ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:১৪ এএম
‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’

যুগে যুগে ভালোবাসার জন্য কত কিছুই না কুরবানি করেছে মানুষ। ভারতবর্ষের রাধা-কৃষ্ণই বলুন, আরবের লাইলি-মজনুই বলুন কিংবা ধরা যাক পশ্চিমের রোমিও-জুলিয়েটের কথা। কোনো অমর প্রেমকাহিনীতেই মিলন নেই, কেবল বিরহ আর বিরহ। আত্মত্যাগ ব্যতীত প্রেম কাহিনীগুলো ঠিক যেন জমে ওঠে না।

আত্মত্যাগের গল্পগুলোও কিন্তু দুর্ধর্ষ। পারিবারিক অসম্মতির কারণে বিয়ে করা সম্ভব না। তাই আত্মহত্যা করে বসলেন প্রেমিক-প্রেমিকা।

আবার অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রীর সন্তান হচ্ছে না। কিন্তু বংশ তো রক্ষা করতে হবে। তখন স্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে স্বামীকে বিয়ে করিয়ে দেন। দ্বিতীয় বিয়ের জন্য দেওয়া এই অনুমতিতে বেদনা থাকে, থাকে বিরহ। কিন্তু ওই যে! স্বামীর মঙ্গল দেখতে হবে। তাই তো বুকে পাষাণ বেধে এক বেদনা বিধুর দিনে স্ত্রী স্বামীকে তুলে দেন অন্য নারীর হাতে।

গতকাল জামায়াতে ইসলামীর জন্য ছিল তেমনই একটি বেদনা বিধুর দিন । জামাত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপিকে। বিএনপিকে তারা তুলে দিয়েছে নতুন নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যের হাতে। এ যেন বেকার প্রেমিকের বড়লোক পাত্রের সঙ্গে প্রাণপ্রিয় প্রেয়সীকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেওয়া। এ যেন সন্তান ধারণে অক্ষম স্ত্রীর বুকে পাথর চেপে অন্য নারীর হাতে স্বামীকে সঁপে দেওয়া। বিরহী প্রেমিক ভিন্ন জামাতের দুঃখ আর কেই বা বুঝতে পারবে।

জামাতের বর্তমান অবস্থার কথা ভেবেই বোধহয় মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাস লিখেছিলেন –

‘সই, কেমনে ধরিব হিয়া?
আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়
আমার আঙ্গিনা দিয়া!’

কবি চণ্ডীদাসের কাছে সম্ভবত টাইম মেশিন ছিল। তাই তো এত বছর আগেই তিনি জামাতের বিরহে কাতর হয়ে কবিতা লিখতে বসেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি-জামাত ঠিক যেন লাইলি-মজনু, রোমিও-জুলিয়েটদের প্রতিনিধি। এই দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে গভীর হৃদ্যতা তার সঙ্গে কেবল এই লিজেন্ড প্রেমিকা-প্রেমিকাদের অমর প্রেম কাহিনীর তুলনাই করা চলে।

বিএনপি-জামাতের ভালোবাসার সম্পর্কটা খুব পুরনো। বাংলা সিনেমায় স্কুলগামী বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যেও প্রেম হতে দেখা যায়, যারা বড় হয়ে নায়ক-নায়িকার রোলে অভিনয় করে। বিএনপি-জামাতের প্রেমটাও তেমনি প্রাচীন। অবশ্য এই দুই দলের প্রেমের সূচনা লুকোচুরি খেলতে খেলতে হয়ে যায়নি। এই প্রেম গড়ে উঠতে রাজনৈতিক স্বার্থ রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

অতীতে বিএনপি-জামাতের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল তার পটভূমিটা ছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান জামাতকে এবং জামাতের নেতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে পুনর্বাসিত করেন। জিয়া জামাতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। তখন থেকেই গড়ে ওঠে এই দুই দলের মধ্যে এক ঐতিহাসিক বন্ধন। তাদের রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার নিদর্শন নিয়ে ভাবলে অনেকে পৃথিবীর সকল স্বামী-স্ত্রীকেই হয়তো প্রশ্ন করবেন, ‘কি, হিংসে হয়?’

দিনে দিনে বিএনপি-জামাতের প্রেম বেড়েছে বৈ কমেনি। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেন। ২০০১ সালে জামাতের যুদ্ধাপরাধীদের সসম্মানে মন্ত্রী বানান তিনি। বিএনপি-জামাত জোট ২০০১ সালে একসঙ্গে হাতে হাত রেখে দেশও পরিচালনা করেছে। সুসময়-দুঃসময়ের সাথী তাঁরা। বড় পুরনো এই সম্পর্ক, ঠিক যেন স্বামী-স্ত্রীর পুরনো প্রেম। সময় খারাপ হোক, ভালো হোক বিএনপি ও জামাত কখনো একে অপরকে ছেড়ে যায় না।

জামাতের জন্য বিএনপির টান দেখে নিন্দুকেরা বরাবরই ঈর্ষান্বিত। সেই ঈর্ষার (!) কারণেই জামাতকে ত্যাগ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিএনপিকে চাপ দিয়েছে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ। চাপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মতো বহির্বিশ্বের শক্তিও। কিন্তু এত ঝড়ঝাপটার পরও জামাতকে ছাড়েনি বিএনপি। বিএনপি যেন সেই আদর্শ প্রেমিক, যাকে পিতার শাসন, মায়ের কাকুতি-মিনতি কোনো কিছুই প্রেমিকাকে বিয়ে করা থেকে বিরত রাখতে পারে না।

হাইকোর্টের রায়ে জামায়াতে ইসলামী এখন নিষিদ্ধ। যুদ্ধাপরাধের বিচারে কয়েকজন ডাকসাইটে নেতার মৃত্যদণ্ডে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দলটি। তবুও জামাতের প্রতি প্রেমে অবিচল বিএনপি। এজন্য অনেক ত্যাগ স্বীকারও করতে হয়েছে বিএনপিকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছে তারা। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা কি আর নিজের স্বার্থ দেখে! প্রেমিক প্রাণ দিতে পারে কিন্তু প্রেম ছাড়তে পারে না। তেমনি বিএনপি রাজনীতিতে অপাংক্তেয় হতে পারে কিন্তু জামাতকে ছাড়তে পারে না। শ্যাম রাখি না কূল রাখির প্রশ্নে বরাবরই শ্যামের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে বিএনপি।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন কিছুটা ভিন্ন। জামাত এখন বুঝতে পেরেছে, প্রেমিককে ধরে রাখলে প্রেমিকের ক্ষতিই কেবল করা হবে। জামাত বুঝতে পেরেছে, অপরাজনীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানো যাবে না, সুস্থ রাজনীতির ধারায় থেকেই কেবল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সম্ভব। তাই বাঁকা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না, ঘি তুলতে হলে সোজা আঙ্গুলেরই প্রয়োগ করতে হবে এই সত্যিটি বুঝতে পেরে বিএনপিকে মুক্ত করে দিল জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় ঐক্যে যাওয়ার অনুমতি দিল তাদের।

বিএনপির স্বার্থে জামাতের এই আত্মত্যাগ এক বড় প্রেমের উদাহরণ। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে। জামাতের এই আত্মত্যাগ আমাদের শরৎ বাবুর বলা সেই রোমান্টিক উক্তিটিই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিএনপিকে ভালোবেসে দলটিকে নিজের কাছ দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হলো বিরহী জামাত।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ