ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

খালেদার এই পরিণতির জন্য দায়ী কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার, ০৮:০০ পিএম
খালেদার এই পরিণতির জন্য দায়ী কে?

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি এক করুণ পরিণতির দিকে এগুচ্ছে। গতকাল বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পরিবারের লোকজন সাক্ষাৎ করেছেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তারা বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হচ্ছে। তার ব্লাড সুগার ১৫ এবং তার এক হাত বেঁকে গেছে।

বেগম খালেদা জিয়া তাদের বিশেষ বিবেচনায় অর্থাৎ প্যারোলের মাধ্যমে আবেদন করার বিষয় নিয়ে কাজ শুরুর কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নি:শেষ প্রায়। তার শারীরিক অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে বিএনপির নেতৃবৃন্দরা প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া অরফানেজ মামলায় দণ্ডিত হয়ে যখন জেলে যান তখন বাংলাদেশে এমন বিশ্বাস করার লোক কম ছিল যে, তিনি এতদিন জেলে থাকবেন। বরং বিএনপি নেতারা মনে করেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়া মাত্র অল্প কিছু সময়ের জন্য কারাবরণ করছেন। শীঘ্রই তিনি আরো জনপ্রিয় হয়ে ফিরে আসবেন। রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা হয়েছিল যে, রাজনৈতিক মহলে বেশিদিন বেগম খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ রাখা সম্ভব নয়।

বেগম জিয়ার আইনজীবিরা মনে করেছিলেন যে, খুব শিঘ্রই তাকে জামিন করিয়ে আনা যাবে। কিন্তু দুই বছর গড়াতে চললো; বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে বিএনপি কার্যত কিছুই করতে পারেনি।

উল্লেখ্য যে, ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার আগে বেগম জিয়া লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি চোখ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছিলেন। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া এই মামলা এড়ানোর জন্য আরো কিছুদিন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারেক জিয়ার প্রলোভনের কারণেই তিনি সে সময় থাকেননি। তিনি দেশে ফিরে আসেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন হলো বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান পরিণতির জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করে ৫ জনকে দায়ী করা যায় এই পরিণতির পেছনে।

তারেক জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থার জন্য সবথেকে বেশি দায়ী করা হয় তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে। বিএনপির নেতারাই এখন মনে করেন, তারেকের কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার আজকের এই পরিণতি। কারণ যে দুটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়েছে, সেই মামলা দুটিতে যে অর্থ লোপাটের অভিযোগ, সেই অর্থ লোপাটের সাথে তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুন এবং তারেক জিয়ার কিছু ব্যবসায়িক সহযোগিরা যুক্ত ছিল। এই থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে যেসমস্ত অনিয়ম, দুর্ব্রিত্তায়ন এবং দুর্নীতিগুলো হয়েছে তা সবগুলোই হয়েছে তারেক জিয়ার মদদে। বিশেষ করে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে তারেক জিয়া যে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তাঁর দায়ভার বেগম খালেদা জিয়াকে নিতে হচ্ছে। বিএনপির অনেক নেতাই এই কথা বলেন যে, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা বিএনপি আর আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে এবং সেই একুশে আগস্ট হামলার প্রধান হোতা তারেক জিয়া। কাজেই বেগম খালেদা জিয়ার আজকের পরিণতির জন্য তারেক জিয়াই সবথেকে বেশি দায়ী- এটা বিএনপি এবং সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে।

বেগম জিয়ার পরিবার

বেগম খালেদা জিয়ার ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজনকেও বিএনপির লোকজন কম দায়ী করেনা। কারণ তাদের বেসুমার দুর্নীতি এবং অতি লোভ বেগম খালেদা জিয়াকে কঠোর হতে দেয়নি এবং বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির পথে নিমজ্জিত করেছে। ভাই-বোনদের ক্ষমতার লোভের কাছে বেগম খালেদা জিয়া পরাজিত হয়েছেন এবং তিনি নিরবেই এসব সহ্য করেছেন। যার কারণে আজকে এসবের মাশুল দিতে হচ্ছে। 

বিএনপির নেতৃবৃন্দ

বেগম খালেদা জিয়ার দুর্ভাগ্য তার আস্থাভাজন ও বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব বিএনপিতে তৈরি করতে পারেননি। বরং নেতৃবৃন্দ একদিকে যেমন লোভী তেমনি কাপুরুচিত। এই বিএনপির নেতৃবৃন্দর যেমন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে লড়াই করার সাহস নেই। তেমনি বিভিন্ন প্রলোভনের কাছে তারা পরাভূত হয়েছেন।

বিএনপির নেতৃবৃন্দই প্রকাশ্যে বলেন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপির আন্দোলনই যথেষ্ট ছিল কিন্তু বিএনপি একটি সফল আন্দোলন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য করতে পারেনি। আর এজন্য বিএনপির মহাসচিবসহ দলটির নেতৃবৃন্দকে তৃনমূলের নেতাকর্মীরা কম দায়ী করে না।

আইনজীবীরা

বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা বিশেষ শীর্ষ পর্যায়ের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদসহ সিনিয়র আইনজীবীরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে এক রকম নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং নির্লিপ্ততার জন্যই বেগম খালেদা জিয়ার পরিণতি এমন হয়েছে বিএনপির নেতাদের অনেক মনে করেন।

বিশেষ করে যে দুইটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়েছেন এই দুটি মামলা বিভিন্ন ধাপে ধাপে উচ্চ আদালতে যাওয়া হয়েছে। আর উচ্চ আদালতে মামলাটিতে দীর্ঘায়িত করা এবং কালক্ষেপণের নীতি পরে বুমেরাং হয়েছে বিএনপির জন্য।

এখন পরিস্থিতি হয়েছে যে উচ্চ আদালতে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। আর এটাও বেগম খালেদা জিয়ার এই পরিণতির জন্য কম দায়ী না।

সরকারের কৌশল

বেগম খালেদা জিয়ার এই পরিণতির জন্য সরকারের রাজনৈতিক কৌশলগুলো বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের নেতৃবৃন্দ মনে করেন। আওয়ামী লীগের মনে বিএনপির ভুল রাজনীতিকে কাজে লাগিয়েছে সরকার। সরকার এই মামলার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো নীতি গ্রহণ না করে আইনী প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে গেছে। আর আস্তে আস্তে পরিস্থিতিটাকে এমন করেছে এট সরকারের কোনো বিষয় নয় বরং বিচার বিভাগ এবং খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়। আর যে কারণে এই মামলাগুলোতে সরকার একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেছে। পাশাপাশি সরকার তাদের বার বার বলছে খালেদা জিয়ার বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই, তা আদালতের বিষয়। আর সরকারের কৌশলের কাছেই বিএনপির পরাজিত হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার এই পরিণতির জন্য দায়ী যেই হোক না কেনো, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আজ তার পাশে কেউ নেই।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ