ঢাকা, সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধী কেন পরিবেশ অধিদপ্তর?

সাদিয়া হুমায়রা
প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বুধবার, ০৮:০১ এএম
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধী কেন পরিবেশ অধিদপ্তর?

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। বিজয়ের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ও দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে মনোযোগ দেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে যাত্রা করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় সরকার প্রতিনিয়ত উন্নয়ন কাজ করে চলেছে। কিন্তু কিছু ঘটনায় মনে হয়, সরকারের ভেতরেই যেন আরেক সরকার ঘাপটি মেরে আছে যাদের উদ্দেশ্য বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা। বর্তমানে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় অনেক স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবির এবং বিএনপির লোকজন রয়েছে। এই দলটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করার জন্য সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজে সরকারের দপ্তরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভূক্ত পরিবেশ অধিদপ্তর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এই পরিবেশ অধিদপ্তর।

বাংলাদেশ সরকার দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, আবাসন সমস্যার সমাধান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রেল, সড়ক ও নৌপথ উন্নয়নে বিগত বছরগুলোতে বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। সব প্রকল্পে আপত্তি না করলেও রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জলসিড়ি আবাসন প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বেশ কিছু বড় বড় প্রকল্পে পরিবেশগত ঝুঁকির অজুহাত দেখিয়ে বাগড়া দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের এই অনীহার কারণ হিসেবে অধিপ্তরে কর্মরত জামাত-শিবির, বিএনপি কর্মকর্তাদের দায়ী বলে মনে করা হয়।

বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিতর্কের সূচণা হয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের কারণেই। ২০১৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হয় এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রকল্পের জন্য প্রথমে অবস্থানগত ছাড়পত্র এবং পরবর্তীতে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের বিধান রয়েছে। এই আলোকে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ সালের ২৩ মে অবস্থানগত ছাড়পত্র জারি করে এবং পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণে (ইআইএ) টিওআর অনুমোদন করে। ২০১৪ সালে প্রকল্পটি যে পর্যায়ে ছিল ওই পর্যায়ে প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি আসে না। সে সময় অবস্থানগত ছাড়পত্রের বিষয়টি প্রযোজ্য ছিল। পরিবেশগত ছাড়পত্র জারির লক্ষ্যে প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করে অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর যন্ত্রপাতি আমদানি এবং সেগুলো স্থাপন করে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন করতে হয়। আবেদন প্রাপ্তির পর অধিদপ্তর পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করে। কিন্তু ওই সময় এমন বক্তব্যের মাধ্যমে রামপালকে ঘিরে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায় পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশের ক্ষতিসাধন না হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ ব্যবস্থা গ্রহণের পরও এমন অভিযোগ ছিল হতাশাজনক। পরবর্তীতে জানা যায়, তৎকালীন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজি জামাত-বিএনপি ঘরানার লোক বলে পরিচিত। স্বাধীনতা বিরোধী মনোভাব নিয়ে তিনি যে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ভালো চোখে দেখবেন না এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবেন সে কথা বলাই বাহুল্য।

শুধু রামপালই নয়, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য সরকারের নির্দেশে নির্মিত জলসিড়ি আবাসিক প্রকল্পের কাজেও বাধা দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০১০ সালে সরকার কর্তৃক জলসিড়ি প্রকল্পের উদ্যোগ গৃহীত হওয়া পর একটি মহল বলা শুরু করলো এই প্রকল্পে পরিবেশের ক্ষতি হবে, ফসলের ক্ষতি হবে। অথচ পরবর্তীতে এসব অভিযোগের কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক ছাত্রজীবনে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বুয়েটে অধ্যয়নরত অবস্থায় শিবিরের হল শাখার নেতা ছিলেন তিনি। এখন ওই পরিচালক পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সবাই ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত।

রামপাল ও জলসিড়ি প্রকল্পের মতো যখনই যেখানে উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, সেখানেই তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রত্যেকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পেরই পরিবেশ ছাড়পত্র দিতে বিলম্ব করছে অথবা অন্য কোনো ভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্রদৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোও।

এবার পরিবেশ অধিদপ্তরের নজর পড়েছে দেশের উন্নয়নে গৃহীত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিনব ইকোনমিক জোন বা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগের ওপর। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয় তাই দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর এই সাধু উদ্যোগেও বাধার সৃষ্টি করছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীর তীরঘেষে ৮৩ একর জায়গার ওপর আমান ইকোনমিক জোন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নদী দখলের অভিযোগ এনে ঢাকা অঞ্চল কার্যালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়।

সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিপক্ষ অবস্থান নেওয়া এক নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই সরকারই সারা দেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের ২১টি জেলা অফিস স্থাপন করে এবং ৪৬৮টি নতুন পদ সৃষ্টি করে পরিবেশ অধিদপ্তরের পদের সংখ্যা ২৬৭ থেকে ৭৩৫ টিতে উন্নীত করে। পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলেই সরকার এই উদ্যোগগুলো গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও প্রতিটি কাজেই পরিবেশের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। এমনকি বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরষ্কার `চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ` লাভ করেছন তিনি। অথচ শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকেই পরিবেশ বিরোধী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দুঃখজনক হচ্ছে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতা দেখা গেলেও যে কাজগুলো তাদের করা উচিত সেগুলো তারা করছে না। ধলেশ্বরী নদীর পানি ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেই দূষণ প্রতিরোধে অধিদপ্তরের কোনো উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন যাবৎ ঢাকার চারপাশের চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর পানি দূষিত, কিন্তু এই নদীগুলো নিয়েও কোনো মাথা ব্যথা নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের। নিষিদ্ধ করার ১৬ বছর পরও পলিথিনের ব্যবহার এখনো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। যদি পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হতো তাহলে ঢাকায় সামান্য বৃষ্টিপাতেই যে জলাবদ্ধতার সমস্যা সৃষ্টি হয় তা দূর করা কঠিন হতো না। পরিবেশ অধিদপ্তরের শব্দ দূষণ বন্ধে উদ্যোগ নেই, উদ্যোগ নেই ইটভাটার কারণে হওয়া পরিবেশ দূষণ বন্ধে। বরং ইটভাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপরি আয়ের উৎস।

বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো আগ্রহই নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের। এর বদলে সরকারের সকল উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা দেওয়াই যেন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। জামাত-শিবির, বিএনপিপন্থী লোকজন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেওয়ায় এমনটা ঘটছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা।


বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ