ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

প্রগতিশীল রাজনীতির শেষ সুযোগ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার, ১০:০০ পিএম
প্রগতিশীল রাজনীতির শেষ সুযোগ?

স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলনীতি ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের। এই নীতিতেই বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী এবং রাজাকারদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করা হয়। তবে গত এক দশকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অনেক কাজ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন হয়েছে। মৌলবাদীদের শীর্ষকুল জামাতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ। মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে এত কিছু করার পরেও এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে বিগত সময়ের চেয়ে ধর্মীয় দলগুলো ব্যাপকহারে অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচনে এত বেশি ধর্মীয় দলের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অশনি সংকেত হিসেবে মনে করছেন অনেকে।

যে কোনো দেশের রাজনীতিতে লক্ষ করলে দেখা যায়, সে দেশে গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির যখন উত্থান হয়, তখন কট্টরপন্থী ধর্মীয় দলগুলোর প্রভাব এমনিতেই কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কথা বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিন এখানে বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকার ফলে কট্টরপন্থী দলগুলো তেমন ভালো অবস্থানে আসতে পারেনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উল্টো চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর জয়জয়কার অবস্থা। আসন্ন  নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন ২৯৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ২৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। মুসলিম লীগ ৩৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ওলামায়ে ইসলাম দিয়েছে ১৫টি আসনে প্রার্থী। ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ দিয়েছে ২৮টি আসনে প্রার্থী। ইসলামী ঐক্যজোট ৩২ টি আসনে, বাংলাদেশ ইসলাম ফ্রন্ট ২১ আসনে, খেলাফতে মজলিস ১২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়াও জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশে ২৬টি আসনে নির্বাচনে লড়বে। বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন আওয়ামী লীগের জোটে ২টি আসন পেয়েছেন। যার ফলে দেখা যাচ্ছে এবারের সংসদ নির্বাচনে এবং সংসদে বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো বিগত সময়ের চেয়ে ভালো একটা অবস্থানে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়। যখন বিএনপির প্রধান নেতা খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে এবং বিএনপির আরেক নেতা তারেক রহমান পলাতক থাকায় নেতৃত্বের অভাবে টালমাটাল বিএনপি। বিরোধী দল নেই বললেই চলে। এ কারণে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বামপন্থীদের জন্য উর্বর একটা সময় ছিল নিজেদের দল গোছানোর। বামপন্থী দলগুলোর অনেক ইস্যু থাকা সত্ত্বেও তেমন কোনো আন্দোলন সংগ্রাম করতে পারেনি। নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও মজবুত করতে পারেনি। অন্যদিকে ইসলামী দলগুলোর অবস্থা অনেক রমরমা। তারা ঠিকই নিজেদের দলকে গুছিয়ে নিয়েছে ভিতরে ভিতরে। যার প্রমাণ গত কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খেলাফতে আন্দোলন তৃতীয় স্থানে ছিল ভোট পাওয়ার বিবেচনায়। 

বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে এদের একটি অংশ আবার বিএনপি-জামাত জোটের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, যেমন ড. কামালের গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, অ স ম আব্দুর রবের জাসদসহ বেশ কিছু দল। এই দলগুলো মনে করা হতো, মধ্যপন্থী উদার গণতান্ত্রিক দল এবং মৌলবাদী চিন্তার বিপরীতের রাজনৈতিক দল। সারা জীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কথা বলে এখন সেই দলগুলোই যুদ্ধাপরাধী জামাত যেখানে আছে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নির্বাচন করছে। আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে বামপন্থী দলগুলো আছে তাদেরও এককভাবে আওয়ামী লীগ ছাড়া তেমন কোন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আওয়ামী লীগ ছাড়া এই দলগুলো অচল। এই দুই জোটের বাইরে যে বামপন্থী দলগুলো আছে তাঁদের অবস্থাও করুন। তাঁরা এককভাবে কিছু করার মতো দলীয় অবস্থানে নেই। সকল বামপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দল এক হয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যে লড়াই করবে সেই মানসিকতাও নেই তাদের। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চায় আওয়ামী লীগ একাই থাকছে মাঠে। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেতনার বাস্তবায়নে শুধুই কি আওয়ামী লীগের একার কাজ। দেশে যারা বামপন্থী রাজনীতি করে, যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা বলে তাঁদের কি কোনো দায়িত্ব নেই? এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর এত বেশি অংশগ্রহণ করা এবং বাংলাদেশের মধ্যপন্থার উদার গণতান্ত্রিক দলগুলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে যোগ দেওয়া অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য একটা অশুভ সংকেত বলেই ভাবা যায়। ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করা এইসব দলগুলো এতগুলো আসনে প্রার্থী দিতে পারলেও বামপন্থী দলগুলো কেন হাতেগোনা কিছু আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ধর্ম ভিত্তিক দলগুলো ফুলে ফেঁপে উঠলেও বামপন্থীরা কেন শক্তিশালী হতে পারছেন এমন প্রশ্ন করাই যায়। 

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো একতাবদ্ধ হতে পারলেও দেশের বামপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো নানা মান অভিমানে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগকে ভোটের রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ইসলামপন্থী কিছু দলকে কাছে টানতে হয়। তবে দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তি এক জায়গায় থাকলে, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চার ক্ষেত্রে একতাবদ্ধ থাকলে বর্তমানে দেশে ধর্মীয় রাজনীতির এমন উত্থান যে ঘটতো না তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। এবারের নির্বাচনে যেভাবে ধর্মীয় দলগুলোর অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে এবং ধর্ম নিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের দলগুলো যদি এক কাতারে না আসতে পারে তাহলে এবারের নির্বাচনের মাধ্যমেই হয়তো দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মৃত্যঘণ্টা বাজবে এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাংলা ইনসাইডার/আরকে/জেডএ