ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

প্রতিহিংসার রাজনীতি: আয়নায় নিজের মুখ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০১৮ শনিবার, ১০:০০ পিএম
প্রতিহিংসার রাজনীতি: আয়নায় নিজের মুখ? যশোর যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে বিএনপি ও যুবদল কর্মীদের হামলা (বামে) ও কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকদের সমাবেশে ছাত্রদল, যুবদল ক্যাডারদের হামলায় আহত সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী (ডানে)

আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর সম্প্রতি হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিবার সম্পর্কে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জামিন পেতে গত ২২ জুলাই কুষ্টিয়া আদালতে গিয়েছিলেন মাহমুদুর রহমান। সেখানে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁর ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই ঘটনার পরপরই বিএনপির নেতাকর্মীরা ও তথাকথিত সুশীল সমাজ সরকারের নিন্দায় মুখর হয়ে উঠেছে। একথা বারবার বলা হচ্ছে, দেশে বাকস্বাধীনতা নেই, ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পোষণ করার কারণে সমালোচিত হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার।

সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা অবশ্যই নিন্দনীয় কাজ। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা সত্যিকে খণ্ডিত ভাবে দেখি। একটি ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে এর পেছনের কারণ দেখতে হয়, ইস্যুর উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করতে হয় সেটি আমাদের মনে থাকে না।

এই হামলার নিন্দা যারা করছেন তাঁরা অচেতন বা সচেতনভাবেই বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডগুলোর কথা উল্লেখ করছেন না। সমালোচকরা বলছেন না, কোন কোন ঘটনা মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে যে কারণে আজকে মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটলো।

দেশে বাক স্বাধীনতা নেই এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, বিএনপি শাসনামলে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক নির্যাতন বিরোধী সমাবেশে সাংবাদিক নেতা ও অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছিল। ইকবাল সোবহান চৌধুরী স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভয়ভীতিতে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়া চার সাংবাদিককে নিয়ে ২০০৬ সালের ২৯ মে তারিখে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে আসেন। সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ওমর ফারুক, গাজী আজমল হোসেন প্রমুখ। সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় ফরিদপুরের সাংবাদিক নেতা লায়েকুজ্জামান বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল কতটা দেউলিয়া হলে সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা মামলা করতে পারে।’ এই বক্তব্যের পরই আগে থেকে হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখা  ছাত্রদল ও যুবদলের ক্যাডাররা সমাবেশে অতর্কিত হামলা চালায়। জেলা বিএনপি অফিস থেকে বের হয়ে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে সমাবেশস্থলে আসে। সমাবেশস্থল কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে জড়ো হয়ে তাঁরা মারপিট-ভাংচুর শুরু করে। এতে রক্তাক্ত হন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। আহত হয়েছিলেন আরও ২৩ জন সাংবাদিক।

অবজারভার সম্পাদকের মতোই শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসির মামুন আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা নন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হওয়ার কারণে শিক্ষা-সংস্কৃতি জগতের এই দুই ব্যক্তিও বিএনপির প্রতিহিংসার রাজনীতির হাত থেকে রক্ষা পাননি।

জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে বোমা হামলা চালানো হয়। জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সংঘটিত এই বোমা হামলায় ১৮ জন নিহত ও দুই শতাধিক লোক আহত হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগের সেই সময়ের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী, লেখক মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মতিউর রহমানসহ ৩১ জনকে, যা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত । অবশ্য ২০০৭ সালে তাঁরা এই মিথ্যা মামলার দায় থেকে নিষ্কৃতি পান।

শাহরিয়ার কবির এর আগেও বিএনপির অপরাজনীতি প্রত্যক্ষ করেছেন। ক্ষমতায় আসার পরপরই বিএনপি-জামাত জোট সরকার দেশজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর রাতে মাত্র ১৩ বছরের কিশোরী পূর্ণিমা রানী শীলকে গণধর্ষণ করে বিএনপি-জামাত জোটের সন্ত্রাসীরা। ঘটনার পরপরই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক তাকে দেখতে উল্লাপাড়ায় আসেন। সে সময় পূর্ণিমার সঙ্গে দেখা করতে শাহরিয়ার কবিরদের বাধা দেওয়া হয়, তাঁদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-হামলা তো চলছিলই। একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, আহসানউল্লাহ্‌ মাস্টার ও শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মতো জনপ্রিয় নেতাদের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তৎকালীন সরকারের সন্ত্রাসীরা। এগুলো ছাড়াও তাঁদের নির্যাতনের তালিকা অনেক লম্বা যা বর্তমানে নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী সমাজ ভুলে গেছে।

আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী পরিচ্ছন্ন ইমেজের ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকেও হেনস্থা করতে ছাড়েনি বিএনপি-জামাত জোট সরকার। অন্য কোনো অভিযোগ না পেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্লেট চুরির মামলা দিয়েছিল তাঁরা। এই হাস্যকর মামলায় গ্রেপ্তার করে সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিএনপির সন্ত্রাসীদের হাতে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিমসহ আরও অনেকে।

অদ্ভুত একটি বিষয় লক্ষ্য করে দেখুন। আজ বিএনপির নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত কারান্তরীণ করেছে সরকার। অথচ খালেদা জিয়া কারাবন্দী আছেন আইন-আদালতের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদাহরণ টানতে গেলে বরং শেখ হাসিনার প্রতি ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আচরণের কথাই উল্লেখ করতে হয়।

সেই দিনটি ছিল ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট।  যশোর যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা চালায় জোট সরকারের সন্ত্রাসীরা। কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেখান থেকে যশোরে ফিরে যাওয়ার পথে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে কলারোয়া উপজেলা বিএনপি অফিসের সামনে রাস্তার ওপর একটি যাত্রীবাহী বাস (সাতক্ষীরা-জ-০৪-০০২৯) আড়াআড়ি ফেলে রেখে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা চালায়। হামলায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান ও সাংবাদিকসহ দলীয় অনেক নেতাকর্মী আহত হন। আর এই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও তৎকালীন সাংসদ হাবিবুল ইসলামের হাবিব ও বিএনপি নেতা রঞ্জু।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন এবার হামলার শিকার হলেন বিএনপি-জামাতের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে মিথ্যাচার করা মাহমুদুর রহমান। বিএনপি-জামাত যতই হত্যার রাজনীতি করুক, গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগের সময়ে এই ধরনের ঘটনা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একজন অপরাধীর বিচার করতে হবে আইন-আদালতের মাধ্যমে৷ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কখনোই সমাধান নয়৷

কিন্তু এত কিছুর পরও একটি কথা থেকে যায়৷ কথাটি হলো, দিনশেষে আমরা সবাই মানুষ। রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা, ক্ষমার মতো ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য যেমন রয়েছে, তেমনি রাগ-ক্ষোভ, ঘৃণার মতো নেতিবাচকতা থেকেও আমরা মুক্ত নই। তাই দিনের পর দিন বিএনপি সরকারের অন্যায়, নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর, মাহমুদুর রহমানের কলম সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার পর ছাত্রলীগের একটি অংশের ধৈর্য্যের বাধ যদি ভেঙেই যায় তাহলে আমরা তার সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু বিস্মিত হতে পারি না।

শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা, সাংবাদিক সমাবেশে হামলা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা-হামলার প্রচলন যদি বিএনপি সরকার না করতো তবে মাহমুদুর রহমানকে আজকে এই দিন দেখতে হত না। আজ যারা আমার দেশ সম্পাদকের ওপর হামলার ঘটনায় ঘৃণায় ভাষা হারিয়ে ফেলছেন তাঁদেরকে মনে রাখতে হবে, প্রতিহিংসার রাজনীতি বিএনপিই প্রথম চালু করেছিল। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে যে সেই প্রতিহিংসার সিকিভাগও ফেরত দেয়নি এই কথা স্বীকার করতেই হবে।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ