ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, ৯ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তাঁরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩১ মে ২০১৯ শুক্রবার, ০৭:০০ পিএম
তাঁরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

আওয়ামী লীগ সভাপতির প্রিয়ভাজন ব্যক্তি ছিলেন তাঁরা। তাঁদের বিরুদ্ধে দলের নীতি, আদর্শ লঙ্ঘনের কোনো অভিযোগ নেই। ওয়ান ইলেভেনের সময় তাঁরা সংস্কারপন্থীও ছিলেন না। তারপরও নক্ষতের পতন ঘটেছে, কক্ষচ্যুত হয়েছেন তাঁরা। শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য বা ভালোবাসায় তাঁদের কোনো কাটতি নেই। তারপরও তাঁরা কেন রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়লেন বা রাজনীতিতে কেন কক্ষচ্যুত হলেন তা কোটি টাকার প্রশ্ন। এরকম কিছু রাজনীতিবিদ যারা এখন আওয়ামী লীগে অপাংক্তেয় হয়ে গেছেন, রাজনীতিতে ভবিষ্যতে যাদের কোনো আলোর রেখা মিলছে না তাঁদের নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া: মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের একজন। একসময় ঢাকা মহানগরীতে সভা-সমাবেশ করতে হলে হানিফ-মায়ার উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো আওয়ামী লীগকে। মোস্তফা মহসীন মন্টু চলে যাওয়ার পর ঢাকা মহানগরীতে মায়া আওয়ামী লীগের খুব গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। ৯৬ সালে তাঁকে প্রতিমন্ত্রিত্ব ও ২০১৪ সালে তাঁকে পূর্ণ মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মায়া রাজনীতি থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছেন। ২০১৮’র ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে তিনি মনোয়নন বঞ্চিত হয়েছেন, এখন আর তিনি রাজনীতিতে নেই। মায়ার এই পরিণতি কেন?

জানা যায়, বিভিন্ন কারণেই মায়ার সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একটি সূত্র বলছে, মায়ার ছেলে ও নিকটাত্মীয়দের আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যক্রমের কারণে মায়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। আরেকটি সূত্র থেকে জানা যায়, একজন পদস্থ ব্যক্তির সঙ্গে মায়ার ব্যক্তিগত বিরোধের জের হিসেবে রাজনীতি থেকে প্রায় বিযুক্ত করা হয়েছে। অন্য একটি সূত্র বলছে যে, রাজনীতিতে মায়ার ঐতিহাসিক প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে রাজনীতিতে একজন নেতা পরিত্যাক্তই ঘোষিত হয়। সেরকমভাবে পরিত্যাক্ত হয়েছেন মায়া। তবে কারণ যাই হোক না কেন, রাজনীতিতে মায়া এখন একটি গুরুত্বহীন চরিত্র হিসেবেই রয়ে গেছেন।

জাহাঙ্গীর কবির নানক: জাহাঙ্গীর কবির নানক ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আবার যুবলীগের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যাদেরকে নিজ হাতে রাজনীতিতে বিকশিত করেছেন তাঁদের মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক একজন। ২০০১ সালে যুবলীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় পালিয়ে গিয়ে শেখ হাসিনার মুক্তি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনেও কাজ করেছিলেন বলেও জানা যায়। কিন্তু এবার নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেছে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর কবির নানক ভিওআইপির ব্যবসা করতে গিয়ে বিপুল অংকের ঋণখেলাপী হয়েছেন। এই ঋণের টাকা শোধ করতে পারেননি জন্যই সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অন্য একটি সূত্র বলছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট যখন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় দাওয়াতে গিয়েছিল সেখানে তার গাড়িতে হামলা করা হয়েছিল। এই হামলার ঘটনায় জাহাঙ্গীর কবির নানকের দিকে ছিল সন্দেহের তীর। সেজন্য মার্কিন চাপে নানককে রাজনীতি থেকে সরে যেতে হয়েছে। অন্য একটি সূত্র বলছে, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সময় তার যে উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ছিল তা এখন আর নেই এবং তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গ্রুপিং বিভাজনের কৌশল অবলম্বন করেন। এজন্যই রাজনীতিতে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। যদিও নির্বাচনের সময়ে কিংবা পরে শেখ হাসিনা তাঁকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিচ্ছেন কিন্তু রাজনীতিতে তিনি এখন একটি অতৃপ্তির নাম।

আব্দুর রহমান: আব্দুর রহমানও ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন এবং শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এবার তিনি নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। ভবিষ্যতেও তিনি মনোনয়ন পাবেন এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সম্পাদকের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি সংগঠনের ব্যাপারে মনোযোগী নন। এলাকায় তার জনপ্রিয়তা নেই। রাজনীতি নয়, বরং তিনি ব্যবসা বাণিজ্য এসবেই তিনি ব্যস্ত। এজন্যই রাজনীতিতে তার প্রস্থান একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

বাহাউদ্দিন নাসিম: ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতির সহকারী একান্ত সচিব। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তার ব্যক্তিগত টিমের যারা সদস্য হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাসিম অন্যতম। এরপর নাসিম স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্ব পান। আওয়ামী লীগের বিগত কাউন্সিলে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাননি। রাজনীতিতে তার আগের জৌলুশও নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদারীপুরের অন্তৎ দুজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার রেষারেষির জেরেই তাঁকে কোণঠাসা হতে হয়েছে। তাঁদের একজন হলেন আব্দুস সোবহান গোলাপ, অন্যজন শাজাহান খান। তাঁদের চক্ষুশূল হওয়ার কারণেই নাসিমকে রাজনীতি থেকে সরে যেতে হয়েছে। অন্য একটি সূত্রমতে, নাসিম তার যে রাজনৈতিক বলয় তার বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাননি। এজন্যই রাজনীতিতে তার এই পরিণতি তৈরি হয়েছে।

মৃণাল কান্তি দাস: মৃণাল কান্তি দাস ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত টিমের একজন। ৯৬ সালে তিনি জনসংযোগ দেখাশুনা করতেন। অজানা কারণে তারসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতির দূরত্ব তৈরি হয়। এইসময়ে তিনি ব্যবসা বাণিজ্য দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কিন্তু এরপর তাঁকে আবার মনোনয়ন দেয়া হয়। গত তিনটি নির্বাচনে তিনি মুন্সিগঞ্জ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, এমপিও নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্যও বটে। তারপরেও মৃণাল কান্তি দাস যেন পাদপ্রদীপে নেই। তিনি যাপিত জীবনের মত রাজনীতি করছেন। তার রাজনীতিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, মৃণাল কান্তি দাস শারীরিকভাবে অসুস্থ। রাজনীতির জন্য যে সময় এবং শ্রম দরকার সে ব্যাপারেও তার অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি নিজেই নিজেকে আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতির বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন এ সমস্ত রাজনীতিবিদদের পতন দেখে একটা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করাই যায়, তা হলো যে রাজনীতিতে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ থাকতে হবে। সামান্য বিচুতি একটা মানুষের রাজনৈতিক জীবনে বড় অন্ধকার আনতে পারে।