ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ছোট দলের বড় চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ নভেম্বর ২০১৮ রবিবার, ০৯:০০ পিএম
ছোট দলের বড় চাপ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণার মধ্যে দিয়ে নিশ্চিত হলো এবার আর ২০১৪ এর মতো নির্বাচন হবে না। সব দলের অংশগ্রহণের একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে এবার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই নির্বাচনে এসেছে। তবে দুই দলের কোনোটিই একক ভাবে নির্বাচন করছে না। জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচন করছে দুটি দলই। আর এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু আওয়ামী কাদের নিয়ে নির্বাচনে যাচ্ছে তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আগে থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ছিল। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ১৪ দলের বাইরেও অন্যান্য দল নিয়ে জোটের অবয়ব আরও বড় করতে চাইছে আওয়ামী লীগ। এই মধ্যে জামাত এবং ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের ছোট ছোট দলগুলো নিয়ে বড় একটি জোট করেছে বিএনপি। তাই আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের মতে, আওয়ামী লীগও ১৪ সহ অন্যান্য দলগুলো নিয়ে জোটের আকার যত বড় করতে পারবে ততই শক্তিশালী হবে অবস্থান। আর এ কারণেই নাজমুল হুদার তৃণমূল পার্টিসহ বাম অনেক দলকে সঙ্গে নিয়ে জোট বড় করার উদ্যোগ নিয়ে আগাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

জোট বড় হলে যেমন জোর বাড়ে তেমনি সমস্যারও আমদানি হয়। অনেক দল নিয়ে জোট করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপি উভয় দলই চাপে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট ছোট দলগুলো ভোটের বাজারে তাদের কদর বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে। ছোট দলগুলোর উপলব্ধি হলো, আওয়ামী লীগ বিএনপি উভয়ই নির্বাচন করছে। আর উভয় দলেরই একার পক্ষে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা আছে। আর শঙ্কা কাটিয়ে নির্বাচনে জয়ের পাল্লা ভারি করতেই ছোট দলগুলোকে তাদের কাছে ভিড়াতেই হবে। সুযোগ বুঝে ছোট দলগুলোও তাদের রেট বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এই রেট হলো নির্বাচনের আসন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু সর্বোচ্চ ৫ টি সিট দাবি করতেন। কিন্তু এখন রেট বাড়িয়ে ইনু সিট চাচ্ছেন অন্তত ১৫টি। এসব আসন নিয়ে তারা জিততে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা আছে। আবার তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করবে নৌকা প্রতীক নিয়ে। এদিকে ১৪ দলের আরেক শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি কিছুদিন আগেও ৫ টি সিট দাবি করতো। এখন তা বাড়িয়ে ১৫ তে গেছে। জাসদের আরেক ভগ্নাংশ শরিফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন। তারা আওয়ামী লীগের কাছে কিছুদিন আগেও ৩ টি আসন দাবি করতো। এখন বলছে তাদের অন্তত ১০ টি আসন ছেড়ে দিতে হবে। আওয়ামী লীগের জোট করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে (জাপা) নিয়ে।

আওয়ামী লীগের মতে, শেষ পর্যন্ত বিএনপি যদি নির্বাচনে থাকে এবং নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের জন্য তাদের জাতীয় পার্টিকে নেওয়ার বিকল্প নাই। জাপাও বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। এতদিন ধরে জাতীয় পার্টির সঙ্গে ৪০-৫০ আসন নিয়েই দরকষাকষি হচ্ছিল। এখন জাতীয় পার্টি চাচ্ছে ৭০ আসন। এর কয়টিতে তারা জিততে পারবে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আবার, ৭০ আসন দিলেও যে জাপা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সব পেলেও জাপা যে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জোটেই এর কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ জাতীয় পার্টির অতীত ইতিহাসই বলে তারা বাতাস বুঝে চলে। নির্বাচনের বাতাস যেদিকে যায়, সুযোগ বুঝে সেদিকেই যায় জাপা। তাই আসন ছাড়ের পরও জোটে জাপাকে নিয়ে বিপদ রয়েই যায়।

জোটের শরিক নিয়ে আওয়ামী লীগ যেমন বিপদে আছে, তেমনি বিএনপির বিপদ কম না। বিএনপির জোটের শরিকরা ভালোই বুঝতে পেরেছে, দলটিকে টিকে থাকতে হলে জোটের বিকল্প নাই। একা বিএনপি নির্বাচনে কিছুই করতে পারবে না। যে দল অন্য দলের নেতাকে ভাড়া করে নেতা বানানোর জন্য, সেই দল যতই জনপ্রিয় হোক একা নির্বাচন করার মতো সক্ষমতা নাই। বিএনপির বিপদ বুঝে তাদের জোটের শরিকরাও রেট বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি আলোচিত জোট ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক ও বড় দল বিএনপি। ঐক্যফ্রন্টের দলগুলো মূলত এক ব্যক্তি নির্ভর দল। এক ব্যক্তি নির্ভর এসব দলের জাতীয় নির্বাচনে দু-তিনটির বেশি আসন পাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু এরপরও ঐক্যফ্রন্টের ‘ওয়ান ম্যানে’র দলগুলো একের পর এক দাবি করে চলেছে। আজই ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়েছেন। ১০ জনের তালিকার ব্যক্তিদের বিএনপির মার্কায় নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবি ড. কামালের। এছাড়াও গণফোরাম থেকে আরও ১০ জনের আসন দাবি করেছেন তিনি। এদিকে ঐক্যফ্রন্টের আরেক দল নাগরিক ঐক্য। দলটির নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না ছাড়া কোনো নেতাকর্মী বা সমর্থক কখনো দেখা যায়নি। মান্না ছাড়া নাগরিক ঐক্যের দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকে মানুষ চেনেও না জানেও না। অথচ মাহমুদুর রহমান মান্নাও আজ ১০ জনের আসন চেয়েছেন। জাসদের এক ভগ্নাংশ জেএসডি, যার নেতৃত্বে আ. স. ম. আবদুর রব। তিনি ও তাঁর স্ত্রী তানিয়া রবকে ছাড়া দলটির কাউকেই কখনো দেখা যায় না। অথচ আবদুর রবও দিয়েছেন ১৫ জনের নামের তালিকা। বিএনপি আরেক ঘর ২০ দলীয় জোটের শরিকরাও কম যান না। মান ভাঙ্গিয়ে ঘরে ফেরানো এলডিপির কর্নেল অলি আহমেদ এখন ১৫ টি আসন দাবি করেছেন। অন্যান্য দলগুলো কোনোটিই পাঁচটি কম আসন চায়নি। আর প্রতীক ও দলহীন জামাতকে ১২ টি আসন ছেড়েই দিতে হবে বিএনপির।

জোটের আবদার পুরোপুরি পূরণ করতে গেলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ বিএনপি নিজেদের আসন নিয়েই সংকটে পড়ে। জোটের সব শরিককে খুশি করলে আওয়ামী লীগের নিজের আসন থাকবে ৭০ টি। একই ভাবে বিএনপি সব শরিককে খুশি করলে আসন থাকবে মাত্র ৫০টি। এখন ভোটের রাজনীতির এই পরিবর্তিত বাজারে শরিকদের তুষ্ট রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ শরিকদের অসন্তুষ্ট করলে এর ফলাফল পড়বে সরাসরি ভোটের ওপর। তাই কেউ চায়না শরিকদের অসন্তুষ্ট করতে। আবার শরিকদের সন্তুষ্ট করতে গেলে নিজ দলেই থাকে না। এমন টানাটানির মধ্যে দলগুলো কীভাবে শরিকদের খুশি রাখবে সেটাই বড় বিষয়।

আবার আওয়ামী লীগ বিএনপি উভয় দলের মধ্যেও তো চাপ আছে। দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, যাঁরা এত বছর ধরে এলাকায় কাজ করছে, খরচ করছে তারাও তো মনোনয়ন চায়। তাদের বাদ দিয়ে জোটের শরিকদের আসন দিলেও তারাও নিশ্চয় ছেড়ে কথা বলবে না। দলগুলোর জোটের জটিল হিসেব নিকেশ কীভাবে মিটবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ