ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিজেপির সঙ্গে আ.লীগের মাখামাখি: অসন্তোষ বিরোধী জোট?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৯:০০ পিএম
বিজেপির সঙ্গে আ.লীগের মাখামাখি: অসন্তোষ বিরোধী জোট?

আগামী ১১ এপ্রিল থেকে ভারতের লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ কম নয়। রাজনীতি মহলে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ভারতে যে সরকার ক্ষমতায় আছে তাঁর মনোভাবের উপর বাংলাদেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতা, গতি প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করে। তবে ভারতের থিঙ্ক ট্যাংকরা মনে করে যে, যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেনো ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র নীতির যে ভিত্তি তাঁর মৌলিক দিকটি হলো জঙ্গিবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যে সরকার মদদ দিবে না, আশ্রয় প্রশ্রয় দিবে না তাঁদের প্রতিই ভারত সহানুভূতিশীল। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার কংগ্রেস এবং বিজেপি দুটি সরকারকেই পার করে এসেছে। কাজেই সেই বিচারে অনেকেই মনে করেন যে, ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেই আসুক না কেনো ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বা আরও নির্দিষ্ট করে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের কোনো টানাপোড়েন হবে না বা কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। কিন্তু সম্প্রতি কংগ্রেসের বিভিন্ন থিংক ট্যাংক এবং উচ্চ পর্যায়ের নেতারা এবং কংগ্রেস যে বাম ফ্রন্ট ও তৃণমুলের সঙ্গে যে জোট করেছে, সেই জোটের শরীকরা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিজেপির অতিরিক্ত মাখামাখিতে বিরক্তি প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি ভারতের লোকসবা নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পর্যালোচনা বৈঠকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিজেপির মাখামাখি নিয়ে কথা উঠেছে। ভারতের নির্বাচনে এবার মোদিকে পরাজিত করার জন্য কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল জোট বেধেছে। পশ্চিম বাংলায় মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে তৃণমূল অত্যন্ত শক্তিশালী। মমতা ব্যানার্জী তাঁদের দলের এক কর্মীসভায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিজেপির অতিরিক্ত মাখামাখিতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

কয়েকদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ তিস্তার পানি চুক্তির জন্য বিজেপির সঙ্গে এখনও দেনদরবার অব্যাহত রেখেছে এবং বিজেপি থেকে বলেছে যে, তারা ফের নির্বাচিত হলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে  তিস্তার পানিচুক্তি করবে। ২০১৪ তে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকে মনে করেছিল যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরী হবে এবং বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ট হবে। কিন্তু বিজিপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হয়ে যায়। অনেকগুলো ঐতিহাসিক চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। দুইদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। এই বিষয়টিকে বামফ্রন্ট, তৃণমূল এবং কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ভালোভাবে দেখছে না। যদিও আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রগুলো বলছে যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা নেই এবং যারা সরকারে থাকবে তাঁদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখাটা আওয়ামী লীগের নীতিগত অবস্থান। যারাই ক্ষমতাই আসুক না আওয়ামী লীগ কখনও ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় বাংলাদেশে প্রশ্রয় দিবে না।

কিন্তু ভারতের কংগ্রেস তৃনমূল এবং বামফ্রন্টরা মনে করছেন, যে মোদীর কিছু কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া উচিত। যেমন নাগরিকত্ব বিল, যে বিলের মাধ্যমে প্রচুর মুসলমানের ভারতীয় নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিলের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট নয়। ভারতে যে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা, সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিজিপির অনেক নীতির ব্যাপারেও বাংলাদেশ সরকার নীরব। এইসব ব্যাপারে নির্বাচনে যদি বাংলাদেশের সুধী সমাজ, সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলো জোড়ালো বক্তব্য রাখে সেটা ভারতের নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এমনকি বাংলাদেশ আসামে যে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছে, সেটার ব্যাপারেও নীরব ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত যে বাংলাদেশকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে না সে ব্যাপারেও বামফ্রন্ট এবং তৃনমূল বাংলাদেশের সুষ্পষ্ট অবস্থান চায়। এই বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র বামফ্রন্ট তৃনমূল এবং কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা যারা ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, তারা বলেছেন,‘এই বিষয়গুলো মোটেও দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরী করবে না।’ আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, ভারতের কোন বিশেষ রাজনৈতিক দল নয়। পুরো ভারতের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং এই সম্পর্ক রক্ত ঋণে বাধা।  একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই এই সম্পর্কের পটভূমি রচিত হয়েছিল। কাজেই যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সঙ্গেই আওয়ামী লীগ সুসম্পর্ক রাখবে এবং আওয়ামী লীগ মনে করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং এই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দশ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেছেন, ভারতের নির্বাচন একান্তই দেশটির নিজস্ব ব্যাপার। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের কোন ভূমিকা নেই। বাংলাদেশ কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেই। বাংলাদেশ ভারতের নির্বাচনে যারা জয়ী হবে তাদের সঙ্গে যে সম্পর্কের নতুন উত্তরণ হয়েছে, সেই উত্তরণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। এই বিষয়টি নিয়ে কোন দেশের মধ্যেই কোন মতবিরোধ নেই বলে তারা মনে করেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেছেন যে, ‘ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। এই দেশে নির্বাচন নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই নির্বাচনে তাদের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক মৌলিক বিষয়ে কোন পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ ভারতের কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক করে না। বরং সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক করে।’ তবে ভারতীয় তৃনমুল সমর্থিত কয়েকটি দৈনিকে এ খবর প্রকাশ পেয়েছে যে, তৃনমূল এবং পশ্চিম বাংলার ভোটব্যাংক দখল করতে বাংলাদেশ ইস্যুকে কাজে লাগাতে চায় তৃনমুল। সে ব্যাপারে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থন চাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ভারতের নির্বাচনের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করছে। এরফলে কি বাংলাদেশে ভবিষ্যতে তিস্তার পানি চুক্তি বা বিজেপি বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে সম্পর্কের অবনতি হবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ড. গওহর রিজভী মনে করেন, এক্ষেত্রে সম্পর্ক অবনতি হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। কারণ, দুই দেশের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা এবং কূটনৈতিক পেশাদারিত্বের মধ্য দিয়ে গাঁথা। কাজেই এক্ষেত্রে সম্পর্ক অবনতির প্রশ্নই উঠে না। 


বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ