ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আওয়ামী লীগ কি জনগনের ভোটাধিকার হরণ করছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০১৯ সোমবার, ০৯:৩০ পিএম
আওয়ামী লীগ কি জনগনের ভোটাধিকার হরণ করছে?

এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। আওয়ামী লীগই এই অঞ্চলের জনগনের ভোটাধিকারের জন্য সবচেয়ে বেশি আন্দোলন করেছে। দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই তদানীন্তন পাকিস্তানে আন্দোলন হয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণআন্দোলন; এই দীর্ঘ আন্দোলনের পথ পরিক্রমার মূল বিষয় ছিল জনগনের স্বাধীকার এবং জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠা। সত্তরের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এদেশের জনগন তাদের মতামত প্রকাশ করেছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার নৃশংস বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর দেশের মানুষ অনেক অধিকারের মত ভোটাধিকারও হারায়। ভোট হয়ে যায় একটা প্রহসন। জিয়াউর রহমানের হ্যা না ভোট বা উনসত্তরের নির্বাচন, সবই ছিল সাজানো ছঁকে বাধা এক প্রহসন। এসব নির্বাচনে জনগনের অধিকারের কোন প্রতিফলন ঘটেনি। সীমাহীন কারচুপি ও প্রশাসনের ইচ্ছেমতো বানানো ফলাফল জনগনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই ১৯৮১ সালে জাতির পিতার বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফিরে এসে জনগনের ভোটের অধিকার পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। তিনি আন্দোলন শুরু করেন, আমার ভোট আমি দিবো। যাকে খুশি তাকে দিবো। ৮১ সাল থেকে স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনের মূল বক্তব্যই ছিল জনগনের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। গণতান্ত্রিক অধিকারকে উর্ধে তুলে ধরা। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। জনগন দীর্ঘদিন পর স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়। জনগনের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। একানব্বই নির্বাচনে জামাতের হাত ধরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। বিএনপির শাষনামলে মাগুড়া বা মিরপুরের উপনির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে। আবার ভোটের অধিকার লুন্ঠিত হয়। শুরু হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের উত্তাল আন্দোলনের মুখে বিএনপির পতন ঘটে এবং ছিয়ানব্বইয়ে নতুন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগই প্রথম সরকার যারা নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা তত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ছেড়ে দেয় ২০০১ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে যে কয়টা নির্বাচন করেছে, সবগুলো নির্বাচন ছিল প্রহসন এবং ভোটাধিকার হরণের নতুন নতুন কৌশলে ভরপুর। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বিএনপি জামাত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রধান বিচারপতি বয়স বাড়িয়ে সংবিধান সংশোধন করে, যেন তাদের পছন্দের বিচারপতি কে এম হাসান তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন। তারপরে শুরু হয় ভোটের অধিকারের জন্য নতুন করে আন্দোলন। এবার শুধু আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো এই দাবি নয়। সঙ্গে সঙ্গে আসে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের দাবি, ভূয়া ভোটার বাতিলের দাাবি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনেরও দাবি। এই প্রেক্ষাপটে আসে ওয়ান ইলেভেন। এই ওয়ান ওয়ান ইলেভেনের সরকার জনগনের অনেকগুলো দাবি পূরণ করে। যেমন স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রবর্তন করা হয়। ফলে দেড়কোটি ভুয়া ভোটার বাদ পড়ে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাকে স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে রুপ দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগ তৃতীয়বারের ক্ষমতায় এসেছে দুই মাসের বেশি সময় হলো। এই সময়ে প্রশ্ন এসেছে, আওয়ামী লীগই কি ভোটের অধিকার হরণ করছে? ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা নিয়ে অনেক কথা আছে। সে কথা এখন বাদই দিলাম। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন যেভাবে বা যে প্রক্রিয়ায় হচ্ছে তাতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। যার মধ্যে:
১. জনগন ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে এবং জনগন মনে করছে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে কোন লাভ নেই।
২. অধিকাংশ উপজেলা নির্বাচনে কারচুপি, ব্যালট বাক্স ভরানো, প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি দৃশ্যমান।
৩. নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও অদৃশ্যভাবে ভোটের বাক্স ভরে যাচ্ছে।
৪. দেখা যাচ্ছে প্রশসন নির্বাচনী ফলাফলের উপর হস্তক্ষেপ করছে।

এই চারটি কারণে মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস জমে গেছে মানুষ যে ভোট দিবে। সেই ভোটের প্রতিফলন নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটবে না। প্রশ্ন হচ্ছে এরজন্য আওয়ামী লীগ কতটা দায়ী? আওয়ামী লীগই জনগনের ভোটের অধিকার নষ্ট করলো নাকি ভোটের অধিকার হরণের অন্যকোন ষড়যন্ত্র পর্দার আড়ালে চলছে? ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন থেকেই যদি আমরা শুরু করি, সেখানে কখনোই মনে হয়নি বিএনপি জামাত জোট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য নির্বাচন করছে। বরং মনে হয়েছে যেকোন মূল্যে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিতর্কিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। তারা মনোনয়ন বাছাই নিয়ে নানা রকম নাটক করেছে। এমনভাবে মনোনয়ন দিয়েছে যে, প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি নিজেরাই একাধিক গ্রুপ উপগ্রুপ সৃষ্টি করে বিভক্তি তৈরী করেছে। তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা মূলক কোন কর্মকান্ডেই অংশগ্রহণ করেনি। জনগনের কাছে ভোট চাওয়া বা জনগনের কাছে কর্মসূচী নিয়ে যাওয়ার মত কোন লক্ষন বা উৎসাহ তাদের মধ্যে ছিল না। তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে বিএনপি কি চেয়েছিল? বিএনপি কি চেয়েছিল এই নির্বাচনে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরী করতে যাতে জনগন ভোটের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে? এই ৩০শে ডিসেম্বরের পর বিএনপি জামাত উপজেলা নির্বাচন বর্জন করলো। একটা নির্বাচন যখন অংশগ্রহনমূলক হয় না। একটা নির্বাচনে যখন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি থাকে না তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই নির্বাচনের উপর জনগন আস্থা হারিয়ে ফেলে। কাজেই উপজেলা নির্বাচনে যে ভোটারদের অনাগ্রহ এবং ভোটারদের যে অনীহা, এটার একটা বড় কারণ হলো নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ হচ্ছে না। যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি নেই, সেই নির্বাচন নিয়ে জনগনের আগ্রহ কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বিএনপি এসে যখন ‘হ্যা না’ ভোট করেছিল, সেটা ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। বাংলাদেশে ভোটাধিকার হরণের প্রথম প্রক্রিয়া। সেই ধারা আবার ফিরিয়ে আনার জন্য কি জামাত বিএনপি কৌশলে এটা করছে? সেটা যদি করেও, তারপরও আওয়ামী লীগ দায় এড়াতে পারে না। আওয়ামী লীগের একটা বিপুল জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে। সারাদেশে আওয়ামী লীগের ৪০ শতাংশ ভোটার রয়েছে। আওয়ামী লীগ কেন তার ভোটারদের নির্বাচনমুখী করতে পারছে না? ভোটারদের কেন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারছে না? সেই ব্যার্থতার দায় আওয়ামী লীগের নিতেই হবে। আওয়ামী লীগ যদি দেশে ভোটের অধিকার রক্ষা করতে চায় এবং জনগনের মতাধিকারের প্রয়োগ ভোটাধিকারের মাধ্যমে ফোটাতে চায় তাহলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি আরো বাড়াতে হবে। আওয়ামী লীগের যারা ভোটার কিংবা কর্মী সমর্থক, তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা করার দরকার, সেটা করবে। সেটা যদি না করতে পারে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ, তাহলে ভোটাধিকার হরণের দায় আওয়ামী লীগের উপরও এসে পড়বে।      

 

বাংলা ইনসাইডার