ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এমপিদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ১০ নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার, ০৭:৫৯ পিএম
এমপিদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ১০ নিষেধাজ্ঞা

শুধু মন্ত্রীরাই নন, এমপিরাও প্রধানমন্ত্রীর নজরদারির আওতায় এসেছেন। আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারের যেন কোন ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, সাধারণ মানুষের কাছে যেন সরকার এবং দল বিতর্কিত না হয়, এ জন্য শুরু থেকেই সতর্ক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর প্রথম বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, মন্ত্রীরা কঠোর নজরদারির মধ্যে আছে। তবে শুধু মন্ত্রীরা নন, এবার কঠোর নজরদারির মধ্যে আনা হচ্ছে এমপিদেরও।

গত ১০ বছরে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করছেন, শুধু মন্ত্রীদের স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলেই হবে না। এমপিদেরও স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক এমপি হয়েছেন। একজন এমপির কারণে পুরো দলের ভাবমূর্তির বদনাম হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী তার ঘনিষ্ঠদের বলেছেন। এজন্য এমপিরা এবার অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবেন।

আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমপিদের জন্য ১০টি বিষয়ে সুস্পষ্ট কঠোরতা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।

(১) টেন্ডারে হস্তক্ষেপ: স্থানীয় পর্যায়ে টেন্ডার বা সরকারী কাজে অযাচিতভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না এমপিরা। প্রায়ই ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাকে টেন্ডার দেয়া হবে, কাকে দেয়া হবে না সেগুলোতে হস্তক্ষেপ করেন এমপিরা। এর ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা টেন্ডার পান না এবং উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হয়।

(২) সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ: আওয়ামী লীগের আমলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আকার বড় হয়েছে। এর পরিধিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ‍মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন রকম সামাজিক সহায়তা বা অতি দরিদ্র মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনা হচ্ছে। বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ ও সহায়তা অনেক সময় এমপিদের হস্তক্ষেপের কারণে সঠিক লোকের কাছে যায় না। প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা বা বয়স্ককে না দিয়ে টাকা এমপিদের পছন্দের লোকদের দেয়া হয়। এর ফলে এলাকায় আওয়ামী লীগের বদনাম হয় এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এমপিদের ইতিমধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ যেন প্রকৃত উপকারভোগীরা পায়। পক্ষপাতহীনভাবে বিষয়টি তদারকি নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে।

(৩) উন্নয়ন কাজে হস্তক্ষেপ: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রায় সময়ই অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় এমপিরা। এমপিরা ঢাকা এসে সচিবালয়ে গিয়ে নিজেদের সুবিধামতো উন্নয়ন পরিকল্পনায় ও প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করেন। গত বছর দেখা গেছে, একটি রাস্তার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এসে পরিবর্তন করে নিয়ে গেছেন যেন এমপির বাসার পাশ দিয়ে রাস্তা যায়। উন্নয়নের এমন মাস্টারপ্ল্যানে হরহামেশাই হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একনেকের সভায় এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গুটিকয়েক নেতার সুবিধার জন্য কোন উন্নয়ন পরিকল্পনার মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন করা হবে না।

(৪) নিয়োগ বাণিজ্য: গত ১০ বছরে এমপিদের বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ ছিল নিয়োগ বাণিজ্য। নতুন সরকারের আমলে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। নিয়োগের ব্যাপারে এমপিদের পক্ষ থেকে কোন ডিও লেটার দেয়া যাবে না। যদি কেউ দেয় তাহলে সেই প্রার্থীকেই অযোগ্য বিবেচনা করা হবে।

(৫) থানা পুলিশে জামিন ও মামলায় তদবির: মন্ত্রী-এমপিরা তাদের নির্বাচনী এলাকায় থানার উপর খবরদারি করেন এবং বিভিন্ন মামলার জামিনে হস্তক্ষেপ করেন। গত ১০ বছরে দেখা গেছে, এমপির পক্ষের লোক না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করতে গিয়ে নানা রকম হয়রানির শিকার হন। আবার অনেক এমপি হস্তক্ষেপ করে প্রকৃত আসামীর জামিন পেতে সহায়তা করেছেন এমন অভিযোগও প্রধানমন্ত্রীর কানে এসেছে। এবার এ ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

(৬) অন্য দল থেকে লোক ভেড়ানো: গত ১০ বছরে বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে অন্য দল থেকে বিশেষ করে জামাত-বিএনপি থেকে নিজেদের দলের লোক ভেড়ানো এমপিদের জন্য ছিল এক ধরনের রোগ। এবার নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। সরকার গঠনের পর সংসদীয় প্রথম বৈঠকেই তিনি এ ব্যাপারে এমপিদের উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপ করেছেন।

(৭) গ্রুপ তৈরি ও দলীয় কোন্দল: গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এমপিরা যখনই নির্বাচিত হন, তখনই নিজেদের একটি বলয় তৈরি করার চেষ্টা করেন এবং এর ফলে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি হয়। এবার দলীয় কোন্দল সৃষ্টির বিপক্ষে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।

(৮) স্থানীয় প্রশাসনে রদবদল: বিগত দুই মেয়াদে দেখা গেছে এমপিরা তাদের পছন্দমতো স্থানীয় প্রশাসন ঢেলে সাজান এবং তারা ঢাকায় এসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা পুলিশ সদর দপ্তরে তদবিরও করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসপি বা ওসি পদে এমপিরা সবসময় তাদের পছন্দের ব্যক্তিতে বেছে নেন। এবার এটি সম্পূর্ণ রূপে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় প্রশাসনে কেন্দ্রীয়ভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোন এমপি কাউকে পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না।

(৯) ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য: অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অনেকে এমপি হওয়ার পর তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে নানা রকম ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ও সেগুলোর প্রসার ঘটান। ব্যবসায় বাণিজ্য করতে অসুবিধা নেই। কিন্তু এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। যে কাজের জন্য যোগ্য নয়, সে কাজ যেন কোন এমপি না পান, সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

(১০) মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ: মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন যোগাযোগ করা যাবে না। টানা তৃতীয়মেয়াদে সরকারে এসে প্রধানমন্ত্রী যে মূল লক্ষ্যগুলো স্থির করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যেটা দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ প্রান্তেই শুরু হয়েছিল। স্থানীয় কোন এমপি যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কোন সম্পর্ক বা পৃষ্ঠপোষকতা না করেন সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এই নির্দেশনাগুলো যদি কোন এমপি অমান্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী টানা তৃতীয় মেয়াদে চাচ্ছেন একটি স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজের সংসদীয় দল।, যারা দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। এ ব্যাপারে ন্যূনতম ছাড় দিতে তিনি রাজি নন।  

বাংলা ইনসাইডার/এমআর