ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১০ ভুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ শুক্রবার, ১০:০০ এএম
রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১০ ভুল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বনেতার আসন পেয়েছেন। দেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা অবশ্যই সফল। দেশ পরিচালনায় দেশে বিদেশে তাঁর অসংখ্য অর্জন রয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসব অর্জনের পাশাপাশি ভুল কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে এবং তাঁর সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শেখ হাসিনার তেমনই কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরা হলো:

১. ১৯৮১ তে শেখ হাসিনার দেশে ফেরেন। আর জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর ১৯৮৬ সালের ৭ মে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর আওয়ামী লীগ সরকারের বড় ভুল হলো সেখানেই। কারণ ওই নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তখন ড. কামাল প্রার্থী হওয়ার উপযোগী ছিলেন না কোনোভাবেই। তিনি আওয়ামী লীগের সার্বক্ষণিক নেতাও ছিলেন না। তাঁর যোগ্যতা, অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ছিল বিস্তর। 

২. স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রার শুরুটা হয় শেখ হাসিনার হাত ধরে। অথচ স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের দেওয়া ১৯৮৬ সালের নির্বাচনেই অংশ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ওই সিদ্ধান্ত ছিল এক ঐতিহাসিক ভুল। অবশ্য সেই নির্বাচনের পুরোপুরি সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার একার ছিল না। ড. কামাল হোসেনের প্ররোচনাতেই শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

৩. আওয়ামী লীগ দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। অবৈধ ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে তারা রাজনীতি করেছে সবসময়। তাই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যৌথ নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। এরশাদের পতন ঘটাতে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগই চাপের মুখে পড়ে। কারণ বিএনপি অবৈধ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করতো। সেই বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেই যেন তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। শেখ হাসিনার সরকার বিএনপিকে পুনর্বাসিত না করলে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এত বড় শক্তির উত্থান ঘটতে পারতো না। এর মাশুল আওয়ামী লীগ অনেক দিয়েছে, এখনো দিতে হচ্ছে।

৪. শেখ হাসিনার অন্যতম ভুল ছিল ১৯৯১ এর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কৌশলগত অবস্থানের অনেক ত্রুটি ছিল। এর মাশুলও দিতে হয়েছে তাদের। শেখ হাসিনার সরকার প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনোযোগী ছিল না। আদর্শ নেতা হিসেবে অনেককেই তিনি অনেক বিশ্বাস করতেন, তারা পরবর্তীতে তাঁর বিশ্বাস ভঙ্গ করে বসে। এছাড়া সেসময় নির্বাচনের জন্য বামদের মনোনয়ন দেওয়ার ফলে সবমিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফলে অপ্রত্যাশিত ভরাডুবি হয়।

৫. আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োজিত করা। কারণ মনে করা হয় আওয়ামী লীগের নীতি আদর্শের সঙ্গে শাহাবুদ্দিনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলেন না। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের প্রিয়পাত্র হন শাহাবুদ্দিন। এটিই প্রমাণ করে কোন মতধারার ছিলেন তিনি।

৬. ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর কিছু এমপি-নেতাদের অপকর্ম-দুষ্কর্ম, দুর্নীতি শেখ হাসিনা শক্ত হাতে দমন করতে পারেননি। এর ফলে দেশজুড়ে জনরোষ সৃষ্টি হয়। পদ্মাসেতু প্রকল্প, পার্বত্য শান্তিচুক্তি প্রকল্প, বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতার মতো উদ্যোগগুলো হাতে নেওয়ার পরেও মুষ্টিমেয় নেতাকর্মীর জন্য আওয়ামী লীগ কলঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শেখ হাসিনার সরকার তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

৭. যাদেরকে শেখ হাসিনা বিশ্বাস করতেন, কাজে ভরসা করতেন তাদের কাছ থেকেই বিশ্বাসভঙ্গের বেশি নজির দেখেছেন তিনি। ২০০১ এর নির্বাচন তার বড় একটি উদাহরণ। নির্বাচনের আগে তাঁর সরকার ক্ষমতায় থাকতে নির্বাচনের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি করলে। শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। কিন্তু যাদের মাধ্যমে এগুলো করলেন, সেই প্রশাসন আর নীতিনির্ধারকরাই নির্বাচনকে ভিন্নখাতে নিয়ে গেলেন। আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করে তাদেরই নেতাদের ধরপাকড়, সচিব বদল করা, বিভিন্নভাবে ভীতির সঞ্চার করা হলো। ফলে বিশ্বাস আর পরিস্থিতি একদমই বদলে গেলো।

৮. ২০০৬ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় ঘোষণা দেয় যে তৎকালীন সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হলে তারা নির্বাচনেই অংশ নেবেন না। আর তারপরেই ইয়াজউদ্দিন আহমেদ স্বঘোষিত প্রধান হলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। কিন্তু ইয়াজউদ্দিনকে মেনে নেওয়া এবং তাকে সময় দেওয়া, তাঁর অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা একদমই ভুল ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

৯. আওয়ামী লীগ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। সেখানে ২০০৩ এ খেলাফত মজলিসের মতো দলের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়ার বিষয়টি অনেকেরই দৃষ্টিকটু মনে হয়। এমনকি দলের দুঃসময়ে যারা সবসময় সঙ্গে থেকেছে, তারাও এই চুক্তিকে খুব একটা ইতিবাচক হিসেবে নিতে পারেনি। অর্থাৎ দলের নীতিকে এই চুক্তি অনেকটাই স্খলন করে দেয়।

১০. দলের সাম্প্রতিক ভুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এস কে সিনহার মতো দুর্নীতিবাজকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। তাঁর বিদেশে পাড়ি জমানো, পদত্যাগ, বই প্রকাশসহ বিভিন্ন দুর্নীতির কাহিনী নিয়ে রাজনীতির মঞ্চ এখন মোটামুটি সরব। আর তেমন একজন লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করা তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তো উঠেছেই। মূল কথা হলো, দুর্নীতিবাজরা কখনো আস্থাভাজন বা বিশ্বাসভাজন হয়না, সে দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।   


বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/জেডএ