ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তৃণমূলে পচন, দায় কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বুধবার, ০৫:৫৯ পিএম
তৃণমূলে পচন, দায় কার?

এগারো বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার যে কুফল, সেগুলো আওয়ামী লীগের মধ্যে স্পষ্টত দৃশ্যমান। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তৃণমূল। বিভিন্ন সংকটে এবং সন্ধিক্ষণে আওয়ামী লীগের তৃণমূলই দাড়িয়েছিল। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, যখন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের আপসকামীতা ছিল দৃশ্যমান তখন আওয়ামী লীগের তৃণমূলই জাতির পিতার পক্ষে দাড়িয়েছিল। তাদের কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ স্বাধিকারের আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে যায়।

এসময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার আপসকামীতা ছিল, কিন্তু তৃণমূলের শক্তিতেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীদের পরাহূত করতে সক্ষম হয়েছিল।

৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তৃণমূল। এমনকি ৭৫ এর ১৫ আগস্ট যখন জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে স্বাধীনতার প্রতিপক্ষরা হত্যা করে, তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন সীমাহীন নেতৃত্বের প্রমাণ দিয়েছিল, ঠিক তেমনি বিপরীত চিত্র ছিল তৃণমূলের ক্ষেত্রে। কারণ তৃণমূল তখন রুখে দাড়িয়েছিল এবং তৃণমূলের তীব্র সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষার ফরে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন হয়। তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষার কারণেই ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তৃণমূলের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তৃণমূলই শেখ হাসিনার পাশে দাড়িয়েছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যখন আওয়ামী লীগের ওপর নির্মম অত্যাচার, হত্যা, লুণ্ঠন শুরু হয়- তখন তৃণমূলই রুখে দাড়িয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময় শীর্ষ নেতাদের পদস্থলনের বিপরীতে তৃণমূলের শক্তিতেই মুক্ত হন শেখ হাসিনা। 

এই তৃণমূলের শক্তিতেই বলীয়ান আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১১ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলে যেন পচন ধরেছে। ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট থেকে পাপিয়া পর্যন্ত যে কাহিনী, স্থানীয় পর্যায়ের নেতার বাড়িতে টাকার খনি সহ বিভিন্ন অপকর্মের তথ্য ফাঁস হচ্ছে- সেই অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তৃণমূল। তৃণমূলে এই যে পচন, তাতে দায়ী কে, এই প্রশ্ন এখন আওয়ামী লীগের মধ্যেই উঠেছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ মনে করছে, তৃণমূলের এই অবক্ষয় এবং আদর্শহীনতার জন্য ৫টি কারণকে তারা চিহ্নিত করেছেন।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কুফল

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মধ্যে অনেক লোভ, কিছু একটা বানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, কিছু একটা পাওয়ার উদাগ্র আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়েছে। আর এ কারণেই তৃণমূলের মধ্যেই নানারকম টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্যসহ নানারকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝোঁক বেড়েছে।

আদর্শিক চর্চার অভাব

২০০৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শের চর্চা হতো। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রন্থ দেওয়া হতো, পাঠচক্র এবং কর্মীসভা, অনুশীলনচর্চা ইত্যাদি হতো। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা নিজেরাই এখন নানারকম ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। ফলে আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শিক চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই আদর্শিক চর্চার অভাবে তৃণমূলের মধ্যে অবক্ষয় ঢুকে গেছে বলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করেন।

দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী

আওয়ামী লীগের মধ্যে এ পর্যন্ত অনেক অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে বিএনপি-জামাত থেকে সুবিধাবাদীরা আওয়ামী লীগে আস্তানা গেড়েছে। তারা আওয়ামী লীগের নাম পদবি ব্যবহার করে নানা অপকর্মের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে। এটা করা হয়েছে কিছু কিছু কেন্দ্রীয় নেতার যোগসাজশে। তাদের দল ভারি করার মানসিকতা থেকে। যাচাই বাছাই ছাড়া এ ধরণের অনুপ্রবেশ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার মাসুল দিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে।

তৃণমূলের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তা

তৃণমূলের মধ্যে একটা ধারণা হয়ে গেছে তাদেরকে টাকা বানাতে হবে। টাকা বানাতে না পারলে এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও হতে পারবে না। কারণ বিগত নির্বাচনে দেখা গেছে যে, দলীয় ত্যাগি পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে টাকা পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী বা বিভিন্ন রকম বিত্তবানদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এরফলে তৃণমূলের তরুণদের মধ্যে একটি অর্থলিপ্সা জাগ্রত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর ব্যর্থতা

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদকমণ্ডলীসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দায় এড়াতে পারেন না। তাদের প্রত্যেকটি বিভাগের জন্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ঢাকায় বসেই কার্যক্রম করেছে। সারাদেশে আওয়ামী লীগের যে সংগঠন তার দিকে নজরদারি করা, কর্মী সংগ্রহ করা, সম্মেলন করার  মতো কাজের ব্যাপারে তাদের তীব্র অনীহা আওয়ামী লীগে এই পচন সৃষ্টি করেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

আওয়ামী লীগ তৃণমূল শক্তিনির্ভর একটি দল। তৃণমূলে যদি পচন ধরে তাহলে আওয়ামী লীগ থাকবে না বলে মনে করছেন দলটির নেতৃবৃন্দ। এ কারণেই তৃণমূলের পচনরোধে এখনি আওয়ামী লীগের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের শক্তি হলো তৃণমূল। আওয়ামী লীগ সভাপতি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন; তৃণমূলের মধ্যে যে সমস্ত আগাছা প্রবেশ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। খুব শীঘ্রই আওয়ামী লীগের ভেতরের শুদ্ধি অভিযান দৃশ্যমান হবে।’