ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিম্নমুখী জনপ্রিয়তায় শরিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০৮:০০ পিএম
নিম্নমুখী জনপ্রিয়তায় শরিকরা

আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন মোটামুটি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। জাতীয় সংসদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে মনোনয়ন বিন্যাস করছে দলটি। কিন্তু বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় শরিকদের নড়বড়ে অবস্থান আওয়ামী লীগের জন্য দুশ্চিন্তা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশীয় রাজনীতিতে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ১৪ দলীয় জোট এবং আরেকটি সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল নিয়ে মহাজোট । আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দুই জোটের শরিক দলের প্রার্থীদের কেউই শক্তিশালী অবস্থানে নেই যা নিয়ে আওয়ামী লীগ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে।

এবার আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে জনমতকে। একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় যার জনপ্রিয়তা বেশি তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অনুযায়ী মনোনয়ন দিতে গিয়ে শরিক দলগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকে বিবেচনা করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে যাঁরা বর্তমানে নির্বাচিত এমপি হিসেবে আছেন তাঁদের প্রত্যেকের অবস্থাই নাজুক। আওয়ামী লীগ পরিচালিত জরিপে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, এই নেতাদের জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় তো বাড়েইনি বরং কমেছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় শরিক দলের হেভিওয়েট নেতাদের অবস্থান সবচেয়ে শোচনীয় বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

এই হেভিওয়েট নেতাদের মধ্যে অন্যতম আওয়ামী লীগের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। মেনন গত নির্বাচনে ঢাকা- ৮ আসন থেকে মনোনয়ন পান এবং বিজয়ী হন। কিন্তু সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, মেনন যে শুধু এবার জনপ্রিয়তার দৌড়ে পিছিয়ে আছেন তাই নয়, তিনি এই আসনের আলোচিত প্রার্থীও নন। একাদশ নির্বাচনে যদি তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে তাঁর সম্বল হবে শুধু নৌকা প্রতীক। নৌকা প্রতীক না পেলে এই আসনে তাঁর জামানত থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির আরেক নেতা ফজলে হোসেন বাদশা রাজশাহী- ২ আসনের বর্তমান এমপি। তিনি ছাত্রজীবনে রাকসুর ভিপি ছিলেন। রাজশাহীতে এক সময় তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু সেদিন এখন অতীত। বাদশার জনপ্রিয়তায় এখন ভাটার টান। টানা দুই মেয়াদে এমপি থাকার পরও ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতার জনপ্রিয়তা বাড়েনি বরং স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে নানারকম কোন্দল ও গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়ে নিজ এলাকায় তাঁর অবস্থান এখন সংশায়চ্ছন্ন।

একই অবস্থা আওয়ামী লীগের আরেক শরীক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদেরও। ২০০৮ সালে জাসদ যখন ১৪ দলে যোগ দেয় তখন হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্ব একটিই জাসদ ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তনে জাসদ ভেঙে গিয়ে বর্তমানে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে একটি এবং হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে আরেকটি জাসদের সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ভোটের মাঠের জনপ্রিয়তায় দুই জাসদের হেভিওয়েট প্রার্থীদের অবস্থাই খারাপ। এর মধ্যে কুষ্টিয়া- ২ আসনের এমপি হাসানুল হক ইনু এলাকায় জনপ্রিয়। কিন্তু এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা করছেন আওয়ামী লীগেরই একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ওই যুগ্ম সম্পাদক তাঁর ভাইকেও ওই আসনে মনোনয়ন পত্র কিনিয়েছেন। জরিপে দেখা গেছে, তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করার পর ইনু অনেকবার এলাকায় গেছেন এবং ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। কিন্তু তারপরও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটার টান কাটেনি । সব মিলিয়ে তাই তথ্যমন্ত্রীর আসনও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।

জাসদের আরেক নেত্রী বেগম শিরীন আখতার গতবার ফেনী- ১ আসন থেকে মনোনয়ন পান এবং এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু বর্তমানে এলাকায় তাঁর অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতাকর্মীদের তুলনায় জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেক পেছনে আছেন তিনি।

জাসদ বিভক্ত হওয়ার পর শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদের আরেক নেতা মইন উদ্দীন খান বাদল চট্টগ্রাম- ৮ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তবে শারীরিক অসুস্থতা ও অন্যান্য নানা কারণে এখন এলাকায় তাঁর কর্মী বাহিনী নেই। একথা ঠিক যে, এলাকায় মইন উদ্দীন খান বদলের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আছে। কিন্তু একক ক্ষমতায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মতো ক্ষমতা তাঁরও নেই।

জাসদের এই অংশের আরেকজন নেতা নাজমুল হক প্রধান বর্তমানে পঞ্চগড়- ১ এলাকার এমপি। কিন্তু প্রধানের নির্বাচনী এলাকায় জাসদ আওয়ামী লীগের কাছে কোণঠাসা। এছাড়া এলাকায় বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁর জনপ্রিয়তা তো বাড়েইনি বরং কমে এসেছে বলে আওয়ামী লীগের জরিপে উঠে এসেছে।

উপরে উল্লেখিত নেতারা সবাই ১৪ দলীয় জোটের অংশ। এছাড়া আওয়ামী লীগ মহাজোটের নেতৃত্বেও রয়েছে। গত ১০ বছরে মহাজোটের প্রধান দল জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেও সরকারের সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে। এই বাস্তবতা জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া রংপুর অঞ্চল ও সিলেটের কিছু অঞ্চল ছাড়া এরশাদের জাপার কোথাও কোনো অস্তিত্ব সেরকমভাবে নেই। ফলে গত এক দশকে এরশাদের জাপা এক রকম আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে বলা যায়। বিশেষ করে সংসদে জাতীয় পার্টি সরকারের চেয়ে আলাদা কোন অবস্থান নিতে না পারা, সরকারের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক নিয়ে অস্পষ্টতা, জাপা সভাপতি এরশাদের বিভিন্ন ইস্যুতে একেকবার একেকরকম অবস্থান এবং পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে সর্বোচ্চ ১০০টি ও সর্বনিম্ন ৫০টি আসন দাবি করেছে। অথচ সর্বশেষ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে জরিপ করা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, জাপার প্রার্থীদের ১৫ থেকে ২০টির বেশি আসনে জয়ের সম্ভাবনা নেই।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবার ভাগ-বাটোয়ারার ভিত্তিতে শরিকদের আসন দিতে আগ্রহী নন। তিনি চান, এবার শরিকদের আসন দেওয়া হবে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। যাঁরা নিজ এলাকায় জনপ্রিয়, যাঁরা নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারবেন এমন প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতির এমন সিদ্ধান্তে অনেক শরিক দলই সম্ভবত বিপদে পড়তে যাচ্ছেন।

গত এক দশকে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়ে হয়েছে আকাশচুম্বী। কিন্তু এই এক দশকের পুরো সময়টাতে ১৪ দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকলেও ওই দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা ক্রমশ নিম্নমুখী। এত সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরও এবং এত দীর্ঘ সময় জনগণের সেবা করার সুযোগ পাওয়ার পরও কেন শরিক দলগুলোর হেভিওয়েট প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা কমেছে তা নিয়ে আওয়ামী লীগ তো বটেই শরিকরাও উদ্বিগ্ন।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ