ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নির্বাচন প্রশ্নে বিভক্ত বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার, ০৬:০০ পিএম
নির্বাচন প্রশ্নে বিভক্ত বিএনপি

নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপির সিদ্ধান্ত দলগতভাবে গৃহীত হবে নাকি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গৃহীত হবে তা নিয়ে দলটিতে বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপি ভেঙে পড়তে বলেও আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হবার পর থেকেই বিএনপির কিছু নেতার রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সিনিয়র নেতা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান এবং তরুণদের মধ্যে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অস্বাভাবিক নীরবতা অবলম্বন করছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের এমন আচরণে বিএনপির মধ্যেই বিভিন্ন প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে নিয়মিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির মিটিং হত। স্থায়ী কমিটির মিটিং এর মাধ্যমেই বিএনপির কর্মপন্থা ও কৌশল বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হতো। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে, কার মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে? এসব নিয়ে বিএনপির মধ্যেই নানা রকম কথা হচ্ছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির তিন প্রভাবশালী নেতা দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদই বর্তমানে বিএনপির সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই তিনজনের সিদ্ধান্তেই বিএনপি ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করেছে।

এতদিন ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক জিয়ার যোগাযোগের যোগসূত্র ছিলেন বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁকেও গতকাল আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে তারেকের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ নেই। ফলে কোনো কর্মসূচির ব্যাপারেও তারেক বিএনপিকে কোনো নির্দেশ দিতে পারছে না। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছাড়া বিএনপিতে তারেকের সঙ্গে অন্যান্য যেসব নেতা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁদের মধ্যে হাবীবুন্নবী খান সোহেলের মতো নেতারাও একে একে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। এছাড়া একাধিক মামলা মাথায় নিয়ে সব ধরনের কার্যক্রম থেকে দূরে সরে আছেন চৌধুরী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। যার ফলে তারেক জিয়ার সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ শিথিল হয়ে গেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারেকেরও এখন তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

এছাড়া খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ শিথিল হয়ে গেছে বিএনপির। এমন অবস্থায় বিএনপি চালাচ্ছেন তিন নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিন নেতা এককভাবেই। ফলে সরকার যখন নির্বাচনের মহাসড়কের দিকে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে তখন বিএনপির মধ্যেই নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ক্রমশ ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে বিএনপির তিন নেতা যখন আশাবাদ ব্যক্ত করছেন তখন তৃণমূল ও মধ্যস্তরের নেতারা প্রকাশ করছেন ক্ষোভ এবং হতাশা।

বিএনপির মধ্যস্তরের নেতা ও তৃণমূলের কর্মীরা মনে করছেন নির্বাচন চলে আসলেও আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে না পারা বিএনপির এক ধরনের ব্যর্থতা এবং আন্দোলনের ব্যাপারে তিন নেতার কোনো উৎসাহ নেই। বিএনপির এই নেতাকর্মীরা ধারণা করছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির একটি অংশকে সরিয়ে এই তিন নেতা নির্বাচনে যাবেন। এই নিয়ে অসন্তুষ্ট তাঁরা।

বিভিন্ন কার্যকলাপে পরিষ্কার হয়েছে, বিএনপির তিন নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ স্পষ্টতই গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন। আবার বিএনপিরই একটি অংশ নির্বাচনে যেতে অনিচ্ছুক। তাই যখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে তখনই নির্বাচনের যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বিএনপি ভাঙ্গন অনিবার্য বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে ঐক্যফ্রন্ট কী সিদ্ধান্ত নিল না নিল সেটা বিএনপির দেখার বিষয় না। দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্ববাধয়ায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া বিএনপি কোনো ভাবেই নির্বাচনে যাবে না বলে জানান তিনি। গয়েশ্বর বলেন, খালেদা জিয়াকে নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে যাবে।

কিন্তু বিএনপির বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তিন নেতার অন্যতম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, নির্দলীয় স্রকারের অধীনে নির্বাচন চাই। কিন্তু আমাদেরকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। আমরা এখন একটা ঐক্যফ্রন্টে আছি আর ফ্রন্ট থেকে সাত দফা দাবি দেওয়া হয়েছে। সাত দফার ভিত্তিতেই আমরা আন্দোলন করছি। আর আমাদের নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জোটগত ভাবেই হবে।’ এ সময় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে, কী করবেন, মওদুদকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বিষয়টি দেখা যাবে।

একটি সূত্র বলছে, গতকাল গণফোরামের কার্যালয়ে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশল, নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হয় এবং কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। সভা সূত্রে জানা গেছে, ঐক্যফ্রন্টের সভায় নির্বাচনী কৌশল, আসন বন্টন প্রস্তাবনা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাসদের আ স ন আব্দুর রবকে। আর নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকার পরিচালনার ঘোষণাপত্র ও নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির।

সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনমুখী মনোভাব নিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এগুচ্ছে। কিন্তু বিএনপির একটি অংশ খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় ছাড়া নির্বাচনে যেতে ইচ্ছুক নয়। এই উদ্দেশ্যে এখন আলাদাভাবে বৈঠক করছেন মির্জা আব্বাসসহ প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে বিএনপির সঙ্গে জড়িত দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিতে বিদ্রোহের আশঙ্কা অমূলক নয় ধারণা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপি ভেঙে যায় কী না সেটাই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ