ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

শেখ হাসিনা-ইউনূস লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ১০:০০ পিএম
শেখ হাসিনা-ইউনূস লড়াই

নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দ্বারাই। ২০১৪’র নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিএনপি ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গবেষকরা বলছেন, ২০১৮ তে এসে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বদল হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ এবার আর বিএনপি না, ড. মুহম্মদ ইউনূস। এখন বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. মুহম্মদ ইউনূসের লড়াই। গত ৬ মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা ঘটছে তা এই দু’জনের রাজনৈতিক কৌশলের লড়াই। শেখ হাসিনার তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার প্রধান বাধা এখন ইউনূস। তবে, ড. ইউনূস প্রকাশ্যে নন, নেপথ্যে থেকে তিনি আওয়ামী লীগকে বা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে চান।

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, সেই সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন ড. ইউনূস। সে সময়, সেনা প্রধানকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় নির্বাচন বানচালের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন করতে প্রফেসর ইউনূস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ড. ইউনূস গ্রামীণ ফোনের লাইসেন্স পান। একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনও পান। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে, বিএনপির সঙ্গে সখ্যতা করতে ইউনূস সময় নেননি। এমনকি, ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর ড. ইউনূস একটা সহানুভূতি পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে জানাননি। এরপর ড. ইউনূস আস্তে আস্তে মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য হিলারি-ক্লিনটন দম্পতির অবদানই ছিল ষোলো আনা। এরপরই ড. ইউনূসকে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দেশে তাঁর এজেন্ডা বাস্তবায়নের কৌশল নেয়। ড. ইউনূস নোবেল প্রাপ্তির পরপরই রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। পরে সেখান থেকে সরে আসেন। তখনকার দালিলিক তথ্য ও সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, ২০০৭ সালে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অনির্বাচিত সরকার আনতে ড. ইউনূসই ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। ২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশ সংক্রান্ত শুনানিতে অংশ নিয়ে এই নোবেল জয়ী বাংলাদেশে দুই নেত্রীর চিরস্থায়ী অবসরের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। ঐ শুনানিতে তিনি ‘বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি বন্ধে দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরানো প্রয়োজন’ বলে তত্ত্ব দেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ঐ তত্ত্বই ছিল ওয়ান ইলেভেনের ভিত্তি।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগসহ সব পরিকল্পনাই ছিল ড. ইউনূসের। কিন্তু ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনভিপ্রেত ঘটনা এবং সেনাবাহিনীর মূল ধারার পেশাদারিত্ব মনোভাবের কারণে ড. ইউনূসের পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, ভারত ওয়ান-ইলেভেনের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বাংলাদেশে নির্বাচনের জন্য চাপ দেয়। ২০০৮ এর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়। এর পরপরই শেখ হাসিনা আর ড. মুহম্মদ ইউনূসের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়। চাকরির বয়সসীম অতিক্রান্ত হওয়ায় সরকার ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। ইউনূস এটা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে হেরে যান। এরপর থেকে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক লবিং শুরু করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারকে শিক্ষা দিতে ড. ইউনূস হিলারি ক্লিনটনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের কাছে নালিশ করেন। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি ছিল ড. ইউনূসের আবিষ্কার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি প্রমাণ হয়নি। উপরন্তু শেখ হাসিনা দেশীয় অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ড. ইউনূস আশা করেছিলেন যে মার্কিন নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন জয়ী হবেন। এখন তিনি দ্রুত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাতে পারবেন। কিন্তু তা ঘটেনি। এসময় এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য ঠেকাতে ভারত যাদের লবিস্ট করেন তাদের মধ্যে ড. ইউনূস একজন। ভারতের অর্থমন্ত্রীসহ বিজেপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে চীন প্রশ্নে দ্রুতই ড. ইউনূস কাছের মানুষে পরিণত হন। আর এর ফলে তিনি বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন নীতি ও ভারতের নীতিকে এক বিন্দুতে মেলাতে সক্ষম হন।

একাধিক কূটনীতিক সূত্র বলছে, ড, ইউনূস এরকম অন্তত দুটি গবেষণাপত্র ভারতের কাছে উপস্থাপন করেছেন, যাতে তিনি বলেছেন শেখ হাসিনা সরকার চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ নীতি এগিয়ে নিচ্ছেন। ভারতের একাংশকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে অন্ধভাবে সমর্থন দেওয়া সঠিক নয়। আর ঐ অংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ড. ইউনূস সুশীল সমাজের কাঙ্ক্ষিত মোর্চা গঠনের কাজ করছেন। বাংলাদেশে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি ইতিমধ্যেই অন্ধকার কূপে পতিত হয়েছে। ২০১৮ তে ড. ইউনূস শেখ হাসিনাকেও কুপোকাত করতে চাইছেন। তাঁকে রাজনীতি থেকে হটানোর দুবার চেষ্টা করেও ইউনূস ব্যর্থ হন। এবার তিনি পারবেন? নাকি চীন আগ্রাসন প্রতিরোধে মার্কিন লবিস্ট ইউনূসেরই প্রভাব বলয় চিরতরে ক্ষুণ্ণ হবে। এই প্রশ্নের মীমাংসা হবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই।


বাংলা ইনসাইডার/জেডএ