ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হবে কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০১৯ শনিবার, ০৫:৫৯ পিএম
ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হবে কবে?

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকাণ্ড ছিল একটি রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়েও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটা শুধু হত্যাকাণ্ডের বিচার। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা জড়িত ছিল, হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিল তাদের অনেকেই এই বিচারের আওতায় আসেনি। জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করার জন্য একটি কমিশন গঠনের দাবি উঠছে দীর্ঘদিন ধরেই। হত্যাকাণ্ডে কার, কী ভূমিকা ছিল সেটা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারপরও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়, হাই কোর্টের রায় এবং আপিল বিভাগের রায় থেকে বোঝা যায় যে, এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে অনেকেই জড়িত ছিল। যদিও এই মামলার সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত শুধু তাদেরকেই আসামি করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত অনেক সন্দেহভাজনই এখনও আড়ালে রয়ে গেছে, যাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি।

জিয়াউর রহমান

জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় সন্দেহভাজন মনে করা হয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমানকে। হাইকোর্টের রায়েও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার অস্পষ্টতা এবং নির্লিপ্ততার সমালোচনা করা হয়েছে। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সেনাপ্রধান হন। পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু দুটি কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি নন তিনি। এর একটি হলো, এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। মৃত ব্যক্তিকে আসামি করার আইনগত রীতি বাংলাদেশে না থাকায় তিনি এই মামলায় আসামি হননি। দ্বিতীয়ত, এই মামলার পুরো ষড়যন্ত্রের দৃশ্যপট এখনও উন্মোচিত হয়নি জন্যেই জিয়াউর রহমান এ মামলার আসামি হননি।

মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মেজর জেনারেল কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ ছিলেন সেনাপ্রধান। যদিও বলা হচ্ছে যে, তার অজ্ঞাতসারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, তার নির্লিপ্ততা, সেনা বাহিনীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং দায়িত্বহীনতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। সেনাপ্রধান হয়ে তিনি খুনি মোস্তাককে রেডিওতে ভাষণ দিয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এজন্য বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হলে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর অনেক কীর্তিই বেরিয়ে আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। শফিউল্লাহ যদিও এখন আওয়ামী লীগ করছেন। জীবন সায়ান্থে উপনীত হয়েছেন। কিন্তু তারপরও এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের স্বার্থেই তার ভূমিকা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ কে খন্দকার

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট এ কে খন্দকার ছিলেন বিমান বাহিনী প্রধান। তিনিও মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর মতোই খুনি মোস্তাককে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার ভূমিকা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এবং এম এ জি ওসমানি বাকশাল গঠনের পর আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেছিলেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো যে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর ব্যরিস্টার  মইনুল হোসেন খন্দকার মোস্তাকের অত্যন্ত প্রিয় এবং আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন। ১৫ আগস্টের হত্যকাণ্ডের পর খন্দকার মোস্তাক আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে ডেমোক্র্যাটিক লিগ গঠন করেন। সেই দলের নেতাও ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। সুতরাং এটা ধারণা করাই যায় যে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জাতির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অনেক কিছুই জানতেন এবং এই ষড়যন্ত্রের তিনিও একটি অংশ ছিলেন। যদিও বিচার কার্যে বা তদন্তে তিনি আইনের আওতায় আসেননি।

কে এম ওবায়দুর রহমান

কে এম ওবায়দুর রহমান আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন নথি ও তদন্তে স্পষ্ট যে, জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডে কে এম ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা ছিল। কিন্তু মৃত্যুজনিত কারণে তিনিও তদন্তের বাইরে চলে গেছেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল সেটা তদন্ত করলে নিশ্চয়ই ইতিহাসে তার ভূমিকাটাও আলোচিত হবে।

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এখন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের সময় আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তারও যোগসাজশের কিছু আলামত পাওয়া যায়। কিন্তু মামলার বিচারে তার দায়মোচন ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হলে তার নামও আসবে বলে মনে করেন জাতির পিতা হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা।

জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। কিন্তু হত্যার ষড়যন্ত্রের বিচার হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, এই ষড়যন্ত্রের বিচার না হলে বাংলাদেশে এ ধরণের হত্যা-ক্যু ষড়যন্ত্রের ধারাটা অব্যাহত থাকবে। তাই জাতির স্বার্থেই এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করা এবং ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন করা জরুরি।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি