ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘মোর ক্যাথলিক দ্যান দ্য পোপ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০১৯ বুধবার, ০৬:০০ পিএম
‘মোর ক্যাথলিক দ্যান দ্য পোপ’

ডাকসু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের দুষছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, নীল প্যানেলের কিছু অত্যুৎসাহী শিক্ষকরাই এই পরিস্থিতি বিতর্কিত ও উত্তপ্ত করেছে এবং নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে। সরকারকে খুশির করতে গিয়ে তারা উল্টো সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বাংলা ইনসাইডারকে বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। ভোটের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ উদ্দীপনা ফুটে উঠেছে। কিছু শিক্ষকের অদক্ষতা ও অযাচিত কিছু পদক্ষেপের কারণে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাবি প্রশাসন পরিস্থিতি সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারেনি।

আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক অতি উৎসাহী হয়েছেন। তারা অতি আওয়ামী লীগার হয়ে নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, They were more catholic than the Pope. এই নির্বাচনে ছাত্রলীগের যে অবস্থান তাতে ছাত্রলীগ এমনিই নির্বাচনে জিততো। কিন্তু শিক্ষকরা নির্বাচন পরিচালনায় তাদের যোগ্যতা সঠিকভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। 

আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় আরেক নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের অনেকগুলো ভুল-ভ্রান্তি ছিল। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলে টিক চিহ্ন দেয়া যে ব্যালট পেপার ছিল সেগুলো ছিল বাস্তবে ভুয়া। কিন্তু সেসময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেখানে গিয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যালট পেপারগুলো যে ভুয়া, সেটি তারা তাৎক্ষনিকভাবে বলতে পারেনি। কোনটা আসল আর কোনটা ভুয়া ব্যালট পেপার ছিলো সেটা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বোঝা উচিৎ ছিলো। তারা যদি গণমাধ্যমকে বলতো যে, ব্যালটপেপারগুলো আসল নয়। তাহলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রভোস্টকে অব্যাহতি দেয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবিলা করা যেতো বলে তিনি বলেন।

আওয়ামী লীগের আরেক সিনিয়র নেতা মোহাম্মদ নাসিম মনে করছেন, ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কিছু অনভিজ্ঞতা ও অতি উৎসাহের কারণে নির্বাচন নিয়ে কিছু কিছু প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা এটা না করলেও পারতেন। এটা করার ফলে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কোন উপকার হয়নি। বরং ক্ষতি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও শিক্ষকদের এসব তৎপরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করছেন, যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা উচিৎ ছিল শিক্ষকরা সেভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। শুধু আওয়ামী লীগই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী পন্থী নীল দলের অনেক শিক্ষক ও সাবেক উপাচার্যরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অপরিপক্কতা, অতি উৎসাহ এবং অন্ধ দলীয় মনোভাব এই নির্বাচনকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি বরং শিক্ষকদের ভাবমূর্তিও নষ্ট করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত অভিভাবকের মতো সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতো তাহলে নির্বাচনের ফলাফল বিতর্কিত হতো না। শিক্ষকদের ভাবমূর্তিও রক্ষা পেতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছে তাতে শিক্ষকদের ভূমিকা এখন কাঠগড়ায়। শিক্ষকদের সততা, নৈতিকতা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি মনে করেন, এর ফলে ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সঠিকভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারেনি। প্রশাসন যেটা করেছে তাতে তিনি হতাশ হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে শিক্ষকদের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। যে আস্থাহীনতার মূল্য ভবিষ্যতে দিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষকরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অভিভাবক। সেই অভিভাবকদের প্রতি যদি অনাস্থা তৈরি হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের অধিকাংশই নীল দলের। তারা যেকোন ভাবে ছাত্রলীগকে বিজয়ী করার একটা মিশন নিয়ে নেমেছিলেন। যেটা ছিল অনুচিৎ। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পরিবেশ ও ছাত্রলীগের যে অবস্থান ছিলো তাতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হলেও ছাত্রলীগ ভালভাবেই জিততো। কিন্তু শিক্ষকদের অন্ধ দলীয় মনোভাবের কারণে এই নির্বাচন বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যেটা সরকারকে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

বাংলা ইনসাইডার/এমআর