সচিব নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ৭৫ পরবর্তী সময়ে তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলেই মনে করেন অনেকে। খুনি মোশতাককে শপথ পড়ান এইচ. টি. ইমাম। অবশ্য এজন্য তিনি নিজেও ভুগেছেন অনেক। কারাবরণ করতে হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময় তাঁর পদাবনতিও ঘটেছে। আবার তাঁকে জয়েন্ট সেক্রেটারি করা হয়। সেখান থেকে তিনি আবার সচিব হন। কিন্তু ৭৫ এ ১৫ আগস্টের নীরব ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে বিশ্বাস করে না। সম্প্রতি এইচ. টি. ইমাম ভারতে গিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাকে ব্যক্তিগত বক্তব্য বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এইচ. টি. ইমামকে নিয়ে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করেন। দলের অনেকে মনে করেন তিনি যেকোনো সময় ডিগবাজি দিতে পারেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে এইচ. টি. ইমামকে নিয়ে আস্থার সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের উপরও নেতাকর্মীদের কোনো আস্থা নেই। ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চে যখন বিএনপির গদি টালমাটাল, তখন এই মহিউদ্দিন খান আলমগীরই মিছিল করে জনতার মঞ্চে যোগ দেন। এর পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি। হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব। পরে প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী হয়েছেন। এরপরও আওয়ামী লীগ তাঁকে বিশ্বাস করে না। কারণ জিয়াউর রহমানের খাল কাটা তত্ত্বের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রিধারী মহিউদ্দিন খান আলমগীর একাত্তরের নয় মাস পাকিস্তান সরকারের হয়ে ময়মনসিংহের ডিসির দায়িত্ব পালন করেছেন। আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব থেকে দেওয়া কোনো দায়িত্বই বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করতে পারেননি মহিউদ্দিন খান আলমগীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় খান সাহেবের অনেক কর্মকাণ্ডই প্রশ্নবিদ্ধ। পরে তাঁকে দেওয়া হলো ফারমার্স ব্যাংক। ব্যাংক ডুবিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করলেন এই সাবেক আমলা। সরকারের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায়ও মহিউদ্দিন খান আলমগীরের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন উঠেছে। দলের লোকজনই মহিউদ্দিনকে বিশ্বাস করেন না।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। বর্তমান বিএনপির অতি গুরুত্বপূর্ণ এই নেতার সঙ্গে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান দুজনেরই ভালো সম্পর্ক। কিন্তু বিএনপিরই নেতাকর্মীরা তাঁকে বিশ্বাস করেন না। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বদ্ধমূল ধারণা আবদুল আউয়াল মিন্টু আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার লোক। কারণ একসময় আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি গিয়েছেন মিন্টু। আবার অনেক বিএনপি নেতাকর্মীর ধারণা তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার লোক। বিএনপির অনেকেই মনে করেন, আবদুল আউয়াল মিন্টুর কারণেই ২০১৪ নির্বাচনে বিএনপি যায়নি। যে কারণে এখনো মাশুল দিতে হচ্ছে দলকে। সীমাহীন এই মাশুল দিতে গিয়ে এখন অস্তিত্বেরই সংকটে পড়েছে বিএনপি।

আস্থার সংকটে থাকা আরেক নেতা বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। সাবেক সেনাপ্রধান থেকে আসেন বিএনপি। একসময় যে বিএনপির সঙ্গে সেনাবাহিনীর ‘গ্যারান্টেড’ ও ‘ট্রাস্টেড’ সম্পর্ক ছিল তার শেষ প্রতিনিধি লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। কিন্তু তাঁকে বিএনপির লোকজন বিশ্বাস করে না। ওয়ান ইলেভেনে সংস্কারপন্থীদের দলে থাকার কারণেই এই অবিশ্বাস। লে. জেনারেল (অব.) মাহবুব বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন চেয়েছিলেন। ওয়ান ইলেভেনের পর দলের ফিরলেও জিয়ার কবরের সামনে তাঁকে দিগম্বর করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ আছে। এখনো লে. জেনারেল মাহবুব খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন ও তারেক মুক্ত বিএনপি- এমন কথাবার্তা বলেন। তাই বিএনপিতে থাকলেও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবকে বিশ্বাস করেন না বিএনপির নেতাকর্মীরাই। 

বিএনপির আরেক অবিশ্বাসের নাম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। বাংলাদেশে ডিগবাজির রাজনীতির বরপুত্র ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করতে পারেন না সঙ্গত কারণেই। বঙ্গবন্ধুর সময় তিনি ছিলেন পোস্টমাস্টার জেনারেল। আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে যান এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। পরে যান বিএনপিতে। কিন্তু কদিন পরই আবার জাতীয় পার্টিতে। এখানেই শেষ নয় আবার জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে। বিএনপির নেতাকর্মীদের মনে প্রশ্ন তিনি কবে আবার দল ছেড়ে অন্য কোথাও যোগ দেন তার কোনো ঠিক ঠিকানা আছে। ব্যারিস্টার মওদুদ সম্পর্কে একটি বিষয়ই প্রচলিত সবসময় তিনি দলের ভাঙ্গন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যারিস্টার মওদুদকে বিশ্বাস করার কোনো কারণই খুঁজে পায় না।   

শুধু প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই নয়। এর বাইরে জাতীয় পার্টিতেও (জাপা) আছে অবিশ্বাসে বসবাস। দুষ্টু লোকের কথা, এরশাদের সবচেয়ে বড় অবিশ্বাস তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ। রওশন হলেন জাপার কো-চেয়ার। কিন্তু রওশনের ক্ষমতা খর্ব করার জন্যই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ার করেছেন এরশাদ। জাপার ওপেন সিক্রেট, এরশাদের কথা শোনেন না রওশন। সবসময়ই রওশন এরশাদের কাছে কিছু লোক রেখে দেন এরশাদ। এরশাদের এই ফেউরা সবসময় রওশনের সঙ্গে লেগে থাকে। রওশনের প্রতিটি কথা কাজের খবর চয়ে যায় এরশাদের কাছে। জাপার মধ্যে এমন কথা প্রচলিত, দলের একমাত্র রওশনই যেকোনো সময় এরশাদকে উড়িয়ে দিতে পারেন। এরশাদ একই সঙ্গে রওশনকে ভয় পান এবং সন্দেহ করেন।

জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। দলের নেতাকর্মীদের বিশ্বাস আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেন তিনি। কারণ এই বাবলুর কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার বর্তমান এই সম্পর্ক। আর এরশাদও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর উপর সন্দিহান। একারণে কখনো কাছ ছাড়া করেন না বাবলুকে। জিয়াউদ্দিন বাবলু মহাসচিব থেকে সরে গিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদার জাপা মহাসচিব হলেও এখনো এরশাদের সবচেয়ে কাছেই থাকেন। তবে এরশাদ ও জাতীয় পার্টির নেতারা সবসময়ই চোখে চোখে রাখেন তাঁকে, যেন কখনো দলের বাইরে কিছু করতে না পারেন।

উল্লিখিত কয়েকজনের কথা বলা হলো মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অবিশ্বাসের মানুষের সংখ্যা কম না। এদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট দলের নীতিনির্ধারক হলেও নেতাকর্মীদের অবিশ্বাস কাটাতে পারেননি। ভবিষ্যতেও কাটাতে পারবেন এমন সম্ভাবনাও নেই। 



বাংলা ইনসাইডার/জেডএ