ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

যেভাবে জন্ম হলো বিএনপির

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ শনিবার, ০৮:০১ এএম
যেভাবে জন্ম হলো বিএনপির

স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের সদস্য খন্দকার মোশতাক এবং কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদের মতো সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য। ষড়যন্ত্রকারী সেনা অফিসারদের মধ্যে আরেকজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। এই ব্যক্তিটি জেনারেল জিয়াউর রহমান, যিনি মেজর জিয়া নামেই সমধিক পরিচত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের একজন এই জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান বানানোর যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরা দেখেছিলেন তার এজেন্ডা বাস্তবায়নেই পরবর্তীতে কাজ করে বিএনপি।

জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করা অবৈধ সেনাশাসক পরিচয় মুছে ফেলে ইতিহাসে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিএনপি এমন একটি দল যার জন্ম হয়েছে সেনা ছাউনি থেকে। বিএনপি গঠনের জন্য সংশ্লিষ্টরা প্রথম বৈঠকে বসেছিলেন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের বাসস্থান ঢাকা সেনানিবাসের বাড়িতেই। সাধারণত সেনা ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া দলগুলো খুব বেশিদিন জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। এদিক থেকে বিএনপি ব্যতিক্রম। এই দলটি কালে কালে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। এই পর্যায়ে পচাত্তরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়ার নিজস্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৬ ব্রিগেডের কিছু তরুণ অফিসারকে দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দি করেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের সহযোগিতায় জিয়া বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান। এরপর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি জেনারেল জিয়ার অঙ্গুলি ইশারায় চলতে থাকে। এরই  ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

কিন্তু তখনো জিয়া একজন সামরিক শাসক, কোনো রাজনীতিবিদ নন। নিজেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থাপনের জন্য অবশ্য বেশি সময় নেননি জিয়া। সামরিক শাসক থেকে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার পথে বেশ চিন্তা-ভাবনা করে কয়েকটি ধাপে ধীরে-সুস্থে এগিয়ে গেছেন তিনি। বন্দুকের নল নয়, জনগণই তাঁর ক্ষমতাঁর উৎস একথা প্রমাণের জন্য ১৯৭৭ সালের ৩০ মে তিনি হ্যা-না ভোট নিয়েছিলেন। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, ওই নির্বাচনে দেশের ৮৮.৫০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দাবি করেন, পরিসংখ্যানটি মিথ্যা, বানোয়াট। এর আগে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল নিজের শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিলেন।

জেনারেল জিয়া এরপর দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তাভাবনা শুরু করেন। সেজন্য নিজের একটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন তিনি। অবশ্য জিয়া রাজনৈতিক দল তৈরির আগেই একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা করেন যার উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের পাল্টা একটা বড়সড় মঞ্চ তৈরি করা। তবে নিজস্ব রাজনৈতিক দল তৈরির কাজটি খুব গুরুত্বের সঙ্গেই গুছিয়ে আনছিলেন তিনি। কারণ তিনি মনে করতেন জোটের মধ্যে শতভাগ অনুগত একটা দল না থাকলে জোটকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সেই উদ্দেশ্যে জেনারেল জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে `জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল` বা `জাগদল` নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তবে জাগদল রাজনৈতিক দল হিসেবে তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।

১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল জিয়াউর রহমান নিজেই নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নোতি দেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৬টি দল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে `জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট` ঘোষণা করা হয়। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ১৯৭৮ সালের ১২ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টই তখন রাজনীতির মঞ্চের ক্ষমতাশালী ফ্রন্ট। কিন্তু জিয়া অতীতের ফ্রন্ট সরকারগুলোর ব্যর্থতার ইতিহাস জানতেন। একই সঙ্গে নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও নিজ আদর্শের প্রতিষ্ঠা হেতু একটি একক রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন জিয়া। তাই সে বছরেরই আগস্ট মাসে জিয়া জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ভেঙে দেন এবং ১ সেপ্টেম্বর নিজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল (বিএনপি) নামে একটি দল গঠন করেন। জিয়াউর রহমান কিন্তু তখনো সেনাপ্রধান। এভাবেই একজন সেনাপ্রধানের হাতে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম হয় বিএনপির।

জেনারেল জিয়ার সেনা শাসক থেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবর্তনে অনেকে অনেক ভাবে ভূমিকা রেখেছেন। তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশুর অফিসে তখন রাতের বেলায় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক বসতো। কর্নেল অলি আহমেদ রক্ষা করতেন মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিবিদিদের সঙ্গে যোগাযোগ।

এছাড়া জিয়াউর রহমান নিজের রাজনীতিবিদ পরিচয় পাকাপোক্ত করার জন্য বেশ কিছু রাজনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়া। যাদু মিয়াকে প্রধানমন্ত্রীত্বের টোপ দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান কিন্তু কথা রাখেননি তিনি। অনেকে যাদু মিয়ার মৃত্যুর জন্যও জিয়াকে দায়ী করেন। শুধু যাদু মিয়াই নয়, অনেকেই জিয়ার রাজনীতির সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জিয়া বেসামরিক তারকাদেরও দলে ভিড়িয়েছিলেন। জিয়ার মিত্র হিসেবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ শামসুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ।

বিএনপির জন্মের ইতিহাস বলে, গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দলটির মেলবন্ধন নেই। সময়ের চক্রে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সত্যি কিন্তু তাদের আদর্শিক দেউলিয়াপনা সবসময়ই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার বিষয় হয়েছে।


বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ