ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তবুও কেন নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮ শুক্রবার, ০৯:০০ পিএম
তবুও কেন নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি?

ছয় মাস আগে অনেকেই কল্পনা করতে পারেনি বিএনপি এবার নির্বাচনে যাবে। কার্যত গত পাঁচ বছর ধরে বিএনপি যে সকল দাবি-দাওয়া জানিয়ে আসছিল, তা মানা হয়নি একটিও। কোন দাবি অর্জন ছাড়াই এবারের নির্বাচনে যাচ্ছে দলটি। বিএনপি তার রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিনতম সময়ের মধ্য দিয়েই এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। একদিকে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দশ মাস ধরে কারাবন্দি, অন্যদিকে দলের দ্বিতীয় নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন লন্ডনে পলাতক এবং দু’টি মামলায় যাবজ্জীবন ও সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত। ২০১৪ তে নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। বিএনপির নির্বাচন বর্জনের মূল কারণ হিসেবে বিএনপির নীতি নির্ধারকরা বলেছিল, নির্দলীয় নিরেপক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না তারা। যদিও ঐ জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রতিটিতেই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল বিএনপি।

বিএনপি এবার শেষপর্যন্ত নির্বাচনে কেন গেল এটাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মোটা দাগের কয়েকটি কারণ পেয়েছেন। সেগুলো হলো:

১. অস্তিত্ব রক্ষা : ২০১৪ তে নির্বাচনে না যাওয়া যে বিএনপির ভুল ছিল তা বিএনপি নেতারা এখন প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছেন। ঐ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণেই আজ দলের এই সংকট বলে মনে করছেন তারা। এমন আর একটি ভুল করতে চান না তারা, বরং নির্বাচনের মাঠে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে নিজেদের জনপ্রিয়তার প্রমাণ রাখতে চান। বিএনপির অনেক নেতাই জানেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করা অত্যন্ত কঠিন হবে তাদের জন্য। এমনকি ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে কারচুপিসহ প্রশাসনও সরকারের পক্ষে কাজ করবে। তবুও তারা এবার নির্বাচনে যাচ্ছেন। কেননা বিএনপির নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প পথ নেই তাদের। কেননা এবারও নির্বাচন বর্জন করলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে তাদের।

২. নাটকীয় ফলাফলের আশা : বিএনপি মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দশ বছর ধরে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। এতো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রভাবের সৃষ্টি হয়েছে, পরিবর্তন চায় অনেকেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোন সরকার পর পর দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনার পর তৃতীয়বার আবার ক্ষমতায় আসার কোন পরিসংখ্যান নেই।  তাই এবার জনমত পরিবর্তনের পক্ষেই বলে বিএনপি নেতারা মনে করছেন। এজন্য নির্বাচনে যাবার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে দলটি।

৩. আন্দোলনের অক্ষমতা : ২০১৩ সাল থেকে বিএনপি নির্দলীয় নিরেপক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিল। সেই দাবিতে টানা অবরোধ দিয়েছিল দলটি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ তে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। এই অবরোধ পালনের ফলে দলটির অধিকাংশ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা হয়েছিল, সহিংসতার অভিযোগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন অনেকেই। যে কারণে রাজপথের আন্দোলন জমাতে ব্যর্থ তারা। বিশেষ করে ২০১৪ তে ঢাকার বাইরে অল্প কিছু আন্দোলন হলেও ঢাকার মধ্যে কোন আন্দোলনেই দাঁড়াতে পারেনি বিএনপির নেতা-কর্মীরা। খোদ বিএনপির নীতি নির্ধারকরাই জানেন, এবারও যদি তারা নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনের ডাক দেন, তবে তা গতবারের মতো ব্যর্থই হবে। কাজেই আন্দোলনের ব্যর্থতাই তাদের নির্বাচনের দিকে প্ররোচিত করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

৪. আন্তর্জাতিক চাপ : এবারের নির্বাচনে যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তার জন্য আগে থেকেই আন্তর্জাতিক মহলের একটি চাপ ছিল দলটির উপর। বিশেষ করে প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ভারত চাইছিল যে কোন পরিস্থিতিতে এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক বিএনপি। কেননা নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপক্ষ হবে না এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য ছিল না তাদের কাছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতেই চাপেই এবার নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি এমন গুঞ্জনই রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

৫. খালেদা জিয়ার মুক্তি : বিএনপির নীতি নির্ধারকরা মনে করছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে যদি তারা জয়লাভে ব্যর্থও হয় তবে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে তাদের আবির্ভাব নিশ্চিত। এক্ষেত্রে সকারের সঙ্গে দেন-দরবার, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও সুগম হবে।

মূলত এই পাঁচ কারণেই এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বিএনপি। যদিও বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, নির্বাচনের মাঠ এবার বিএনপির পক্ষে থাকবে। কেননা দেশের জনগণ এখন পরিবর্তন চায়। এবারের নির্বাচনে নাটকীয় ফলাফল করবে বিএনপি। কিন্তু ভঙ্গুর শক্তি নিয়ে বিএনপি কতটুকু নাটকীয় ফলাফল করবে তা বুঝা যাবে ৩০ ডিসেম্বরের পর।

বাংলা ইনসাইডার/বিকে